প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি

অর্থ-বাণিজ্য কর্পোরেট কর্ণার

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ- পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরকষাকষির দক্ষতা বৃদ্ধি, রফতানিমুখী পণ্যের বহুমুখীকরণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলে জানান তারা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত গতকালের এক ওয়েবিনারে এসব মতামত তুলে ধরা হয়।

‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রা’ শীর্ষক এই ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন এবং দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান।

ওয়েবিনারে আলোচকরা বলেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা গ্রহণ, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা প্রয়োজন। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের একযোগে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি নিয়ে ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে ওয়েবিনারে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী আমাদের পণ্য উৎপাদন ব্যয় খুব বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। তবে আমাদের প্রতিযোগী সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য এশীয় ও আঞ্চলিক দেশগুলোর বাজারের প্রতি আরো বেশি হারে মনোনিবেশ করার জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশ সুরক্ষা ও শিল্পায়নে বাংলাদেশ এরই মধ্যে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে, যার ফলে সারা বিশ্বের ১০টি সেরা সবুজ কারখানার মধ্যে সাতটিই আমাদের দেশে রয়েছে—এমন তথ্য উল্লেখ করে মুখ্য সচিব বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবার সহযোগিতা নিশ্চিতকল্পে এরই মধ্যে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কমিটি সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানে সক্ষম হবে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেসরকারি খাতের অবদান থাকবে প্রায় ৮১ শতাংশ। এজন্য দেশীয় উদ্যোক্তাদের আত্মবিশাস বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। যদিও এজন্য বাংলাদেশের আরো পাঁচ বছর সময় রয়েছে।

দেশের মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা গ্রহণের জন্য সবাইকে প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে রফতানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের প্রতি আরো বেশি হারে মনোনিবেশ করার জন্য উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান সচিব। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের পর আরো ১২ বছর বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য সরকার ডব্লিউটিওর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ১১টি দেশের সঙ্গে পিটিএ এবং এফটিএ চুক্তির জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

সরকার ঘোষিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোরারোপ করে নিটওয়্যার ও ওভেন শিল্পের ভ্যালু অ্যাডিশনের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রস্তাব করেন এফবিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, এলডিসি-পরবর্তী টিকে থাকার জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের আরো বিকাশ একান্ত অপরিহার্য। এসব বিষয়ে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ওপর জোরারোপ করেন তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, এলডিসি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে খাত ও বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠন করতে হবে। এ সময় চেম্বার সভাপতি বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণ, বিনিয়োগ-ডিজিপি হার বৃদ্ধি, করহার-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়নের ওপর জোরারোপ করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের ঘাটতি কমাতে রিজিওনাল কানেক্টিভিটিসহ কৌশলগত পিটিএ এবং এফটিএ স্বাক্ষরের ওপর জোরারোপ করেন।

ডব্লিউটিওর এলডিসি ইউনিট অব দ্য ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের প্রধান তৌফিকুর রহমান বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। তবে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করতে হবে।

এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবীর বলেন, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সরকারের দিকনির্দেশনা খুবই জরুরি। সেইসঙ্গে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে ডায়ালগ আরো বৃদ্ধি করতে হবে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদের দুর্নীতি কমানো ও বিদেশে পুঁজি পাচার রোধ করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রফতানিমুখী পণ্যের জন্য সহায়ক নীতিমালা প্রদানের পাশাপাশি বাংলাদেশের নতুন সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তিনি।

ওয়েবিনারে ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি এনকেএ মবিন ও সহসভাপতি মনোয়ার হোসেনসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অংশ নেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *