ফুটপাত ঘিরে বাবুবাজার-লালবাগে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
রাজধানীর পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজ-লালবাগের বেড়িবাঁধে কথিত ইজারার নামে পুলিশ ও ডিএসসিসি’র নাম ভাঙিয়ে ফুটপাত আর পরিবহন সেক্টর ঘিরে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। অভিযোগ উঠেছে, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে হকার্সলীগের কার্যালয়ে বসে এলাকার চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করছেন সংগঠনটির সভাপতি পিঞ্চু হাজী ও সাধারণ সম্পাদক আনসার ভূঁইয়া। তারা উভয়ে মামাতো-ফুফাতো ভাই। দুই শিফটে ভাগ হয়ে এ দু’জন বাদামতলী ফলের আড়তে ফল নিতে আসা পরিবহন আর ফুটপাতের হকার থেকে নানা কৌশলে চাঁদা আদায় করছেন। ইতোমধ্যেই আওয়ামী হকার্স লীগকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন শ্রম আদালত। এদিকে লালবাগের কিল্লার মোড় ও নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধ ঘিরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) জায়গায় ফার্ণিচার মার্কেট ও ফুটপাতে সাপ্তাহিক হলি মার্কেট বা মঙ্গলী মেলার নামে শত শত দোকান বসিয়ে লাখ লাখ টাকার চাঁদা আদায় করছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র। চক্রটি বলছে, ডিএসসিসি ও লালবাগের ডিসি অফিস থেকে অনুমোদন এনে হকার বসানো হচ্ছে। তবে পুলিশ ও ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, ফুটপাতে এখন আর কোন হকার বা দোকান বসতে এমনকি কোন অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কেউ দোকান বসালে বা চাঁদাবাজি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত শুক্রবার (৪ ডিসেম্বর) ও আজ মঙ্গলবার (৮ ডিসেম্বর) ঘটনাস্থল সরেজমিন ঘুরে হকারসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার বাবুবাজার ব্রিজের নিচে সরকারি জায়গা দখল করে প্রায় ৫শ দোকান বসিয়ে আর গাড়ি পাকিং ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সপ্তাহের প্রতিদিন সহস্রাধিক হকার বসিয়ে আর পণ্য ও গণপরিবহন থেকে লাখ লাখ টাকার চাঁদা তোলা হচ্ছে। সপ্তাহের শুক্রবার ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ব্রিজের নিচ থেকে মিটফোর্ড হাসপাতাল-চকবাজার রোডসহ আশপাশের গলিপথেও বসানো হচ্ছে নামিদামি ব্র্যান্ডের বাহারী মোড়কে মোড়ানো প্রসাধনীসহ নিত্যপণ্যের বাজার। প্রতি শুক্রবার ব্যস্ততম এ সড়কের দু’পাড়ের ফুটপাতে ১ হাজার থেকে প্রায় দেড় হাজার ছোটবড় দোকান বসাচ্ছেন চাঁদাবাজরা।

জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন পুরান ঢাকার লালবাগের নবাবগঞ্জ বেড়িবাঁধে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার ‘হলি ডে’ মার্কেটের নামে ব্যস্ত এ সড়কের একপাশের ফুটপাতে দোকান বসিয়ে বাণিজ্য করে আসছিল স্থানীয় একটি চক্র। ২ থেকে ৫ ফুটের জায়গায় চৌকি বা পলিথিন বিছিয়ে নানা ধরণের নিত্যপণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন হকাররা। দোকান প্রতি শ্রেণিভেদে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে আসছে ওই চক্রটি। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার হকার বসিয়ে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করছেন ঢাকা-৭ আসনের সাংসদ হাজি সেলিমের অনুসারি ও স্থানীয় ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মুকবুল হোসেনের আস্থাভাজন নবাবগঞ্জের পার্কসংলগ্ন চুনাওয়ালা গলির বাসিন্দা ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয় দানকারী জাকির হোসেন জাকির ওরফে চাঁদাবাজ জাকির। তিনিই ফুটপাতে কাকে বসাবেন, আর কাকে বসাবেন না, তা নির্ধারণ করে দেন। ২ থেকে ৫ ফিট দোকান বসালে দোকান প্রতি শ্রেণিভেদে ৩শ থেকে ৬শ টাকা হারে চাঁদা দিতে হয়। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে বসতে দেওয়া হয় না। বেড়িবাঁধের মঙ্গলী এ মার্কেটে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ হাজার হকার বসে বেচাকেনা করেন। দোকান চলে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বেচাবিক্রি হোক আর নাইবা হোক দুপুরের দিকেই প্রতি দোকান থেকে দৈনিক চাঁদার টাকা তুলে নেন জাকির, বাসেদ, মোকলেস, মাহাবুব, শাকিল, সোহেলমগ আরও অনেকে। এছাড়া কামরাঙ্গীরচরের পূর্ব রসুলপুর ৮নং গলির বেড়িবাঁধের সøুইচ গেটের দু’পাশে ২ লাখ টাকা জামানত নিয়ে রিকশা-ভ্যানের গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আদায় করছেন সরকার দলীয় নেতা পরিচয়দানকারী মো. সিরাজ তালুকদার ও ইমনসহ স্থানীয় আরও বেশকিছু নেতাকর্মী। এদিকে বেড়িবাঁধে চাঁদার টাকা উত্তোলন শেষে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার রাতেই নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন জাকিরসহ তার সহকর্মীরা। চাঁদার একটি অংশ পৌঁছে দেওয়া হয় লালবাগ থানায় এবং নবাবগঞ্জ সেকশন পুলিশ ফাঁড়িতে। এছাড়াও চাঁদাবাজিতে রয়েছে টহল পুলিশ ও আনসার সদস্যদের অপতৎপরতা। এছাড়া নবাবগঞ্জ ক্লাববাড়ির মদনার ক্ষেত বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ঢালে ত্রিপল ও তাবু টাঙিয়ে বাঁশ-খুঁটির ঘর তৈরি করে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ফার্ণিচার মার্কেট। এ মার্কেটে রয়েছে অর্ধশতাধিক দোকানপাট। পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ জমিতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এসব দোকান ঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে মাসিক গড়ে দোকান প্রতি ১০ হাজার থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ভাড়ায় দিয়েছেন। এ ফার্ণিচার মার্কেটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী বাসিন্দা সাগর, ইলিয়াস ও পাঠান।
ফার্ণিচার ব্যবসায়ীরা জানান, তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে লাখ টাকা জামানত দিয়ে মাসিক ভাড়ায় এসব দোকান চালাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে থানা ও ফাঁড়ি পুলিশ ঝামেলা করে। কিন্তু থানা ও ফাঁড়ি পুলিশের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে প্রতিমাসে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়। পুলিশের ঝামেলার বিষয়টি দেখেন ফার্ণিচার ব্যবসায়ী স্থানীয় প্রভাবশালী সাগর। সূত্র জানায়, প্রতি দোকান থেকে সাগরই চাঁদার টাকা তুলে লালবাগ থানা ও ফাঁড়ি পুলিশের নিকট পৌঁছে দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্ণিচার মার্কেট থেকে আদায়কৃত অর্থের মধ্যে লালবাগ থানায় ৩০ হাজার টাকা ও নবাবগঞ্জ সেকশন পুলিশ ফাঁড়িতে ১৫ হাজার টাকা মাশোহারা দিচ্ছেন ফুটপাতের এসব ফার্ণিচার ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়রা জানায়, ইতোপূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে অবৈধ দখলদারদের নামের তালিকা করে প্রথমে নোটিশ প্রদান করেন। ওই নোটিশেও দোকান না সরানোয় গত বছরে দু’দফা উচ্ছেদ কার্যক্রম চালিয়েছে সংস্থাটি। এরপর সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করলেও কয়েকদিন না যেতেই রাতের আধারে সেই সীমানা পিলার সরিয়ে রং তুলির দাগ মুছে আগের জায়গায় ফিরে এসেছে অবৈধ দখলদাররা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বাবুবাজার-মিটফোর্ড এলাকায় ফুটপাতে চাঁদা আদায়ের জন্য ২০-২২ জন লাইনম্যান নিয়োজিত রয়েছে। এদের মধ্যে মেহেদীর আপন ভাই ইউনুস, ভাগ্নে ছালাম ছাড়াও ফুটপাতের লাইনম্যান হিসেবে গৌতম, সোহেল, সালাহউদ্দিন, কালাম, ইউনুস মাঝি, রফিক, সাইফুল, জসিম, বাদশা, আনিস, কুদ্দুস, শহিদুল ও কালু অন্যতম। এসব লাইনম্যানদের দিয়ে বাবুবাজার পুলিশ ফাঁড়ি, নয়া সড়ক ফাঁড়ি, বংশাল ফাঁড়ির ইনচার্জ, কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার, কোতোয়ালী থানার ওসি, ওসির ড্রাইভারসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে ফুটপাতে সহস্রাধিক দোকান বসিয়ে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হচ্ছে। অবৈধ চাঁদা আদায়ে ভীতি প্রদর্শনে লাঠি হাতে ঘুরে বেড়ায় লাইনম্যানরা। হকারদের কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই ঘটে বিপত্তি। মালামাল ক্ষতিসাধনসহ প্রয়োজনে ওই হকারকে মরধর করতেও দ্বিধা করেন না তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাবুবাজার ব্রিজের নিচে আওয়ামী হকার্সলীগের অফিসের পেছনের সরকারি জায়গা দখল করে আরেকটি চাঁদাবাজ চক্র সেখানে প্রায় ৪শ দোকান বসিয়েছে। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া কয়েকজন যুবকের নেতৃত্বে ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। এই চাঁদাবাজদের আশপাশেই কোতোয়ালী ও বংশাল থানা পুলিশ ছাড়াও র‌্যাবের একটি টহল দলকেও পাহাড়া দিতে দেখা গেছে। কিন্তু কে দেবে বিচার। চাঁদাবাজদের দাপটে অনেকটাই অসহায় পরিবহন চালক-শ্রমিকসহ ফুটপাতের সাধারণ হকাররা। প্রতিদিন ভোরে দেশে বিভিন্ন জেলার ফল ব্যবসায়ীরা ট্রাক, কনটেইনার, কাভার্ডভ্যান, পিকআপভ্যান বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর নিচে পার্কিং করে। দেশের সবচে বড় ফলের পাইকারি মোকাম বাদামতলী থেকে ফল কিনে বোঝাই করে আবার খালাসও করেন। মধ্যরাত থেকে পরিবহনগুলো পার্কিং শুরু করে। এজন্য প্রতিটি ট্রাক থেকে ১৫শ’ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়।
স্থানীয়রা জানান, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মান্নানের ছত্রছায়ায় এসব চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। তাকে প্রতিসপ্তাহে ১৫ হাজার টাকা চাঁদার ভাগ দেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজরা নিজস্ব বাহিনী নিয়ে প্রতি শুক্রবার সকাল ৭টার মধ্যে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সহস্রাধিক ফুটপাতের দোকানির কাছ থেকে ৫ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মেহেদী, তার ভাই ইউনুস ও ভাগ্নে সালামকে দিয়ে প্রতিদিন ভোরে নয়াবাজার মাজারের পাশে দোকান বসিয়ে প্রতি দোকান থেকে ৩শ থেকে ৫শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছেন। আর নয়াবাজার ফ্রেন্স রোডের নিত্যপণ্যের বাজার থেকে দোকানপ্রতি শ্রেণিভেদে ২০ থেকে ৫০০ টাকা করে বংশাল থানার বড়কর্তাদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা তোলা হচ্ছে। প্রতিদিন ভোরে এ বাজারের প্রায় ২শ দোকানদার থেকে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এ চক্রটি। একই পন্থায় বংশালের আরমানিটোলা, কোতয়ালীর বাবুবাজার, গোপিনাথ দত্ত লেন ও ব্রীজের নিচের অর্ধ শতাধিক ট্রান্সপোর্ট রয়েছে। এসব ট্রান্সপোর্ট প্রতিসপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার ৫শ থেকে ১৫শ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন পরিবহনের চালক-শ্রমিকরা। একই এলাকায় ব্রিজের নিচে ২৭টি ভাসমান ভাতের হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলপ্রতি দৈনিক ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা এবং বাবুবাজার মিটফোর্ড চৌরাস্তা, কমিটিগঞ্জ সড়ক, আঁকমলখান সড়ক ও ব্রিজের নিচের ২ শতাধিক ভাসমান দোকানদার থেকে ৮০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত তার ভাই ইউনুস ও ভাগ্নে সালামকে দিয়ে চাঁদা তুলছে। ইতিপূর্বে ব্রিজের যানজট নিরসন ও চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য সরকারি উদ্যোগে ২ দফায় বাবুবাজারের সিঁড়ি বন্ধ করলে চাঁদাবাজ মেহেদী দলবল নিয়ে সিঁড়ির প্রাচীর ভেঙে দেয়। এরপর ব্রিজের উপর দিয়ে চলাচলকারী পরিবহণ থেকে দৈনিক ১ হাজার টাকা করে চাঁদার ভাগ নিচ্ছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে এমন অংসখ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ২০০৮ সালে পিরোজপুর সদর থানায় মেহেদী ও তার ভাই ইউনুসের নামে মামলা হয়। পরে তারা পুলিশের তাড়া খেয়ে ঢাকার বাবুবাজারে আশ্রয় নেয়। এরপর তারা ২ চাকার ঠেলাভ্যানে শসা ও আমড়া বিক্রি শুরু করে। পরে ২ ভাই ওই ব্যবসা ছেড়ে ২০০৯ সালের প্রথমদিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের স্টাফ, ডোম মিলনের টং দোকান ভাড়া নেয়। এরপর কমিটিগঞ্জ সড়কে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের নতুন গেটের পাশে আটার রুটি ও ডাল-ভাজি বিক্রি আরম্ভ করে। এর পাশাপাশি মেহেদী ডিউটি পুলিশের সাথে সখ্য গড়ে ফুটপাতের দোকান থেকে পুলিশের নামে চাঁদা তোলার কৌশল রপ্ত করে। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে আহসান মঞ্জিলের পাশে বাদামতলী সড়কে ফুটপাতের ফলের দোকান থেকে চাঁদা নেয়ার সময় র‌্যাবের হাতে আটক হয় মেহেদী। ওই মামলায় দ্রুত বিচার আইনে তার ২ বছর ৩ মাস সাজা হয়। উচ্চ আদালতে আপিল করে ৪ মাস ১০ দিন পর জামিনে মুক্তি পান মেহেদী। জেল থেকে বেরিয়ে পুনরায় পুলিশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায়ে কোমড় বেঁধে মাঠে নামেন। মেহেদী ডিএসসিসি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তাদের ব্লাকমেইল করে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজি করছেন। পঞ্চম শ্রেণি পাস মেহেদী বর্তমানে ১০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্টজনেরা। ডিএসসিসি ও পুলিশ প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে মেহেদী এবং তার বাহিনী এলাকায় যে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি কর্মকাণ্ড শুরু করেছে, তাতে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল। স্থানীয় হকাররা জানান, সম্প্রতি গণমাধ্যমের এক কর্মী শুক্রবার ভোরে বাবুবাজার-মিটফোর্ড এলাকা সরেজমিন ঘুরে তথ্য ও ছবি সংগ্রহের চেষ্টাকালে মেহেদীর ভাগ্নের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন যুবক ওই প্রতিবেদককে ঘিরে রেখে তর্কে জড়িয়ে মোবাইল সেট ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে ওই প্রতিবেদককে ছেড়ে দেন মেহেদীর লোকজন। এ সময় তারা বলেন, ফুটপাতের হকার থেকে কাছ থেকে তোলা চাঁদার টাকা পুলিশ, র‌্যাব, ডিএসসিসি’র সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় কাউন্সিলরকে ভাগ দিয়েই প্রতিনিয়ত এখানে দোকান বসানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাইকারি ফলের বাজারকে টার্গেট করে চাঁদাবাজ চক্রের নেতৃত্ব দেন পিঞ্চু হাজী ও আনসার ভূঁইয়া। তারা হকার্সলীগের অফিসে বসে নিয়ন্ত্রণ করেন চাঁদাবাজি। বাদামতলীর সীমানায় গাড়ির চাকা ঢুকতে হলে ব্রিজের নিচে তাদের চাঁদা দিতেই হয়। এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক-হকারসহ স্থানীয়রা।
বাবুবাজারে পরিবহন ও ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজির বিষয়ে ডিএসসিসি’র ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মান্নান ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, স্থানীয় কিছু লোক আমার কাছে ডিএসসিসি থেকে ইজারা পাওয়ার একটি অনুমোদন পত্র দিয়েছে। তবে সেটি সঠিক কিনা তা জানি না। চাঁদাবাজির বিষয়টি আমি পছন্দ করি না। কাউকে প্রশ্রয়ও দেই না। তবে এ ব্যাপারে ডিএসসিসি’র মেয়র মহোদয়ের সাথে কথা বলে টোল আদায় বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে লালবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, আগে দোকান বসানো হতো। আপনারা মেলা-টেলা যাই বলেন, এখন আর বসানো হয় না। কাউকে সেখানে বসতে দেওয়াও হচ্ছে না। তবে কেউ বসলে বা দোকান বসানোর চেষ্টাসহ চাঁদাবাজি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ওসি কে এম আশরাফ উদ্দিন।
এ ব্যাপারে কোতোয়ালী জোনের সহকারি পুলিশ কমিশনার (পেট্রোল) ইকবাল চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি একাধিকবার ঘটনাস্থলে গিয়েছি। তারা বলেছেন, সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়েই দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায় করছেন। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে ডিএসসিসি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসেরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, বিষয়টি জানা নেই। এ ব্যাপারে ডিএসসিসি’র মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরে যোগাযোগ করা হলে বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, বাবুবাজার এলাকায় পরিবহন থেকে নির্দিষ্ট হারে টোল আদায়ের ইজারা দেওয়া হয়েছে। ফুটপাতের বিষয়টি ডিএসসিসি’র প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা দেখভাল করেন। পরে প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিন ও লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাদের কারো কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *