বাজারে মিলছে না ইলিশ চড়া দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা

লিড লিড ১

নিজস্ব প্রতিবেদক
ইলিশের ভরা মৌসুম হলো বর্ষাকাল। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে। তবে এ বছর আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়েনি। বাজারে ইলিশও ছিল কিছুটা কম। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশে ইলিশ পাচারের। ফলে বাড়তি দামসহ সার্বিক প্রভাব পড়েছে ইলিশের বাজারে। চলতি বছরের শুরু থেকেই ইলিশের বাজার অনেকটা চড়া। গেল বছরের তুলনায় এ বছর বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে মাছের রাজা ইলিশ। তবে এবার ভারতে ইলিশ রফতানির খবরে আগুনে ঘি ঢালার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে মৌসুমি এ মাছের বাজারে। কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম বেড়েছে প্রায় একশ থেকে দেড়শ টাকা। এছাড়া পর্যাপ্ত সরবরাহও নেই ইলিশের। বিক্রেতাদের আর ক্রেতা ডাকতে হচ্ছে না। ক্রেতারাই আগ্রহ নিয়ে দাম শুনে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ইলিশ ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর বাজারে ইলিশ অনেক কম। শুধু নদীতেই নয় উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র দুটোতেই ইলিশ কম। দুই বছরের করোনা পরিস্থিতিতে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের ঢিলেঢালা দায়িত্বপালনের কারণে প্রচুর পরিমাণে জাটকা নিধন হয়েছে। এই দুই বছর জাটকা শিকারের কারণে যত জেলে ধরা পড়েছেন তাদের অধিকাংশকে আংশিক জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়ায় তারা পুনরায় জাটকা নিধন করেছেন বলে অভিযোগ তাদের। এছাড়া নদীতে পলির আধিক্য, স্রোতহীনতা, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণসহ নানা কারণে ইলিশের গতিপথ প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। ইলিশ বাজারে কম আসায় দামও কিছুটা বেশি। মঙ্গলবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে রাজধানীর উত্তরার জহুরা মার্কেটে দেখা যায়, মাছের দোকানগুলোতে ইলিশের পরিমাণ খুবই অল্প। দুই-একজন ক্রেতা দাম জানতে চাইছেন। কেউ কেউ দামাদামি করছেন। আবার কেউ হঠাৎ ইলিশের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলেন। প্রায় ১২ বছরের ইলিশ বিক্রির অভিজ্ঞতা থেকে মাছ ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এবার শুরু থেকেই ইলিশের দাম বাড়তি। এ সময়ে ইলিশের দাম এত বেশি থাকে না। এবার নাকি ভারতে ইলিশ রফতানি হচ্ছে। এ কারণে হয়ত বাজারে ইলিশ কম। আমরা পাইকারি বাজারে বেশি কিনতে পারি নাই। তিনি জানান, পাইকারি বাজারে গিয়ে খুব বেশি ইলিশ কিনতে পারেননি আজ। দামও বেশি চেয়েছে পাইকাররা। বাধ্য হয়ে তাদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। রুবেল হোসেন নামের এক ক্রেতা ইলিশের দাম শুনে অন্য মাছ কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। আলাপকালে তিনি বলেন, অবশ্যই ভারতে রফতানির সংবাদে ইলিশের দাম গত দুই দিনের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আমাদের মতো সাধারণ ক্রেতাদের ইলিশের কাছে যাওয়াই এখন কঠিন পড়েছে। নিজেদের চাহিদা না মিটিয়ে এভাবে ভারতে ইলিশ রফতানি করা ঠিক নয়। ইলিশ বিক্রেতারা জানান, এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১১০০ থেকে ১৩০০ টাকায়, যা কয়েক দিন আগে ১০৫০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া এক কেজির নিচের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকায়, যা আগে বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়। তবে বাজারভেদে দামের কিছুটা পার্থক্য হতে পারে।

জানা গেছে, অন্য বছরের তুলনায় চলতি বছর একই সময় বাজারে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। বর্তমানে চাঁদপুরের স্থানীয় বাজারে ১ কেজি থেকে ১২০০ গ্রামের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, একই ওজনের ভোলা-বরিশালের ইলিশ এক হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া দেড় কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ১ হাজার ৪০০ থেকে সাড়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা, মিঠাপানির মাঝারি সাইজের তাজা ইলিশের দাম কেজিপ্রতি এক হাজার টাকা এবং একই সাইজের বরিশাল অথবা উপকূলীয় এলাকার মাছের দাম সাড়ে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার প্রধান উৎস হচ্ছে ইলিশ। প্রায় ৬ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। সীমান্তের দুই পাশেই বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা ইলিশ ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনীতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির বিরোধিতা করার পর ২০১২ সালে ভারতে ইলিশ রফতানি নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ। সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো রয়েছে। সম্প্রতি ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে প্রচুর চাহিদার কারণে ইলিশের দামও ঠেকেছে আকাশে, প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার রুপিতে বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। এর জেরে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইলিশ পাচার হচ্ছে ভারতে। কলকাতায় পৌঁছানো বেশিরভাগ ইলিশ যাচ্ছে নদীপ্রধান আঙ্গরাই-হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি সীমান্ত দিয়েও পাচার হচ্ছে কিছু ইলিশ। সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের একটি সীমান্তচৌকিতে বিপুল পরিমাণ ইলিশ জব্দ করেছে।
এদিকে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৫২ প্রতিষ্ঠানকে ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ৪০ মেট্রিক টন করে মোট ২ হাজার ৮০ মেট্রিক টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইলিশ পাচারের বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুরের আড়তদার মেসার্স খান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. গিয়াস উদ্দিন খান বিপ্লব বলেন, সীমান্ত দিয়ে ইলিশ যাচ্ছে, আজও হয়তো গেছে। এগুলো নিশ্চয়ই কোনো ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই হয়। আনঅফিসিয়ালি আগে থেকেই যাচ্ছে এবং যায়। এর ফলে দেশের বাজারে ইলিশের দামে প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, ভারতে তো অফিসিয়ালি, আনঅফিসিয়ালি ইলিশ মাছ যাচ্ছে। ইলিশ রফতানি তো নিষিদ্ধ, সেখানেও দুর্নীতি আছে। পূজার জন্য ৫২ প্রতিষ্ঠান ইলিশ ভারতে রফতানি করতে পারবে। ইতোমধ্যে তারা বাজার থেকে মাছ কিনতে শুরু করেছে। ঘটনা হচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো দুই হাজার টন মাছ দেবে, আগের বছরগুলোতে যা ছিল আরও অনেক কম। ইলিশ রফতানি বন্ধ থাকলেও ভারতের পার্টিগুলো কতো টন মাছ নিচ্ছে সেটি নজরদারিতে রাখা উচিত। তারা কী দুই হাজার টনের জায়গায় ২০ হাজার টন নিচ্ছে কি-না সেদিকে নজর রাখা হয় না। আমি গত দুই বছরে দেখেছি, ভারতের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান মাছ কিনে তারা চাঁদপুর, বরিশাল, ঢাকার কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মাছ কিনেছে। ফলে সেটি নজরদারির আওতায় আনা উচিত।
চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিসুর রহমান বলেন, বর্তমানে এই সময় ইলিশ একটু কম ধরা পড়ছে। চর-ডুবোচর, নাব্যতা সঙ্কটের জন্য প্রধান নদ-নদীতে অন্যান্য বছর যেভাবে ইলিশ এসেছে এ বছর সেভাবে ইলিশ আসছে না এটা ঠিক। কিন্তু গভীর সমুদ্রে এভেইলেবলিটি আছে। কিন্তু প্রধান নদ-নদীতে না আসার কারণে এ রকম একটা আলোচনা আসছে। অমাবস্যা-পূর্ণিমা আসছে, এ সময় কিন্তু তারা ডিম ছাড়ার জন্য এদিকে আসবে বলে আশা করা যায়। তাই সেভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। প্রসঙ্গত, গত সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) ভারতে ২ হাজার ৮০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ৫২টি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে রফতানির এ অনুমোদন দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এমন খবরেই ইলিশের সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে বাজারে দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ক্রেতারা।

 

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *