বাস্তবায়ন হয়নি শহীদ উত্তম ভবন

সারাবাংলা

রাজীব চক্রবর্তী, চট্টগ্রাম ব্যুরো : ১৯৮৯ সালের ১০ জানুয়ারী মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন জামায়াত শিবিরের বোমা হামলায় স্কুলে যাওয়ার পথে নিহত তৎকালীন ৭ম শ্রেনীর ছাত্র উত্তম বিশ্বাসের পরিবার দীর্ঘ ৩১ বছর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে। যে বাড়ি থেকে উত্তম বিশ্বাস স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে আর জীবিত ফিরে আসেনি, সে বাড়িতে উত্তমের ভাই-বোন দু:খ কষ্টে এতটি বছর পার করে আসছে। ঘটনার ১৪ দিন পর ২৫ জানুয়ারী দুপুর ১২টায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাথরঘাটাস্থ উত্তমের বাসায় এসে তার মা-বাবা, ভাই বোনকে শান্তনা দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় কোন মামলা না হলেও পরিবারের সদস্যরা হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির আশায় দীর্ঘ বছর ধরে অপেক্ষার প্র্রহর গুনছেন। পাশাপাশি আরেকটু সরকারি সহায়তা পেলে সুন্দর জীবনযাপন করা যেত প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন প্রত্যাশা তাঁদের।

জানা গেছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন সেনাশাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের শাসনামালে ১৯৮৯ সালের ১০ জানুয়ারী প্রতিদিনের মত ৭ম শ্রেনীর টগবগে ছাত্র উত্তম বিশ্বাস বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল। পাথারঘাটায় গির্জার কাছাকাছি আসলে তার উপর একটি বোমা নিক্ষেপ হয়। এসময় উত্তমের বুকের বাম পাঁজর উড়ে যায়। ঢলে পড়ে মাটিতে। সকলে তাকে নিয়ে আসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ১২ ঘন্টায়ও তার জ্ঞান ফিরেনি। অবশেষে মুখ থেকে রক্ত বমি করতে করতে উত্তম তার মায়ের হাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পরেরদিন বেলা ১২টায় উত্তম বিশ্বাসের লাশ কড়া পুলিশ পাহারায় তাদের ৪১ ব্রিকফিল্ড রোডস্থ বাসায় আনা হলে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণ হয়। এ সময় পুলিশ তাড়া দেয় দুই মিনিটের বেশী সময় দেয়া যাবেনা। আপনারা দুইজন সঙ্গে চলুন। বেশী লোকজন শ্মশানে যাওয়া যাবেনা। আমাদের পাহারায় লাশের সৎকার করতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। লাশের বুকে ব্যান্ডেজ বাধা। বোমায় উত্তমের বুকের বা দিকের পাঁজর উড়ে যায়।
ঘটনার ১৪ দিন পর ২৫ জানুয়ারী দুপুর ১২টায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাথরঘাটাস্থ উত্তমের বাসায় এসে উত্তমের বাবা-মা, ভাই-বোনকে শান্তনা দিয়ে যান। আরো অনেকে আসেন তাদের বাসায়। এরপর দীর্ঘ ৩১ বছরের কেউ আর খবর রাখেনি। পরিবারের আশা উত্তম শিক্ষিত হয়ে বড় হয়ে সংসারের গ্নানি টানবে। সে আশা আর পূরণ হলোনা। উত্তমের অলকা বিশ্বাস আর সুলেখা বিশ্বাস নামে দুই বোন অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। পুত্র শোকে মা লক্ষী বিশ্বাস আর বাবা অমল কান্তি বিশ্বাস মারা গেছেন অনেক আগেই। এক ভাই রয়েছেন মনোজ বিশ্বাস। তার সামান্য আয়ে সংসারের প্রতিদিন অভাব অনটন লেগেই থাকে।

সরেজমিনে উত্তমের বাসায় গিয়ে কথা হয় তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। উত্তমের বোন অলকা বিশ্বাস ভাইয়ের পুরোনো ছবি বুকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ‘ঢাকা প্রতিদিন’কে বলেন, ভাই হারানো দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আজো বেঁচে আছি। হয়তো ভাই বেঁচে থাকলে সংসারের দুঃখ কষ্ট আরো লাঘব হতো। ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করে। সংসারের খরচ বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের প্রতি একটু নজর দিতো আরেকটু ভালো করে থাকতে পারতাম। ঘরটা অনেক জায়গায় ফেটে গেছে। মেরামত করা দরকার। বাসার চাল ফেটে যাওয়ার কারণে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সব ঘরেই পড়ে। তিনি বলেন, অর্পিত সম্পত্তিতে বসবাস করার কারণে আমরা আতংকেও রয়েছি। একটি দুষ্ট মহল আমাদের ঘর থেকে বের করে দিয়ে কখন তারা সেটা দখল করতে পারবে এ চেষ্টাই প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের বাসায় যখন এসেছিলেন তখন আমার বাবা একটি দরখাস্ত দিয়েছিলেন। ওই দরখাস্তে আমাদের এই বাসাটা শহীদ উত্তম ভবন নামকরণ করতে। প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় গেলে সেটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা গরীব দুঃখী মানুষ, কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সে আবদার পৌঁছাবো।

নিহত উত্তমের বোন সুলেখা বিশ্বাস ‘ঢাকা প্রতিদিন’কে বলেন, আমার বড় ভাই উত্তম বেঁচে থাকলে আমাদের পরিবারকে আগলে রাখত। সবাই যাতে একটু ভালো থাকি সে চেষ্টা করত। এখন আর আগলে রাখার মানুষ নেই, ভালোবাসাও নেই। আসলে মানুষ চলে গেলে কিছুই থাকে না। তিনি কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেন, উত্তম দাদা নেই মানে আমাদের কিছুই নেই। চোখ বুজলে এখনো দেখি রক্তাক্ত দেহ হাসপাতালের বেডে পড়ে আছে। যন্ত্রণায় ছটফটাতে দেখি। এহন তার আত্মার শান্তি কামনা ছাড়া আর কী করার আছে আমাদের। তিনি বলেন, আমরা রাজনীতি করিনা, রাজনীতি বুঝি না। তবু কেন রাজনীতির আগুনে আমার ভাইকে মরতে হলো।

এ বিষয়ে কোতোয়ালী থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য দীপক ভট্টাচার্য্য ‘ঢাকা প্রতিদিন’কে বলেন, ঘটনাটি হৃদয় বিদারক। এরশাদ সরকারের শাসনামলে স্কুলে যাওয়ার পথে বোমা বিস্ফোরণের এই ঘটনা আজো আমাদের নাড়া দেয়। হতদরিদ্র এই পরিবারের একটি স্কুল পড়–য়া সন্তান হারানোর বেদনা যে কত কষ্টকর সেটা সহজেই বোঝা যায়।

পাথরঘাটা ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. জালাল উদ্দিন ইকবাল ‘ঢাকা প্রতিদিন’কে বলেন, সে দিন হরতাল ছিল। বেলা ১২টায় বাড়ির কাছে সেন্ট প্লাসিডস্ স্কুলের সামনে এমন বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। উত্তর সে সময় একটি মিছিলের পেছনে পেছনে স্কুলের দিকে যাচ্ছিল। আমার বাবা উত্তমের বাবার বন্ধু। সেই সুবাধে আমাদের এবং এলাকাবাসী তখন শোকাতুর হয়ে উঠে।
আসন্ন চসিক নির্বাচনে পাথরঘাটা ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা পুলক খাস্তগীর ‘ঢাকা প্রতিদিন’কে বলেন, তখন ঘটনাটি শুনে অনেক খারাপ লেগেছে। স্কুলে যাওয়ার পথে বোমা বিস্ফোরণে একজন শিক্ষার্থীকে চিরজীবনের জন্য বিদায় নিতে হবে তা ভাবতেও অনেক কষ্ট লাগে।

এদিকে উত্তম নিহতের ঘটনায় ১৯৮৯ সালের ১৩ জানুয়ারী দৈনিক সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর আগের দিন ১২ জানুয়ারী বাংলার বাণীতে প্রকাশিত হয়। ওই সময় উত্তম বিশ্বাস নিহতের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারাদেশে ১২ জানুয়ারী পূর্ণদিবস এবং ১৩ জানুয়ারী অর্ধ দিবস হরতাল পালন করেন। এ সময় সংগঠনটি এক বিবৃতিতে হরতাল চলাকালে মিছিলের উপর জামায়াত শিবিরের বোমা নিক্ষেপে উত্তম বিশ্বাস নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *