বার বার পুড়ে নিঃস্ব হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ

বার বার পুড়ে নিঃস্ব হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষ

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন
মাত্র ২৭ ঘণ্টার ব্যবধানে আগুনের ভয়াল থাবায় পুড়েছে রাজধানীর তিনটি বস্তি। গত সোমবার দিবাগত রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতের মধ্যেই আগুনে পুড়েছে রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তি, মোহাম্মদপুরের জহুরি মহল্লার বস্তি ও পল্লবীর কালশি বস্তি।

আগুনের লেলিহান শিখায় ৩টি বস্তির দোকান ও বসত ঘরসহ প্রায় ২শ ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুঁড়ে ছাই হয়েছে খেটে খাওয়া বস্তিবাসীর হাজারো স্বপ্ন। আগুনের কবল থেকে ভাগ্যক্রমে জীবনটুকু হাতে নিয়ে বাঁচতে পারলেও সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন তারা।

বস্তিবাসীরা বলছেন, বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করতে পরিকল্পিতভাবেই একের পর এক আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগুন লাগার পর সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসন ও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা আদৌ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

আশ্বাসের দোলাচলেই ঢুুকড়ে কাঁদছেন ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী। আগুনের সূত্রপাত নিশ্চিত করে জানতে না পারলেও ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।

রাজধানীর বস্তিগুলোতে একের পর এক আগুন লাগার ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, বস্তিগুলোতে সংযোগ দেওয়া গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগগুলো বৈধ নাকি অবৈধ।

অভিযোগ উঠেছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও লাইনম্যানের যোগসাজসে প্রভাবশালী একটি মহল এসব বস্তিগুলোতে অবৈধভাবে গ্যাস-বিদ্যুৎসংযোগ দিয়ে বস্তিবাসীর কাছ থেকে মাসের পর মাস হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের অর্থ।

বস্তিগুলোতে নিম্নমানের নকল বৈদ্যুতিক কেবল দিয়ে সংযোগ দেওয়ায় স্পর্ক করে সহসাই আগুন লেগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দিনের পর দিন বিভিন্ন উপায়ে বস্তিবাসী এসব সুবিধা ভোগ করে এলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে সেবা সংস্থাগুলোর ভূমিকা।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু সেবা সংস্থা নয়, দায় এড়াতে পারে না নগর কর্তৃপক্ষও। বস্তিবাসীর অসচেতনতাও দায়ী। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নজরদারি বাড়াতে হবে। আজ বৃহস্পতিবার (২৬ নভেম্বর) রাজধানীর পোড়া বস্তি ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, গত সোমবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে টানা দেড়ঘণ্টার চেষ্টায় দিবাগত মধ্যরাত ১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে ১৫টি দোকানসহ প্রায় ৬০টি বস্তিঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই রাত পেরিয়ে পরদিন গত মঙ্গলবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে মোহাম্মদপুরের জহুরি মহল্লার জেনেভা ক্যাম্পে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট গিয়ে টানা ৪৫ মিনিট চেষ্টা চালিয়ে বিকেল ৫টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এতে মালামালসহ অর্ধশতাধিক বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ঘটনার রেশা না কাটতেই মঙ্গলবার দিবাগত সোয়া ২টার দিকে পল্লবীর কালশি বস্তিতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা টানা একঘণ্টার চেষ্টায় দিবাগত রাত ৩টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

ততক্ষণে বস্তির অর্ধশতাধিক ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখায় স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যায় বস্তিবাসীর। মাত্র ২৭ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর ৩টি বস্তিতে আগুন লাগার পর জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বস্তিবাসীর অনেকেই বলছেন, এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পরিকল্পিত। আবার কেই বলছেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবহার করায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটছে। মহাখালী, মোহাম্মদপুর ও পল্লবীর কালশি বস্তিতে আগুন লাগার সব ঘটনাই যেনো একই সূত্রে গাঁথা।

মহাখালীর সাততলা বস্তির বাসিন্দা জাহাঙ্গীর ও নুরজাহান জানান, দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরেই তারা মহাখালীর কড়াইল বস্তি ও সাততলা বস্তিতে ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। বস্তির ভেতর কয়েক হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।

কিন্তু করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সোমবার দিবাগত মধ্যরাতের আগুনে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে স্বপ্ন আর সাজানো সংসার। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করতে পরিকল্পিতভাবেই আগুন লাগানো হচ্ছে।

গ্যাস-বিদ্যুৎসংযোগ বৈধ নাকি অবৈধ তা তারা কেউ জানেন না। তারা জানান, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল বিদ্যুৎসংযোগ দিয়ে মাসিক ৩শ থেকে ৫শ টাকা হারে বিল তুলে নিচ্ছে।

মোহাম্মদপুরের পোড়া বস্তি ঘুরে ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বস্তির এক ঘর থেকে অন্য ঘরে নিম্নমানের তারের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে বিদ্যুৎসংযোগ।

একটি তার থেকে আরেকটি তার জোড়া লাগিয়ে সংযোগ দেওয়া হয়েছে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। আর ঝুঁকিপূর্ণ এসব তারের বিদ্যুৎ নিরোধকের আধুনিক কোন ব্যবস্থা নেই। টেপ পেঁচিয়ে নিরোধক করা হলেও অধিকাংশ জায়গায় সেগুলো আলগা হয়ে স্পার্ক ঝুঁঁকিতে রয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে বাধ্য হয়েই এমন ঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করছেন এসব বস্তিবাসী। নুন আনতে পান্তা ফুরালেও নিত্য মেটাতে হয় বিদ্যুতের বিল দিয়ে।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকায় দেওয়া হয় অবৈধ বিদ্যুতের লাইন। তারা বলছেন, বস্তির সব সংযোগই অবৈধ। বৈধ উপায়ে চাইলেও কেউ পান না বিদ্যুতের মিটার।

বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারাও তাদের আবেদনে সাড়া দেন না। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, রাজধানীর বস্তিগুলোতে বার বার আগুন লাগার পর সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও অদ্যবধি কোন আশ্বাসই বাস্তবায়ন করা হয়নি। একের পর এক আগুনের লেলিহান শিখায় সর্বস্ব হারিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে আজও আশ্বাসের দোলাচলে ডুকড়ে কাঁদছেন পোড়া বস্তির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।

এসব বস্তিতে যারা প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যুৎসংযোগ দিচ্ছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, বিদ্যুৎসংযোগ না দিলে সেবাবঞ্চিত থাকবেন বস্তিবাসীর নিম্নআয়ের মানুষগুলো। অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বস্তিবাসির সেবা করতে পারছেন এমনও দাবিও করেছেন তারা। বৈধ কিংবা অবৈধ যে উপায়ই সেবা পান না কেন বস্তিবাসীরা, তাতে উল্টো ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এসব সংযোগ।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, এখনই সরকারের উচিত সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া। এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন আমাদের বহু উদ্যোগের পরিকল্পনার গল্প শুনিয়েছে। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হোক। আপতত সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দিয়ে বস্তিবাসির জীবনমান উন্নত করতে পরিচ্ছন্ন সেবা প্রদান করা হোক। যারা প্রভাব খাটিয়ে এসব বস্তিতে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক কেবল দিয়ে সংযোগ প্রদান করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

পাশাপাশি সব সেবার বৈধ সংযোগের ব্যবস্থা করা হোক। তিনি আরও বলেন, নগরীর বস্তিগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকেই সুবিধাভোগীরা সবসময়ই দায় এড়াতে আড়ালে চলে যাচ্ছে। বস্তিবাসীর অসচেতনতাও কোন অংশে দায়ী কম নয়।

তাই বস্তিবাসীর সেবা নিশ্চিতে এবং অগ্নিকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরতে গ্যাস-বিদ্যুৎসংযোগের বিষয়ে সেবা সংস্থাগুলোকে আরও দায়িত্ব নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিদেরও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমের ওপর আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ জানায়, ভাসমান এসব মানুষের যথাযথ পুনর্বাসনের কথা ভাবছেন তারা। শিগগিরই বৈঠক করে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তর কর্তৃপক্ষ জানায়, আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, সেটি এখনই স্পষ্টভাবে বলা যাবে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইনের শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে।

বিশেষ করে নিম্নমানের ক্যাবল ব্যবহার আর টেপ মুড়িয়ে কাটা তারে জোড়াতালি দেওয়ার কারণেই বারবার বস্তিতে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। সূত্র জানায়, এর আগে ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

প্রত্যেক বারই বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের দুর্বল তারের কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। আর সেই ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।

যার ফলে কিছুদিন পর পরই আগুন লাগছে। আর বস্তিগুলোতে একটা পর একটা ঘর লাগানো থাকার কারণে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বস্তিই জ্বলে পুঁড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আগুনের লেলিহান শিখায় নিম্নআয়ের মানুষের স্বপ্ন আর সাজানো সংসার পুড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, বস্তির প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এর পেছনে নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক কেবল সংযোগই আগুন লাগার অন্যতম একটি কারণ। তবে অন্যকোন কারণ রয়েছে কিনা তা গুরুত্বের সঙ্গেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে পল্লবীর কালশিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য এখলাস আলী মোল্লা জানান, কালশি বস্তিতে আগুন লাগার পেছনে বস্তির ভেতর গড়ে ওঠা রিকশার গ্যারেজ। ওইসব গ্যারেজে থাকা অটোরিকশার চার্জিং পয়েন্টে ত্রুটির কারণে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সাংসদ এখলাস আলী মোল্লা।

উল্লেখ্য, গত দুই মাসে রাজধানীতে ছোট বড় প্রায় ৫টি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ৩০ অক্টোবর কল্যাণপুর নতুন বস্তিতে, গত ১১ মার্চ রূপনগর বস্তিতে, গত ২২ নভেম্বর যাত্রাবাড়ীর ভাঙা প্রেস এলাকায় কার্টন তৈরির কারখানায় আগুন লাগে।

এছাড়া ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর কালশির ওই একই বস্তিতে আগুন লাগে। ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি রায়েরবাজার বস্তিতে আগুন লাগায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *