ফাতেমা হত্যাকাণ্ড আত্বহত্যা নয় : শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার আলামত

সারাবাংলা

এম এ আজিজ, ময়মনসিংহ অফিস:
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় গৃহবধূ ফাতেমা হত্যাকাণ্ডকে আত্বহত্যা বলে চালানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শ্বাসরুদ্ধ করে ফাতেমাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক প্রতিবেদন দিয়েছে। নিহতের স্বামী বোরহান উদ্দিন, শ্বশুর নুরুল ইসলাম, শাশুড়ি সুরুজ বানু, দেবর আবু হানিফা, বোন জামাই শহীদ মিয়া, মোহাম্মদ আলী, ননদ হালিমা বেগম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে নিহতের পিতা আবুল কাশেম পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেছেন। মামলায় শহীদ মিয়া, হালিমা বেগম ও মোহাম্মদ আলী এই তিনজনকে অন্তভুক্তির দাবি জানান। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, হালুয়াঘাটের বাইরে শিমূল গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে ৬ বছর আগে ধোবাউড়ার পশ্চিম মেকিয়ারকান্দার নুরুল ইসলামের ছেলে বোরহান উদ্দিনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে স্বামী বোরহান ও তার পরিবারের সদস্যরা যৌতুকের দাবিতে ফাতেমাকে নির্যাতন করে আসছিল। এরই মধ্যে রহমত আলী নামের এক ছেলে সন্তানে মা হন ফাতেমা। রহমত আলী জলে ডুবে মারা যায়। সন্তান জলে ডুবে মরার ঘটনায় ফাতেমার উপর নেমে আসে অমানষিক নির্যাতন। ফাতেমা আবারো গর্ভবর্তী হন। চলে মাত্রারিক্ত নির্যাতন। নির্যাতন বাড়তে থাকলে ফাতেমা তার পিত্রালয়ে চলে যান। পিত্রালয়ে অবস্থানকালে ফাতেমা ছেলে সন্তানের মা হন। ফাতেমা ছেলে সন্তানের মা হওয়ার খবর তার স্বামীর বাড়িতে নিয়ে গেলে স্বামী বোরহান ও তার পিতা নুরুল ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা ফাতেমাকে তাদের বাড়িতে জায়গা দিবে না বলে প্রকাশ্য হুংকার ছুড়েন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে গত বছরের ৩০ অক্টোবর ফাতেমাকে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যায় তারই শ্বশুর। স্বামীর বাড়িতে নেওয়ার পরপরই তাকে বাড়িতে উঠতে দেবে বলে স্বামী বোরহান, শ্বশুর নুরুল ইসলাম, দেবর হানিফ, শ্বাশুড়ি সুরুহ বানু অন্যরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে ফাতেমা স্বামীর বাড়িতে আশ্রয় পেলেও তার উপর চলে অমানষিক নির্যাতন। উপায়ান্তর না পেয়ে ফাতেমা তার উপর নির্যাতনের বর্বর চিত্র তুলে ধরে পিতার বাড়িতে সংবাদ পৌঁছায়। এরই মধ্যে একই বছরের ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় ফাতেমার বাবার কাছে সংবাদ আসে তার মেয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। সংবাদ পেয়ে রাতেই বাবা আবুল কাশেম তার মেয়ের বাড়িতে গিয়ে মেয়ের লাশ ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়েছেন।
ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুর সংবাদ ছড়ানো হলেও মেয়ের লাশ মাটিতে পড়ে থাকার ঘটনায় তার মেয়েকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে স্বামীর পরিবার। হত্যাকাণ্ডে মৃত্যু হয়েছে এমন দাবি করে নিহতের বাবা ধোবাউড়া থানায় হত্যা মামলা দায়েরের চেষ্টা করে। তবে চাপের মুখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ এর ৯-ক মানহানীকর কার্যকলাপের দ্বারা সম্ভ্রমহানির মাধ্যমে আত্মহত্যায় বাধ্য করার অপরাধ ধারায় ৮ (১১)২০২০ দায়ের করতে বাধ্য করা হয়। মামলায় স্বামী বোরহান উদ্দিন, শ্বশুর নুরুল ইসলাম, শাশুড়ি সুরুজ বানু, দেবর আবু হানিফাকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ অভিযুক্ত বোরহানকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে। আসামিরা সবাই জামিনে রয়েছে।
এদিকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে চিকিৎসক প্রতিবেদন দিয়েছে। মেয়ে ফাতেমাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে এমন তথ্য জানতে পেরে নিহতের বাবা মামলাটিকে হত্যা মামলা এবং আগের আসামিসহ শহীদ মিয়া, হালিমা বেগম ও মোহাম্মদ আলীকে আসামি হিসাবে সংযুক্ত করে হত্যার রহস্য উদঘাটন ও দোষিদের বিচার দাবি করেছেন। আবুল কালাম তার আবেদনে পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন- আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেনি, তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িতদের নাম ধীরে ধীরে অবগত হই। অপরদিকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়। মামলায় আগের আসামিদের সঙ্গে শহীদ মিয়া, হালিমা বেগম, মোহাম্মদ আলীকে সম্পৃক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। আবুল কাশেম বলেন, ঘাতক চক্রটি আমার মেয়েকে হত্যা শেষে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। তিনি আসামিদের ফাঁসি দাবি করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মলয় চক্রবর্তী জানান, যৌতুকের কারণে নির্যাতনে গৃহবধূ ফাতেমার মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় নারী ও শিশু আইনে ৯-ক ধারায় মামলা হয়েছে। মামলায় স্বামী বোরহানকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। বোরহানসহ সকলেই জামিনে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, যৌতুকের কারণে ফাতেমাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে, এটা নিশ্চিত। তদন্তে যাদের নাম পাওয়া যাবে তাদেরকে অভিযুক্ত করে যৌতুকের কারণে খুন ১১/ক ধারায় আদালতে চার্জসিট দেওয়া হবে। যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *