বালু মহালে তাণ্ডব

সারাবাংলা

শফিকুল ইসলাম কুদ্দুস, নেত্রকোনা থেকে
নেত্রকোনার দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতে বালু মহালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বালু ব্যবসায়ীদের তাণ্ডব। নদীতে পানি বাড়লে শহর রক্ষাবাঁধের পাশেই ড্রেজার বসিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বালু ও নূরী পাথর উত্তোলন করা হয়। পানি কমলে মাঝ নদীতে শত শত ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। এতে করে হুমকির মুখে পড়েছে দুর্গাপুর শহর রক্ষাবাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, সড়কসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এলাকার রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিছু নেতার ছত্রছায়ায় কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চালাচ্ছে বালু লুটপাট। সরকার নির্ধারিত সীমানার বাইরেও নদীর বুকে ড্রেজার বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু ও নূরী পাথর। প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট ও জীব বৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়ছে। ভেঙে যাচ্ছে সড়ক, ঝুঁকিতে রয়েছে সেতু ও কালচারাল একাডেমী।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতে সরকার ঘোষিত বালু মহাল রয়েছে পাঁচটি। সেগুলো হচ্ছে বিজয়পুর ও ভবানীপুর থেকে দুর্গাপুর তেরী বাজার ঘাট ও শিবগঞ্জ বাজার ঘাট পর্যন্ত, দুর্গাপুর তেরী বাজার ঘাট ও শিবগঞ্জ বাজার ঘাট থেকে চৈতাটী, দুর্গাপুর বিরিশিরি ঘাট থেকে কেরনখলা, গাঁওকান্দিয়া মৌজার উত্তর সীমানা থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বালু মহাল, ঝাঞ্জাইল থেকে উত্তর শংকরপুর পর্যন্ত বালু মহাল। প্রতি বছর চৈত্র মাসে ইজারার জন্য বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর আইন অনুসারে কার্য সম্পাদিত হয়ে থাকে। এ বছর ১নং বালু মহালের ইজারা পেয়েছেন সাবেক এমপি মোস্তাক আহমেদ রুহী, ২নং মহাল আলাল সরদার, ৩নং মহাল ঝুলন সাহা, ৪নং মহাল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এমদাদুল হক খান ও ৫নং মহাল পেয়েছেন চান মিয়া। তাদের সঙ্গে আছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ আরও অনেকেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুর্গাপুর শহরকে নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার জন্য চার দলীয় জোট সরকারের আমলে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ করে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বালু মহালে একটি ড্রেজার ও নদীর তীর থেকে অন্তত ৫০০ ফুট দূরে বালু উত্তোলনের কথা। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের সামনেই এই নদীতে পাঁচটি বালু মহালে তিন থেকে চারশ বাংলা ড্রেজার বসিয়ে শহর রক্ষাবাঁধের পাশে দিন রাত নদীর তলদেশ থেকে বালু ও নূরী পাথর উত্তোলন করছে বালু ব্যবসায়ীরা। ওই বালু ট্রাক ও ট্রলিতে করে স্থানীয় প্রশাসনের সামনেই প্রকাশ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে দুর্গাপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর সভার মেয়র মাওলানা আবদুস ছালামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ত সহযোগিতায় স্থানীয় কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী বেপরোয়াভাবে শহর রক্ষা বাঁধের কাছ থেকে বালু উত্তোলন করছে। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তাক আহমেদ রুহীও সোমেশ্বরী নদীতে বালু মহলগুলো সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, নদীতে জল থাকায় ইঞ্জিন চালিত নৌকায় অসংখ্য ড্রেজার বসিয়ে বালু ও নূরী পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। নদী পথে নৌকা দিয়ে বালু নেওয়া হচ্ছে। নদীর পশ্চিম ও পূর্বপাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে উপজেলা সদরের তেরী বাজার মোড়, চর মোক্তারপাড়া, সাধুপাড়ায় শহর রক্ষাবাঁধ হুমকিতে পড়েছে। বাঁধের ব্লক ধসে পড়ছে নদীতে। দুর্গাপুর পৌর শহরের রাস্তা ভেঙে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সোমেশ্বরী নদীর ওপর সেতুতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা জানান, সোমেশ্বরী নদীতে অসংখ্য ড্রেজার দিয়ে দিন রাত বালু ও পাথর তোলা হচ্ছে। সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে মাত্রা অতিরিক্ত ভিজে বালু ট্রাক ও লরিতে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। বালু মহালে নৈরাজ্যকর অবস্থা দেখেও কেউ কোন প্রতিবাদ করছে না। বালু উত্তোলনকারীরা এলাকায় খুবই প্রভাবশালী এবং সব কিছু তারা ম্যানেজ করে চলে। সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না।
কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, নদীতে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তল দেশ মাটি শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এতে করে নদীর তীরবর্তী এলাকায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন। ভাঙন রোধে সরকারিভাবে তেমন কোন সাহায্য করা হচ্ছে না। বড়ইকান্দি এলাকার বাসিন্দা জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন ও সরকার ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হিলারিউস রিছিল বলেন, নদী ভাঙন খুব ভয়ঙ্ককর রূপ ধারণ করেছে। সরকারিভাবে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। কেউ বাঁধ রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। আমরা এলাকাবাসী মিলে বালির বস্তা ফেলে বাঁধটি রক্ষার জন্য কাজ করছি।
দুর্গাপুর পৌর এলাকার সাধুপাড়ার প্রায় ৬০ বছরের বৃদ্ধা সুফিয়া আক্তার বলেন, আমাদের কথা কে শুনে। দিন রাইত ২৪ ঘণ্টা ড্রেজার চলে। ড্রেজারের শব্দে বাড়িতে ঘুমানো যায় না। রাস্তার ব্লক ভাইঙ্গা যাইতাছে, এভাবে চলতে থাকলে অল্প কিছুদিনের মধ্যে বাঁধ ভাঙা আমাদের বাড়িঘর সব নদীতে তলাইয়া যাইবো। শ্মশানঘাট এলাকার বাদল চন্দ্র দাস বলেন, দিন দিন যেভাবে নদী থাইক্যা বালু তোলা হচ্ছে, তাতে বাড়িঘর সব নদীতে চইলা যাইতাছে। কেই আমাদের কথা শুনে না। কিছু বললে তারা (ইজারাদারের লোকজন) সরকার থাইক্কা বালু উঠানোর জন্য টাকা দিয়া লীজ আনছে। তারা বালু উঠাবেই।
এলাকাবাসীর অভিযোগ দুর্গাপুর পৌর সভার মেয়র ও দুর্গাপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুস ছালাম বালু মহালের কয়েকজন ইজারাদারকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তারই ছত্রছায়ায় এ সব ইজারাদারা কাজ করে থাকেন। তবে মাওলানা আব্দুস ছালাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বালু মহালে পৌর সভার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। বিগত সময়ে দুইটি মহাল আমার লোকজন কাজ করতো। এখন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। ইজারাদাররা জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা নিয়েছে বালু তোলে। তারা নিজ দায়িত্বে বালু উত্তোলন করে। স্থানীয় কিছুলোক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে। সরকারি নিয়ম মেনে নদী থেকে বালু উঠালে ভাঙন কিছুটা কম হতো।
বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী পরিবেশবাদী মো. অহিদুর রহমান বলেন, সরকারি নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে এ অনিয়ম। কারো কথা শুনছে না বালু ব্যবসায়ীরা। এরা এত জোর কোথায় পায়? এ ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা নেওয়া উচিত। তা না হলে ওই এলাকার জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাবে। প্রকৃতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে।
দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী ইউএনও ফারহানা খানম জানান, ইজারাদারদের সরকারি নিয়ম মেনে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত ও ভিজে বালু পরিবহনের জন্য প্রায়শই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হয়। নদী ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *