বরিশালের বাজারগুলোতে বেড়েছে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ‌্যের দাম

সারাবাংলা

বরিশাল প্রতিনিধি: রাস্তায় যাত্রী কম, হেরফান্নে ইনকামও কম। ঘরে খাওয়ার লোক মুই, মোর বউ, মাইয়া-পোলাসহ ৫ জন। কম ইমকাম দিয়া ক‌্যামনে চলমু? আইজ হারাদিন খাইট্টা দুই কেজি চাউল কিনতা দেহি, মোর ধারে আছে আর ৭০ ট‌্যাহা। হেইয়া দিয়া মাছ তো পামু না। এক কেজি আলু আর আধা কেজি ডাইল কিন্না নিমু। জিনিসপত্রের দাম কমলে মোরা একটু ভালা খাইতে পারি। কিন্তু কোনো কিচ্ছুর দাম তো কমে না।

বরিশালের পোর্ট রোড বাজারের পাশে প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন রিকশাচালক মজনু হাওলাদার। মজনু হাওলাদারের মতোই বরিশাল নগরীর অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ‌্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

মাত্র দুই সপ্তহের ব্যবধানে বরিশালের বাজারগুলোতে বেড়েছে সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ‌্যের দাম। চাল, ডাল, আদা, চিনি, পেঁয়াজ, রসুনের পাশাপাশি সব ধরনের শাক-সবজির মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের নাভিশ্বাস তুলেছে।

বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে বরিশালের বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে বলে দাবি করছেন বিক্রেতারা। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক দাবি করেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব‌্যাহত থাকায় বরিশালের বাজার কিছুটা হলেও স্থিতিশীল আছে।

সম্প্রতি বরিশাল নগরীর রূপতালী, সাগরদী, চাঁদমারী, পোর্টরোড, বাংলা বাজার, নতুন বাজার, নথুল্লাবাদ ও কাশিপুর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে মোটা চালের দাম বেড়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে মোটা চালের আমদানি কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষরা।

চালের দাম বস্তা প্রতি (৫০ কেজি চাল) বেড়েছে ১৫০-২০০ টাকা। খুচরা বাজারে কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে ৫-৭ টাকা। দেশি মোটা (আমন) চালের দাম ৬৫ টাকা। বুলেট (হাইব্রিড) চালের দাম ৪২টা, দুই সপ্তাহ আগে তা ছিল ৩৭ টাকা। মিনিকেট চলের দাম ৫২-৫৪ টাকা, দুই সপ্তাহ আগে তা ছিল ৫০-৫২ টাকা। ব্রি-২৮ চালের দাম ৪৬-৪৮ টাকা প্রতি কেজি, আগে তা ছিল ৪০-৪২ টাকা। জিরাশাইলের বর্তমান বাজারমূল্য ৫০-৫২ টাকা, আগে ছিল ৪৬-৪৭ টাকা। কাজল লতা বর্তমানে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ৪৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

বরিশাল নগরীর সাগরদী বাজারের আড়তদার আব্দুস সালাম মিয়া জানান, বাজারে ধানের আমদানি কমে যাওয়ায় চালের উৎপাদন কমেছে। কয়েক দফা বন্যার কারণে চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দাম কিছুটা কমতে পারে।

এদিকে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার খবরে অস্থির হয়ে পড়ে বরিশালের পেঁয়াজের বাজার। দাম বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। পরবর্তী সময়ে দাম কমলেও গত কয়েক দিনে আরো এক দফা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫ টাকা। গত দুই সপ্তাহ ধরে ভোক্তারা কেজি প্রতি পেঁয়াজ ৮০ টাকা দরে কিনলেও বর্তমানে দাম ৮৫ টাকা। পেঁয়াজের পাশাপাশি রসুনের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০ টাকা দরে।

দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি চিনির দাম বেড়েছে ২ টাকা। বর্তমানে চিনির কেজি ৬০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে মসুর ডালের দাম ছিল কেজি প্রতি ৬০-৬২ টাকা। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকায়। চীনা আদার দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ১০০ টাকা। বর্তমানে দাম ২৬০ টাকা। সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে লিটার প্রতি ৬ টাকা।

নগরীর নতুল্লাবাদ বাজারের মুদি দোকানি মো. কবির হোসেন বলেন, ‘সবরাহের চেয়ে চাহিদা বেশি থাকায় দাম বেড়েছে। পেঁয়াজের দাম কয়েক দিন আগে একটু কম ছিল। কিন্তু আমদানি কমায় এই সপ্তাহে কেজি প্রতি দাম বেড়েছে ৫ টাকা। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।

অপরদিকে, বন্যার কারণে সবজির দাম বেশ চড়া। সবজিভেদে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। বরিশালের বাজারে বরবটি, ঢেঁড়স, করলা বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে। টমেটো ১০০-১২০ টাকা, বেগুন বিক্রি ৮০ টাকা, শসা ৭০ টাকা, শিম ১২০ টাকা, ঝিঙ্গা ৬০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, গাজর ৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা, কচুর লতি ৬০ টাকা ও কাকরোল ৬০ টাকা।

বাংলা বাজারের সবজি বিক্রেতা আবদুস সোবাহান খান বলেন, ‘প্রতি মৌসুমের শুরুর দিকে শাক-সবজির দাম বাড়ে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এমন দাম থাকবে না, কমে যাবে।

নথুল্লাবাদ বাজারের সবজি বিক্রেতা সবুজ মিয়া বলেন, ‘বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকেই সবজি দাম বাড়ছে। গত বছর শীত শুরুর আগে যেমন দাম ছিল, এবছর তার চেয়ে একটু বেশি।

বাজারে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামের এই ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অধিকাংশ মানুষ। তারা বাজার মনিটরিং করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।

চাঁদমারী বাজারে আসা মো. হাবিবউল্লাহ বলেন, ‘বন্যা, করোনা, সরবরাহ কম, ট্রাক ভাড়া বেশি—এসব অজুহাত বিক্রেতাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এর প্রতিকার কোথায়? আমাদেরকে এই অনিয়ম এখন নিয়ম বলেই মেনে নিতে হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ‌্যাডভোকেট এস এম ইকবাল রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বরাবরই আমরা দেখেছি, বাজারে একটি জিনিসের দাম বাড়লে অন্যটিরও দাম বাড়িয়ে দেন বিক্রেতা। এর পিছনে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাদের প্রতিহত করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান চালালে এ সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হতে পারে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, ‘বরিশালের প্রতিটি বাজারে মূল্য তালিকা দেওয়া হয়েছে। নিজ নিজ বাজার কমিটিকে মূল্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে প্রতিদিনই বরিশালে কোনো না কোনো বাজারে অভিযান চালানো হচ্ছে। জেল-জরিমানাও হচ্ছে। বন্যার কারণে সরবারহ কম থাকায় মূল্য বেড়ে থাকে। কিন্তু সেটি যদি মাত্রাতিরিক্ত হয়, তবে তা বেআইনি। সেদিকে আমরা সজাগ আছি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *