বংশী দখল

সারাবাংলা

এম এ হালিম, সাভার থেকে:
সাভারে বংশী নদী দখল করে দুই তীরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা। এই নদীর পূর্ব তীরে সাভার পৌর এলাকার ব্যস্ততম নামাবাজার ও পাথালিয়া ইউনিয়নের নয়ারহাট বাজার বাণিজ্যিক ও ভূমির মূল্য বেশী হওয়ায় এই এলাকায় অবৈধ দখলদারদের দখলের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ১৯৯০ সালের ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের আইন ফোরশোর নিয়ম ভেঙে নদী তীরের জমিতে অনেকে অনুপ্রবেশ করেছে। ফোরশোর আইনে যা আছে নদীর দুই তীরের যে অংশ শুষ্ক মৌসুমে চর পড়ে ও বর্ষা মৌসুমে জলে নিমজ্জিত থাকে, তা ফোরশোর মধ্যে পড়ে। এই ফোরশোর জায়গায় কোনো ব্যক্তি মালিকানা বা অধিকার থাকে না। কেউ এই জমি দখল করলে তিনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে। এ আইন অমান্য করে নদী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে সাভারে বংশী নদী দখল করেছে অনেক প্রভাবশালীরা। সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বংশী নদী দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েকশ আধাপাকা ও পাকা স্থাপনা। ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাভার উপজেলা কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মাহফুজ সাক্ষরিত ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর এক চিঠিতে ১৩৪ জন অবৈধ নদী দখলদারের নামের তালিকার চিঠি প্রেরণ করে। দখলদারের নামের তালিকাটি নদী রক্ষা কমিশনের ওয়েবসাইটেও দেওয়া আছে। দখলদারের নামের তালিকায় রয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাভার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাভার থানা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সমিতিসহ প্রভাবশালী ১৩৪ জন ব্যক্তির নাম। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবৈধ নদী দখলদারের তালিকাটি পাঠানো হলেও সাভার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে বংশী নদীর দখলদার উচ্ছেদে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরেজমিনে দেখা যায়, সাভার উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়নের নয়ারহাট থেকে পৌর এলাকার কর্ণপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত বংশী নদীর দুই তীরে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর জায়গা দখল করেছে প্রভাবশালী মহল। সাভার পৌর এলাকার নামাবাজারে নদীর অংশ দখলে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা, আধা পাকা বাড়িঘর, স্থাপনা। নতুন করে বংশী নদীর তীর দখলে নিতে প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। ফলে সাভার নামাবাজার বংশী নদীর তীর যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সাভার মডেল থানার পশ্চিমে বংশী নদীর তীরে খাস জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প। প্রকল্পটি নদীর অংশে পিলার দিয়ে বংশী নদীর প্রায় মাঝ বরাবর পর্যন্ত দখলে নিয়েছে। ওই প্রকল্পের দক্ষিণ পাশে নদী তীরে মাটি ভরাট করে উঁচু সীমানা প্রাচীর করে তৈরি করা হয়েছে একটি মনোরম বাংলো বাড়ি যা বর্ষা মৌসুমে নদী প্রবাহে বাধাগ্রস্থ হয়। সাভার পৌর এলাকার ভাগলপুর ও পাথালিয়া ইউনিয়নের নয়ারহাটে বংশী নদীর তীর দখল করে বাণিজ্যিক বালু ঘাটের গদি করা হয়েছে। এই ঘাটগুলো সাভার ও ধামরাইয়ের ইমারত নির্মাণে বালু যোগান দেয় বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এই বালুর ঘাট থেকে প্রতিদিন লাখ টাকা আয় করছেন অবৈধ নদী দখলকারীরা। বালু ভর্তি ভারী ট্রাকের কারণে পৌর এলাকার ভাগলপুর ও নয়ারহাটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চলাচলের রাস্তা। বালু ঘাট সরাতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৌখিক নোটিশ দেওয়া হলেও অবৈধ দখলদাররা রয়েছে বহাল তবিয়তে। সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের অনেক শিল্প কারখানায় ইটিপি থাকলেও তা যথাযথ ব্যবহার না করায় সরাসরি বংশী নদীতে ফেলা হচ্ছে কেমিক্যাল মিশ্রিত দূষিত জল। একদিকে শিল্প কারখানার কেমিক্যাল মিশ্রিত দুষিত কালো জল, অন্যদিকে অবৈধ দখলদারের রাজত্ব দুই মিলে বংশী নদী করুন দশায় পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিনধারায় বংশী নদীর পূর্বে চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্যে নদীর জল মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়েছে। দূষিত বর্জ্যরে জলের দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বলেন, সাভারের বংশী নদী, ধলেশ্বরী নদীসহ খালগুলো প্রভাবশালী মহল দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমরা কিছুদিন আগে বংশী নদীতে নৌকা নিয়ে নদীকে রক্ষার জন্য মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছি। এই দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে নদী দখল বন্ধ হবে না। সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম শামসুল হক বলেন, বংশী ও ধলেশ্বরী নদী দখলের কারণে সাভারের প্রায় ১২টি খাল বন্ধ হয়ে গেছে। দুঃখজনক হলেও এই দখলের তালিকায় সাভার থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। নদী দখলদারের তালিকা ও উচ্ছেদের ব্যাপারে সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বর মাসে ১৩৪ জন অবৈধ নদী দখলদারের নামের তালিকা ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী রক্ষা কমিশনের সমন্বয়ে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *