প্রাণ ফিরে পাক ঢাকা

মতামত

এটি খুবই আশাপ্রদ খবর যে, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব (খাল ও ড্রেনেজ) আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

ফলে এখন থেকে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের পুরো দায়িত্ব পেল দুই সিটি করপোরেশন। আগে এ দায়িত্বের বেশিরভাগ পালন করতো ঢাকা ওয়াসা। ফলে কোন সংস্থা কী দেখভাল করবে এ নিয়ে দ্বন্দ্বের অবসান হলো আপাত।

ঢাকার ইতিহাস প্রায় চারশ বছরের। প্রত্মতাত্ত্বিকরাও ইতিহাসবিদের মতে মোগল আমল ছাড়াও চারবার এ শহর রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। সেই সময় ঢাকা ছিল এক নয়নাভিরাম নগরী। নাগরিক অনেক সুযোগ সুবিধাই অবারিত ছিল। বুড়িগঙ্গার তীরে বেড়ে ওঠা ঢাকা নগরী এখন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীর মর্যাদা লাভের পর ঢাকার যে সমৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল আকারে তা হলেও নাগরিক সুযোগ সুবিধা এবং শিল্পিত মানের দিক থেকে তা হয়নি। বরং বেড়ে ওঠা ঢাকা যেন ক্রমেই ইট-কাঠ পাথরের জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

 আমাদের চাঁদ সূর্য, শীত বর্ষা আড়ালে চলে গেল। পুঁথিগত বিদ্যাটাকে ধ্রুবজ্ঞানে বিশ্বাস করার যে কি ফল তা আমাদের শহরের নানা অংশের স্থাপত্যরীতি দেখলেই বোঝা যায় অবশ্য 

আন্তর্জাতিক সংস্থার নানা জরিপেও ঢাকার স্থান তলানিতে। অবশ্য ভুক্তভোগী রাজধানীবাসীর এটি বোঝার জন্য জরিপের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন দৈব দুর্বিপাকে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তারা কী এক ভয়ানক অবস্থার মধ্যে আছে। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত নগরায়ণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে।

জীবনযাত্রার অনিবার্য প্রয়োজনে মানুষ এখন নগরমুখী। সে কারণেই নগরায়ণকে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও সুষম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা যায়, নগরজীবনকে স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও উন্নয়নমুখী করা এখন সময়ের দাবি।

আসলে পরিকল্পিত নগর বলতে বোঝায় একটি পরিকল্পিত জনবসতি। যার সবকিছু হবে পরিকল্পনা অনুযায়ী। কোথায় স্কুল-কলেজ হাসপাতাল হবে, অফিস আদালত কোথায়, কোথায় বসবাসের জায়গা সবকিছুই হবে পরিকল্পনামাফিক। পরিকল্পনামাফিক সবকিছু হলে প্রত্যেক নগরেই মানুষ শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।

এতে তার নাগরিক জীবন হয় মর্যাদাপূর্ণ, গ্রাম কিংবা মফঃস্বলের তুলনায় উন্নততর, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু এই নগরই আবার পরিকল্পনাহীনভাবে বেড়ে উঠলে তাতে নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। জনজীবনকে তা বিপর্যস্ত করে ফেলে। মানুষের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না।

শহরের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এর মান নির্ণয় করে। এর মধ্যে রয়েছে- নগরীতে বসবাসের সুযোগ সুবিধা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষাব্যবস্থা, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা, অপরাধের হার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিবেশ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোর গুণগতমান, পানি সরবরাহের মান, খাদ্য, পানীয়, ভোক্তাপণ্য এবং সেবা, সরকারি বাসগৃহের প্রাপ্যতা ইত্যাদি। এসব দিক থেকে আমাদের নগরগুলোর কী অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এছাড়া ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে অন্য জরিপে প্রকাশ পেয়েছে ঢাকা বিশ্বের দূষিত নগরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর করুণ অবস্থায় এই জরিপের সত্যতা প্রমাণে যথেষ্ট। এছাড়া যানজট, যানবাহন এবং কলকারখানার কালো ধোঁয়া, ট্যানারি বর্জ্য, খাদ্যে ভেজাল, সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানও ঢাকার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে ন্যুব্জ এ শহরে নেই পয়ঃনিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা।

জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট, হাসপাতাল স্কুল-কলেজ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি নাগরিকসেবা পাওয়া যাচ্ছে না। সবকিছুতেই পরিকল্পনাহীনতার ছাপ। অথচ রাজধানী ঢাকাই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। দেশের এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এখন শহরে বাস করছে।

এতে নগরী তার বিশিষ্টতা হারাচ্ছে। এক জগাখিচুরি অবস্থায় রাজধানীবাসী এখানে বাস করছে। ফলে অনেক নাগরিক সুবিধা থেকেই তারা বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য এই নগরী যেন নরকতুল্য। খেলার মাঠ নেই, নেই জলাশয়। সবুজ গাছগাছালির দেখা মেলাও ভার।

দুই. মানুষের হাঁটার চেয়েও গড় গতি কম যানবাহনের। এ অবস্থায় যানজট ঢাকা নগরীকে কার্যত এক অচল এবং স্থবির নগরীতে পরিণত করেছে। এটি একটি স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়ায় পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। যানজট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতিদিনই অনেক কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।

পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অগ্রগতি। শুধু তাই নয়, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণে নানা সংক্রামক ব্যাধিতেও আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক মানুষ। যানজটে নগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে দিন দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সব রুটে যাত্রীদের চলাচলে কমপক্ষে ৩ কর্মঘণ্টা সময় অপচয় হয় প্রতিদিন। যানজটের কারণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিরও অপচয় হয়।

কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময় নানামুখী কর্মসূচি-পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই কম। ফলে সমস্যা যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে। অথচ দুর্বিষহ যানজটের জন্য পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকেই দায়ী করা হয়।

রাজধানীতে দিন দিন জনসংখ্যা বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তাঘাট বাড়ছে না। ফলে যানজট এক অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এছাড়া নিয়মের ব্যত্যয় হওয়ায় যানজট থেকে মুক্তি পাচ্ছে না রাজধানীবাসী। যানজট নিয়ন্ত্রণে কঠোর ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ, প্রাইভেটকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, যত্রতত্র প্রাইভেটকার পার্কিং নিষিদ্ধ করা, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীপথ এবং ঢাকার ভেতরের খাল দখলমুক্ত করে নৌপথের উন্নয়ন করা, রিকশামুক্ত সড়কসহ নানা পরিকল্পনার কথা বলা হয়।

কিন্তু এগুলো নিয়ে কথাবার্তা যতটা হয় কাজ ততটা হয় না যে তা যানজটের বর্তমান হালই বলে দিচ্ছে। কিন্তু যানজট এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। যানজট বর্তমান নগরবাসীকে স্থবির ও অচল করে রেখেছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফলাফল যে অত্যন্ত ভয়াবহ হবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

তিন. শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য পানিতে মিশে ঢাকার পরিবেশকে করে তুলছে বিষাক্ত। হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে সরিয়ে নেয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দূষণ চলছেই। বুড়িগঙ্গাকে বলা হয় ঢাকার প্রাণ। কিন্তু দখল দূষণে এ নদীর অবস্থা এখন বড়ই করুণ। বিশেষ করে ট্যানারির বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে তাতে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে হলে ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য যাতে নদীতে আর না পড়তে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক: ড. হারুন রশীদ, সহকারী সম্পাদক (জাগো নিউজ)

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *