প্রস্তুত গণপরিবহন খুলছে দোকানপাট

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় গত ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ। যা চলবে আজ বুধবার মধ্যরাত পর্যন্ত। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জাতীয় কারিকরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশে জাতীয় জরুরি সেবায় নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ধরণের গণপরিবহন বন্ধে এ বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে চরম দুর্ভোগে পড়েন নিম্নআয়ের মানুষসহ গণপরিবহন ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এতে বেকায় হয়ে পড়েন শ্রমিকরা। এমন বাস্তবতার মধ্যেই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ‘পবিত্র ঈদুল আজহা’ কড়া নাড়তে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহা উপলক্ষে চলমান বিধিনিষেধ আজ ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত শিথিল করে প্রজ্ঞাপণ জারি করেছে সরকার। বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার খবরে স্বস্তি ফিরেছে গণপরিবহন খাতে জড়িত মালিক-শ্রমিকদের মাঝে। একই সঙ্গে ঈদের আগে ৮ দিনের জন্য মার্কেট শপিংমল খোলার খবরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কর্মচারিদের মাঝেও হাসি ফুটছে। ঈদের আগে বিধিনিষেধ শিথিল করে মার্কেটের দোকানপাট খোলাসহ গণপরিবহন চালু করার বিষয়ে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন এসব খাতের সংশ্লিষ্টরা। এমন বার্তা পেয়েই গতকাল মঙ্গলবার থেকেই সরব হয়ে উঠেছে রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাস-লেগুনার স্ট্যান্ডগুলো। ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিশ্চিতে ইতোমধ্যেই বাস টার্মিনালগুলোতে অলস পড়ে থাকা দুরপাল্লার বাস ও অভ্যন্তরীন রুটে চলাচলকারী বাস-লেগুনাগুলো সচল করতে চলছে শেষ মুহূর্তে ঘষা-মাজার কাজ। এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ ঘিরে অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা বেশি যাত্রী পরিবহনে সড়কে লক্কর-ঝক্কর বাস নামানোর অপচেষ্টা চলছে বলে আশঙ্কা করছেন খোদ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কে যানজট-দুর্ঘটনা এড়াতে এবং আনফিট গাড়ি রোধে তৎপর রয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। গতকাল মঙ্গলবার ও আজ বুধবার রাজধানীর বাস টার্মিনাল-স্ট্যান্ড ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন
গতকাল মঙ্গলবার সকালে গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, বাস টার্মিনাল এলাকায় সারিবদ্ধভাবে অলস পড়ে রয়েছে দূরপাল্লার বাস। ঈদুল আজহা উপলক্ষে আজ বুধবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত চলমান বিধিনিষেধ শিথিলের খবরে সরব হয়ে উঠেছে গাবতলী বাস টার্মিনাল চত্বর। পরিবহন ব্যবসায়ীরা তাদের বাস চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই ভোর থেকেই পরিবহন শ্রমিকরা জড়ো হচ্ছে বাস টার্মিনাল এলাকায়। অপরদিকে গাবতলী-বাবুবাজার রুটে চলাচলকারী লেগুনাগুলো সচল করতে লালবাগের নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে লেগুনা স্ট্যান্ডে পড়ে থাকা লেগুনাগুলোর যন্ত্রাশং খুলে মেরামতের কাজ করছেন মেকানিক মিস্ত্রি ইয়াছিন, নানাভাই, দুলাল ও আকাশ। অনেক গাড়ির রং নষ্ট হওয়ায় সেইসব গাড়ির বডিতে ডেন্ডিং করে রং করতে দেখা গেছে। মেকানিক মিস্ত্রির সহযোগি ইমরান হোসেন বলেছে, গাড়ি বন্ধ থাকায় আয়ের পথও বন্ধ ছিল। বিধিনিষেধ শিথিল করায় এখন কিছুটা হলেও স্বস্তিবোধ করছি।
গাবতলীর পরিবহন শ্রমিক রুবেল বলেন, সরকারের কঠোর লকডাউনে আমরা বিপদে পড়েছি। টানা লকডাউনে পরিবার নিয়ে না খেয়ে দিন পার করেছি। আমি নিজেও অনেক দিন না খেয়েছিলাম। কিন্তু কেউ খোঁজ নেয়নি। আমরা কাজ করলে টাকা পাই আর সেই টাকা দিয়েই সংসার চালাই। কিন্তু এতোদিন লকডাউনে আমাদের কেউ খোঁজ-খবর রাখেনি। প্রত্যেক পরিবহন মালিকই ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে গাড়ি কিনেছে। পরিবহন মালিকরা নিজেরাই ঠিক মতো ঋণের টাকা দিতে পারে না। তাহলে আমাদের দেবে কিভাবে।

 

বাসচালক শাহ আলম বলেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্তে আমরা খুশি। করোনায় মরে গেলে যাবো, কিন্তু ক্ষুধার যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। খুব কষ্টে দিন পার করছি। পুরো পরিবার নিয়ে অসহায়ভাবে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের আয় বন্ধ ঠিকই, কিন্তু পরিবারের খরচ তো আর বন্ধ নেই। ধার দেনা করে আমাদের সংসার চালাতে হচ্ছে। এইভাবে আর কতদিন চলবো? গাবতলীতে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাসগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলছে। গাড়িগুলো ঠিকঠাক আছে কি না তা দেখে নিচ্ছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এছাড়া অনেক গাড়ি মেরামতের কাজও করছেন মালিকরা। একই চিত্র দেখা গেছে, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায়।
এদিকে নিউ সুপার মার্কেটের দোকানি আব্দুল মতিন বলেন, চলমান বিধিনিষেধে দোকানপাট বন্ধ থাকায় আমাদের ‘নূন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা হয়েছে। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। বেঁচে থাকার তাগিদে কারও কাছে হাতও পাততে পারিনি। কেউ আমার খোঁজ-খবরও রাখেনি। খেয়ে আছি, নাকি না খেয়ে আছি, কেউ জিজ্ঞেসও করেনি। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে টাকা ধার করে চলছি। দোকানে ৪ জন কর্মচারি রয়েছে। এদের বেতনাদি ও দোকান ভাড়া কীভাবে দেব, এটা নিয়েও মানিসকভাবে বিষন্নতায় ভুগছি। তবে বিধিনিষেধ শিথিল করায় কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে দোকান খুলে বেচাবিক্রি করতে পারলে হয়তো কিছুটা হলেও আর্থিক সংকট থেকে মুক্তি পাবেন বলে জানান আব্দুল মতিন।
উল্লেখ্য, করোনার সংক্রমণ রোধে গত ২৪ জুন জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সারা দেশে ১৪ দিনের ‘শাটডাউন’ এর সুপারিশ করা হয়। কমিটির সুপারিশে গত ২৮ জুন থেকে ৩০ জুন তিন দিন সীমিত পরিসরে লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। এরপর সাম্প্রতিক সময়ে আরোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশে গত ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী শুরু হয় সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ। এর আওতায় বন্ধ করা হয় গণপরিবহ চলাচল ও শপিংমল-দোকানপাট। কিন্তু দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং মানুষের জীবন-জীবিকার কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে আজ বুধবার মধ্যরাত থেকে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করেছে সরকার। এমন খবরে স্বস্তি ফিরেছে পরিবহন ও ব্যবসায়ী খাতের সংশ্লিষ্টদের মাঝে।

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *