বাড়তি ২০০ টাকা দিতে না পারায় চাল দেয়নি ডিলার

সারাবাংলা

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক : ‘বাবারে বয়স বেশি হওয়ায় এখন আর মানুষের ক্ষেতে খামারে খাটতেও পারি না। আয় রোজগারও হয় না। শেখের মেয়ে ক্ষমতায় আসার পর গরিবের জন্য ১০ টাকা কেজি চালের ব্যবস্থা করে দিছে। গ্রামের মেম্বার সাব আমারে ১০ টাকা কেজি দরের ৩০ কেজি চালের জন্য একটা কার্ড দিছিল। অনেক দিন ধরেই ৩০০ টাকা দিয়ে চাল নিয়ে অসুস্থ বুড়িরে নিয়ে কোনও মতো চলছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বেগুনবাড়ি বাজারে ৩০ কেজি চালের জন্য আসলে ৩০০ টাকা ছাড়াও ডিলার বেটা বাড়তি আরও ২০০ টাকা দাবি করে। হাতে টাকা না থাকায় ধার করে ৩০০ টাকা নিয়ে আইছিলাম। বাড়তি ২০০ টাকা দিতে না পারায় ডিলার চাল দেয়নি। টাকা যারা দিতে পেরেছে তারাই চাল নিতে পারছে। কী আর করমু চাল ছাড়াই বাড়ি ফিরে গেছি।’

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বেগুনবাড়ি বাজারে চালের আশায় এসে বরিয়ান গ্রামের বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলাম (৭০) কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন। তিনি আরও জানান, বাড়তি ২০০ টাকা কিসের জন্য দিতে হচ্ছে এই কথা জিজ্ঞাসা করায় ডিলার তাদের সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করেছে। এটা গরিবের ওপর জুলুম ছাড়া আর কিছুই না।

শুধু সিরাজুল ইসলাম নয়, খাগডহর ইউনিয়নের উপকারভোগী ২১২২ হতদরিদ্রের একই অবস্থা। মির্জাপুর গ্রামের মাহফুজা বেগম (৬৫) (কার্ড নম্বর ১৫৭৩) জানান, তার স্বামী মকবুল হোসেন দীর্ঘ দিন ধরে প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী। আয়-রোজগার করার মতো কেউ নেই। শাক-সবজি বিক্রি করে সংসার চলে। তিনিও ধার করে ৩০০ টাকা নিয়ে চালের জন্য এসে ডিলারকে বাড়তি ২০০ টাকা দিতে না পেরে বুধবার চাল ছাড়াই বাড়ি ফিরে গেছেন।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, চাল ছাড়াই বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ স্বামীর মুখে ভাত দিতে পারিনি। সুদে ধার করে বাড়তি ২০০ টাকা নিয়ে এসেছি চালের জন্য। ৩০ কেজি চাল পেলে পুরো মাস চলে যায় তাদের। শাক-সবজি বিক্রি করে খুব কষ্টে ধারের টাকা সুদ করতে হবে।

অনেকে আবার সংসারের অভাব মেটাতে ডিলারের চাহিদার বাড়তি ২০০ টাকা বাধ্য হয়েই পরিশোধ করে চাল নিয়ে গেছেন। বাড়তি টাকা দেওয়া উপকারভোগী বেগুনবাড়ির আম্বিয়া বেগম ( কার্ড নম্বর ১৮৩৯) জানান, বুধবার সকালে ডিলারের দোকানে চালের জন্য আসলে বাড়তি ২০০ টাকা দাবি করে। জানতে চাইলে চেয়ারম্যানের নির্দেশে ২০০ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে জানায় ডিলার। তবে বাড়তি ২০০ টাকার জন্য কোনও রশিদ দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও জানান, বাড়তি টাকা না দিলে ডিলার ও তার সহযোগীরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই চেয়ারম্যান, মেম্বার ও ডিলার জোট হয়ে গবিবের ওপর জুলুম করছে। এর বিচার দাবি করেছেন তিনি।

ডিলারের বাড়তি টাকা নেওয়ার প্রতিবাদে স্থানীয় হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার  দুপুরে বেগুনবাড়ি ডিলারের দোকানের সামনের সড়কে বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

খাগডহর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ বাদল জানান, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে ১০ টাকা কেজি চালের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি হাতে নেন। তবে স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও ডিলারের যোগসাজশে এবার বাড়তি ২০০ টাকা নেওয়ায় হতদরিদ্ররা বিপদে পরেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারের সাফল্যকে নস্যাৎ করার চক্রান্ত দাবি করে তদন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি করেছেন তিনি।

খাগডহর ইউনিয়নের সাবেক ডিলার ইউসুফ আলী জানান, স্থানীয় চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন নান্নু নির্বাচিত হয়েই পুরনোদের বাদ দিয়ে তার পছন্দের নতুন ডিলার নিয়োগ দিয়ে ট্যাক্সের নামে হতদরিদ্রদের কাছ থেকে বাড়তি ২০০ টাকা করে আদায় করছেন।

খাগডহর ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজির চালের উপকারভোগী সংখ্যা ২১২২ পরিবার। ইউনিয়নে ডিলার রয়েছে ৪ জন। বেগুনবাড়ি বাজারে মারুফ এন্টারপ্রাইজের ডিলার মোমেন মুমিদ এর আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৫৩০ জন। গত বুধবার বাড়তি ২০০ টাকার বিনিময়ে চাল দেওয়া হয়েছে ৩৩২ পরিবারকে। বাকিরা চাল না নিয়ে ফিরে গেছেন। সাংবাদিক আসার খবরে দোকান বন্ধ করে ডিলার সটকে পড়েন।

ডিলার মোমেন মুমিদ জানান, চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন নান্নুর নির্দেশেই বাড়তি ২০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। যারা টাকা দিতে পারেনি তাদের চাল দেওয়া হয়নি।

খাগডহর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন নান্নু জানান, বাড়তি ২০০ টাকা নেওয়ার জন্য ডিলারকে তিনি কোনও নির্দেশ দেননি। ডিলার নিজ দায়িত্বেই বাড়তি টাকা নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।

লারের বাড়তি ২০০ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বুধবার ডিলাররা চাল দেওয়ার সময় চেয়ারম্যানের নির্দেশে হতদরিদ্রদের কাছ থেকে বাড়তি ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে এধরনের একটি অভিযোগ এক ডিলারের মাধ্যমে ফোনে তিনি জানতে পেরেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে চেয়ারম্যানের কাছে জানার জন্য ফোন করলে চেয়ারম্যান অস্বীকার করেছেন। তবে ভুক্তভোগীরা কেউ তার কাছে অভিযোগ করলে এ বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *