ফকিরহাটে ব্যাগিং পদ্ধতির বেগুন চাষে সাবলম্বী কৃষক

সারাবাংলা

সাগর মল্লিক, ফকিরহাট থেকে : বাগেরহাটের ফকিরহাটে ব্যাগিং পদ্ধতির বেগুন চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রথম পর্যায়ে একজন কৃষক পরীক্ষামূলক ভাবে এই পদ্ধতিতে বেগুনের চাষাবাদ করলেও এক বছরের মাথায় গিয়ে সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ জনে। আর ২০ জনই সাবলম্বী। ফকিরহাট উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে উপজেলার প্রান্তিক কৃষকদের ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আর সেই মোতাবেক উপজেলার বেতাগায় পরীক্ষামূলক ভাবে এই পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করা হয়। ব্যাগিং পদ্ধতির বেগুন চাষে কোন প্রকার কিটনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে না। যার কারণে বাজারে এই বেগুনের চাহিদাও অনেক। উপজেলায় বর্তমানে ২০ জন চাষী ৩৪,৫০০ চারায় এই পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করছে। ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ আমাদের দেশে একেবারেই নতুন একটি পদ্ধতি। আর আগে ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষী ও বাগান মালিকরা। সেই ধারাবাহিকতায় রোগবালাই ও পোকার সংক্রমণ থেকে বেগুন রক্ষায় শুরু হয়েছে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ। এই পদ্ধতির চাষে কোন ধরণের বালাইনাশকের ব্যবহার ছাড়াই ভালমানের বেগুন উৎপাদন করা সম্ভব। এই প্রযুক্তিতে বালাইনাশক স্প্রে করার প্রয়োজন নেই। কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে বেগুনে পলিব্যাগ ব্যবহার করা হয়। আর এই ব্যাগ যত্ন সহকারে ব্যবহার করলে ৫ বছর ব্যবহার করা যাবে।
তবে যদি কোন পলিব্যাগ ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে যায়, তবে তা একত্রিত করে গর্তে ফেলে আগুন ধরিয়ে মাটি দিয়ে বুজিয়ে ফেলানো হয়। ফলে পরিবেশের ও কোন ক্ষতি হয় না। এই পদ্ধতিতে বেগুন উৎপাদনে একদিকে যেমন ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষ পাচ্ছে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি। দেশে যত সবজি উৎপাদন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় বেগুনে। এরপরও শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ বেগুন নষ্ট হয় পোকার আক্রমণে।
উপজেলার বেতাগা ইউনিয়নের ধনপোতা গ্রামের চাষী সরজিৎ পাল বলেন,২০১৮ সালে উপজেলা কৃষি অফিসের একটা প্রশিক্ষণে যোগ দেই। যেখানে বেগুনের উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে পারি। তখন কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় আমি ব্যাগিং পদ্ধতিতে বেগুন চাষ শুরু করি। তাতে আমি ভাবতেও পারিনি এই পদ্ধতির চাষে প্রথম হিসাবে এতটা সাবলম্বী হতে পারবো। এর আগে ৩ বছর আমি নরমাল পদ্ধতিতে বেগুন চাষ করতাম, তাতে প্রতি মণে পোকামাকরে নষ্ট বেগুন হতো প্রায় ৮-৯ কেজি। আর এই পদ্ধতির চাষে প্রতি মণে বেগুন পোকামাকড়ে নষ্ট হচ্ছে মাত্র ২-৩ কেজি।
কৃষক সরজিৎ পালের সাফল্য দেখে উদ্ভুদ্ধ হওয়া কৃষক শংকর কুমার, রিপন কুমার পাল, সুবল ও আনন্দ কুমার বলেন, প্রথমে ভেবেছি এই পদ্ধতির চাষে লাভ হয় কিনা? এমন দ্বিধার কারণে সাহস পায়নি। তবে সরজিৎ পালের সাফল্য দেখে আমরাও উদ্ভুদ্ধ হয়ে এই পদ্ধতিতে বেগুন চাষ শুরু করি। আর এই পদ্ধতির চাষে ব্যাপক ফলন যেমন হয়েছে তেমন আগের তুলনায় বহুগুণ কমেছে বেগুন নষ্টের সংখ্যা।
এ ব্যপারে ফকিরহাট উপজেলা কৃষি অধিদফতর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তন্ময় দত্ত বলেন, আমরা কৃষকদের এই পদ্ধতির চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করি। আর তারই ধারাবাহিকতায় উপজেলার বেতাগায় পরীক্ষামূলকভাবে এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু হয়। আর এই পদ্ধতির চাষে কৃষকরাও সাবলম্বী হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাছরুল মিল্লাত বলেন, বেগুনের প্রধান শক্র ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য কৃষক মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। শুধু তাই নয়, এতে বেগুনের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি কুইনালফস বেগুনে পাওয়া গেছে। এই সমস্যাটি সমাধানে ব্যাগিং প্রযুক্তি প্রয়োগ করে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে বেগুনকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। আর ব্যাগ ব্যবহারের ফলে যেকোনো পাখি, ইঁদুর ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকেও বেগুন রক্ষা পাবে। ব্যাগের ব্যবহার শেষ হলে ব্যাগগুলো একসঙ্গে পুুড়িয়ে ফেলতে হয়। ব্যাগিং পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও বিষমুক্ত বেগুন উৎপাদন করা সম্ভব। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি এখন হাতের কাছে। চাইলে যে কেউ অন্যান্য ফল-ফসলে ব্যবহার করতে পারবেন। আমরা পরীক্ষামূলক ভাবে সফলতা পেয়েছি এই পদ্ধতির বেগুন চাষে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *