প্রশ্নবিদ্ধ ১৬১ ও ১৬৪ ধারার জবানবন্দি

আইন আদালত

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দেখা যায় ‘জজ মিয়া নাটক’। তারপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তকারীদের নানা ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা উঠলেও সাম্প্রতিককালে আলোচনায় এসেছে ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় আদায় করা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে কিশোরীকে খুনের ঘটনায় আসামিদের কথিত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পর ওই কিশোরীর জীবিত ফিরে আসা, চট্টগ্রামে ‘হত্যাকাণ্ডে’ গ্রেফতার আসামির স্বীকারোক্তির পর নিহত ব্যক্তির ফিরে আসা এবং বরিশালে স্বামীকে খুনের দায়ে স্ত্রীর কথিত স্বীকারোক্তির পর অধিকতর তদন্তে চোরদের হাতে সেই খুনের ঘটনার তথ্য উঠে আসায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে তদন্তকারীদের ভূমিকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনা মীমাংসার কৃতিত্ব নেয়ার জন্য অথবা প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে ব্যর্থতা ঢাকার জন্য তদন্তকারীরা নানা কার্যকলাপ ঘটিয়ে থাকেন, তারই অংশ জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়, যেটাকে ১৬১ বা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এতে যে অনেক নিরপরাধ ফেঁসে যান, সেটাও ভাবেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরাা। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহারের ধারাবাহিকতার কুফলও এ ধরনের ঘটনার পেছনে দায়ী।

আইনজীবীদের মতে, কোনো আসামিকে গ্রেফতারের পর পুলিশ ১৬১ ধারায় যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়, সেটার কোনো গুরুত্ব নেই। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনই নেই। ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আদালতে যে জবানবন্দি দেয়া হয়ে থাকে, সেটার গুরুত্ব রয়েছে। অপরাধ প্রমাণে যথাযথ সাক্ষী, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট, অভিযোগপত্র, অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত এবং আইনি যুক্তিতর্কের বিষয় জড়িত। কিন্তু কিছু চাঞ্চল্যকর মামলা প্রমাণে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এই জবানবন্দি সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী প্রমাণ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালের কিছু ঘটনায় ১৬১ ও ১৬৪ ধারার জবানবন্দি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

যা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জে

নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার ১৫ বছরের এক স্কুলছাত্রী গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ওই স্কুলছাত্রীর বাবা। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় স্কুলছাত্রীর বাবা অপহরণ মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২) এবং তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে (১৯)।

ওইদিনই তাদের গ্রেফতার করা হয়। দুদিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)। পুলিশ জানায়, স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এ ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

কিন্তু ঘটনার ৫১ দিন পর ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ সেই স্কুলছাত্রীকে। সে নিজে তার মাকে ফোন করে কথা বলে। বাবা-মা এতে অবাক হয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান। পরে স্কুলছাত্রীকে নিয়ে তারা থানায় হাজির হন। তাদের সঙ্গে ছিলেন কিশোরীর স্বামীও।

তাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত এবং আদালতে দেয়া জবানবন্দিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে তিন আসামির কাছ থেকে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায় এবং ঘুষ গ্রহণের কারণে তদন্ত কর্মকর্তা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামীমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট

চট্টগ্রামের ঘটনা

অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের হালিশহর থানার পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করে। এ মামলায় ২৫ এপ্রিল জীবন চক্রবর্তী ও দুর্জয় আচার্য নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। জীবন চক্রবর্তী ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার জবানবন্দিতে বলা হয়, তিনি গাঁজা খাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিলীপ রায় নামের ওই ব্যক্তিকে ‘হত্যা’ করেছেন।

ঘটনার পরে ওই বছরের ১ মে দিলীপ রায়কে জীবিত অবস্থায় একই বিচারকের সামনে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট দিলীপকে নিজ জিম্মায় এবং পুলিশকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে আরেক আসামি দুর্জয় চক্রবর্তী হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করলে বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এ ঘটনায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং ওই ব্যক্তিসহ চারজনকে তলব করেছেন হাইকোর্ট। আগামী ২২ অক্টোবর তাদের সশরীরে হাইকোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিস্ময়কর বরিশালের ঘটনাও

বরিশাল সদর উপজেলার বুখাইনগর গ্রামে ২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে দলিল লেখক রেজাউল করিম রিয়াজকে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন ১৯ এপ্রিল রিয়াজের স্ত্রী আমিনা বেগম লিজাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) বশির আহমেদ। ২০ এপ্রিল লিজা তার পরকীয়া প্রেমিক মাসুমকে নিয়ে স্বামী হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।

কিন্তু পরে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অধিকতর তদন্তে গ্রেফতার হওয়া তিন সিঁধেল চোর গত ২৮ আগস্ট দেয়া জবানবন্দিতে জানান, ঘরে চুরি করতে ঢুকলে রিয়াজ জেগে ওঠায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন তারা।

পরে লিজা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, এসআই বশির আহমেদ তাকে অমানুষিক নির্যাতন করে আদালতে জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেন। এ নিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ‘নির্যাতন করে স্বামী হত্যার স্বীকারোক্তি আদায়’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

পরে ‘নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে দায়িত্ব পালন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার’র অভিযোগ বিভাগীয় তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এসআই বশির আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনা তদন্তে কমিটিও গঠন হয়েছে।

এছাড়া, টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার আসামিদের ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় এবং গুলি চালিয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার বহু অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় প্রদীপের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা বিচার চেয়ে মামলা করেছেন। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

কেন ঘটছে এ ধরনের ঘটনা?

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলার সঠিক তদন্ত না করে পুলিশ সন্দেহজনক ব্যক্তিদের গ্রেফতারের পর নির্যাতন চালিয়ে ঘটনার স্বীকারোক্তি আদায় করাচ্ছে। স্বীকারোক্তি দিতে না চাইলে ক্রসফায়ারে হত্যার হমকি দেয়া হচ্ছে। ফলে জীবন বাঁচাতে অনেকেই পুলিশের দেয়া বক্তব্য স্বীকার করে নিচ্ছে। এমনকি আদালতেও তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন। কারণ আদালতে স্বীকারোক্তি না দিলে পুনরায় রিমান্ডে এনে তাদের নির্যাতন, এমনকি অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারের নামে ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। এ ভয়ে আদালতে তারা স্বীকারোক্তি দেন। ফলে মামলার তদন্ত সঠিক পথে এগোয় না। প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়ে যায়। সঠিক ঘটনা কোনোভাবে প্রকাশ না পেলে অপরাধ না করেও মিথ্যা মামলায় সাজা পেতে হয়।

আইনজীবীদের মতামত

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, স্বীকারোক্তি আদায় আইনে বলা আছে যে, কোনো রকম কাউকে প্ররোচনা, প্রলোভন, ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা যাবে না। অথচ এখন আমাদের এখানে একটি ট্রেন্ড হয়ে গেছে, আসামি গ্রেফতার হলেই রিমান্ডে নেয়া, স্বীকারোক্তি গ্রহণ করা। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে দেখা গেলো ‘একজনকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার’ পর ওই কিশোরী ফিরে এসে বলছে যে, আমি জীবিত। এমন স্বীকারোক্তি আদায় করার চেয়ে না করাই ভালো। এমন কার্যকলাপ শেষ পর্যন্ত টোটাল বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

এস এম শাহজাহান আরও বলেন, ‘সবকিছুতেই স্বীকারোক্তি বা জবানবন্দি থাকতে হবে, এমন নয়। মূল কথা, জবানবন্দি বা স্বীকারোক্তিটা হতে হবে পবিত্র। এটা হবে যে, আমি অনুতপ্ত, তাই স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করছি। কারণ স্বীকারোক্তির প্রধান কাজটিই হলো, আমি স্বেচ্ছায় নিজের দোষ স্বীকার করছি, কেউ কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করেনি। আর এই দেশে এমন কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে না, যেটাতে চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। স্বীকারোক্তি মানেই হলো তাকে মারপিট করে কোর্টে পাঠিয়ে স্বীকার করানো যে, আমি এটা করেছি। আমি দোষ স্বীকার করানোর জন্য মারছি, যেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (আইও) অন্য কোনো দিকে যাওয়া না লাগে।’

সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, ইদানীং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর (পুলিশ, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি, র‌্যাব) সবাই স্বীকারোক্তি আদায় করছে। এমন প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য স্বীকারোক্তির ব্যাপারে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশনা দিতে পারেন।

তিনি বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরি মেরে হত্যা করেছে, ৫-৭ জন সাক্ষী আছে, এজাহারে বলছে যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর আসামিকে রিমান্ডে নিলাম, পরে সে আদালতে এসে বলছে যে, হ্যাঁ আমিই হত্যা করেছি। স্বীকারোক্তি হয় যেটা ক্লুলেস, যেটার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষী নেই, যেমন ডাকাতি কেইস- রাতের বেলা ঘটছে, কাউকে চেনেনি। ডাকাত মালসহ ধরা পড়লো, সে কোর্টে গিয়ে বললো যে, আমি ঘটনা ঘটিয়েছি। সেই মামলার তদন্তের স্বার্থে রিমান্ডে নিতে পারে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী স্বীকারোক্তি নিতে পারে।

‘এখন মামলা হলেই যদি স্বীকারোক্তি হয়, রিমান্ডে নেয় আর চার্জশিট দেয়, তা হলে আদালত কোথায় যাবে? কয়টা দেখবে, কয়টা জানবে? আদালত কী করতে পারে? তবে হাইকোর্টের কিছু কিছু বেঞ্চ সাম্প্রতিককালে এসব বিষয়ে খুব টেক আপ করছেন। সুয়োমোটো (স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে) হোক আর কারও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হোক, এটা খুব ভালো দিক। আর টেক আপ করে আদালতের এটাও করতে হবে, যেন এ ধরনের স্বীকারোক্তি আদায়ের ব্যবস্থাটা রোধ করা যায়’— বলেন এস এম শাহজাহান।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়্যারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ফৌজদারি আইনে স্বীকারোক্তির যে বিষয়টা আছে, অপরাধীদের স্বীকারোক্তির বেসিসে সাজাটা নিশ্চিত করা যায়। তবে আমরা দেখেছি যে, প্রথম প্রথম এটি খুব সামান্য ছিল, পুলিশ এটার অপব্যবহার করতো কম। সেটার পার্সেন্টিজ ছিল ২ থেকে ৫ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার পর থেকে যখন প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানো শুরু হয়, ওই সময় থেকে কিন্তু স্বীকারোক্তির প্রচলনটাও বেশি হতে থাকে। অর্থাৎ পুলিশকে এই স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, এখন পুলিশ তাদের সুবিধা মতো মামলায় স্বীকারোক্তির হাতিয়ারটা খুব করে ব্যবহার করছে।

‘কারণ যখন একজনকে কোনো কাজে চাকু দেয়া হলো, নির্দিষ্ট একটি জিনিস কাটার জন্য, সে তো ওই চাকুটা দিয়ে কাটাকাটি শিখে গেল। এখন সে তার প্রয়োজনে চাকু দিয়ে অন্য কিছু কাটবে। এটাই তো স্বাভাবিক। যেটা ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে হয়েছে। আমরা অহরহ আদালতে বলে থাকি কিন্তু সব সময় আদালতও বিবেচনায় নিতে পারেন না। যেমন ধরুন, মামলার আধিকাংশই বানানো, (এফআইআর) কম্পিউটারে টাইপ করা। যেহেতু এটা এফআইআর, সেহেতু আদালত এগুলোকে মামলা হিসেবেই ধরে নিচ্ছেন। আর আগে পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন সেই হাতিয়ারটা অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে।’

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ধরুন, কথা মতো টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেবে, টাকা না দিলে মাদকের মামলায়, হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে। এখন এই স্বীকারোক্তি, সেটাও এখন আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। এটা যে আইনের শাসনের জন্য কতোটা ভয়াবহ, এটা কি কেউ বিবেচনায় নিচ্ছেন? এটা আমার প্রশ্ন?’

‘কারণ হলো, দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনের শাসন যদি না থাকে, দেশের যে অরাজকতা হবে সেটা থেকে দেশের সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিক কেউই রক্ষা পাবে না। অতএব আমাদের টার্গেট থাকা দরকার, কোনো রকমের যেন আইনের বিধিগুলোকে অপব্যবহার না করা হয়। যে কয়েকটি ঘটনা বের হয়েছে, আরও বের হবে। এটা কীভাবে রোধ করা যায় সেটা নিয়ে সরকার, আইন-শৃ্ঙ্খলা বাহিনীসহ সকলকে ভাবতে হবে। তা না হলে এটা আমাদের জন্য সুখকর হবে না।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক বলেন, ‘স্বীকারোক্তি আদায়ের কিন্তু অনেকগুলো নিয়ম রয়েছে। তাকে বসে সময় দিতে হবে, তাকে কেউ কোনো ভয়ভীতি প্রদর্শন করবে না, ম্যাজিস্ট্রেটকে সার্টিফাই করতে হবে যে তিনি দেখেছেন, তার দেহের মধ্যে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। এটির জন্য একটি ফরম রয়েছে, বিস্তারিত বলা রয়েছে সেই ফরমে।’

তিনি বলেন, সম্প্রতি যেটা ঘটেছে, দেখা গেছে হুবহু একই স্বীকারোক্তি একই সময়ে তিনজন দিয়েছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে তলবও করা হয়েছে আমাদের হাইকোর্টে। পুরো জিনিসটাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, এখানে অনেক রকমের অন্যায় বা জোর করে স্বীকারোক্তি নেয়া হয়। নারায়ণগঞ্জের একটি ঘটনায় আমরা দেখলাম যে, ধর্ষণের পর মেরে ফেলেছে বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। অথচ সেটি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও অনেক সাবধান হওয়া উচিত। আর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদেরও এ বিষয়ে ভাবতে হবে যে, তাদের কাছে যে স্বীকারোক্তিটা দিচ্ছে সেটার বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। এই গুরুত্বটা তাদের বোঝানো দরকার, এটার ওপর কিন্তু একটা মানুষের বেঁচে থাকা বা শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন থেকে অন্য যেকোনো সাজা) হতে পারে।

এ আইনজীবী মনে করেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও আরও সাবধান হওয়া উচিত। কারণ যেকোনো ঘটনায় তারা স্বীকারোক্তি নিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু পরে এটা যদি না মেলে, তা হলে নিজের, আসামির আইনজীবীর, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি)— সবাইকে সমস্যায় পড়তে হবে। এতে পুরো সিস্টেমটাই কলাপস করবে (ভেঙে পড়বে)।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি অপরাধের মামলার সবগুলোতে রিমান্ড-স্বীকারোক্তির প্রয়োজন নেই। আর ম্যাজিস্ট্রেট যদি স্বীকারোক্তি নেন, তাহলে আসামিকে ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে রেখে সচেতনতার সঙ্গে স্বীকারোক্তি গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেন পরবর্তীতে এটা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন না ওঠে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *