বীর ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত গোপিনাথ জিউর আখড়া

সারাবাংলা

ছিদ্দিক মিয়া, কটিয়াদী থেকে:
পাঁচশ বছর আগে নির্মিত গোপীনাথ জিউর মন্দির বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম বীর ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। কটিয়াদী উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর দিকে আচমিতা ভোগ বেতাল এলাকায় মন্দিরটি অবস্থিত। গোপীনাথ জিউর মন্দিরটিকে সংস্কার করা হলে এটি হতে পারে এ অঞ্চলের নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র। সুপ্রাচীন এই দেবালয়টি মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সামন্তরাজা নবরঙ্গ রায় নির্মাণ করেন। গোপীনাথ জিউর মন্দিরের দক্ষিণে অবস্থিত কুটামন দিঘিও রাজা নবরঙ্গ রায়ের স্মৃতিস্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৩০ একর আয়তনের বৃহৎ এই জলাশয়টি প্রাচীন এই মন্দিরের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থাপত্য শিল্পের দিক দিয়ে গোপীনাথ জিউর মন্দিরটিতে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের প্রাচীন মন্দিরের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। এই মন্দিরটি দেখার জন্য প্রতি বছর এখানে অসংখ্য পর্যটক ভিড় জমান। বর্তমানে দেয়াল ঘেরা মূল ফটক দুটি। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকালে মূল মন্দিরসহ পুরাতন মন্দির ছিল সাতটি প্রায়। অর্ধমাইল ছিল গোপীনাথ জিউর মন্দিরের অবস্থান এলাকা। বর্তমানে ২টি মন্দির, ১টি রন্ধনশালা, ৩টি অতিথি শালা, ১টি শিব মন্দির, ১টি ঝুলন মন্দির, ১টি ভান্ডার ঘর, ১টি নাথ মন্দির, ১টি পুকুর, ১টি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও ১টি অফিস কক্ষ রয়েছে। এত বিশাল আয়তনের আখড়া এ জেলায় দ্বিতীয়টি আর নেই। বর্তমানে এ মন্দিরে নিম কাঠের তৈরি ৩টি মূর্তিসহ বেশ কটি পিতলের মূর্তি রয়েছে। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত আদি কষ্টি পাথরের তৈরি বিরাট আকারের মূর্তি সুভদ্রাবলারাম ও রাধিকার বিগ্রহ গুলি চুরি অথবা পাচার হয়ে গেছে। বর্তমানে এগুলো কাঠের দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দির এবং মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের নামে অনেক লাখেরাজ জমি ছিল। এই লাখেরাজ বিস্তার জমি জঙ্গলবাড়ীর দেওয়ান বীর ঈশা খাঁ দান করেছিলেন। জনশ্রুতি রয়েছে- শ্রী চৈতন্যদেবের সম সাময়িককালে তারই এক অন্যতম ভক্ত শিষ্য ভারতের উড়িষ্যার পুরী নিবাসী শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব স্বপ্ন যোগে আদেশ প্রাপ্তি হয়ে আচমিতার এই গহীন জঙ্গলে এসে উপস্থিত হন। এখানে এসে তিনি বিগ্রহের পূজার জন্য ভোগের ব্যবস্থা করেন। ঠিক ওই সময়ে পাশ দিয়ে ঈশা খাঁ হয়তো জঙ্গলবাড়ী অথবা এগারসিন্দুর অথবা এগারসিন্দুর যাওয়ার পথে জগন্নাথ সন্নাসীর ভোগের ঘ্রাণে বেতাল সুগন্ধি ছড়িয়ে দেওয়ানের নাকে ঘ্রাণে আকৃষ্ট ও অস্থির হয়ে শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের সঙ্গে দর্শন লাভ করে। ঘটনাক্রমে সন্নাসী জগন্নাথ গোসাই এর কাছ থেকে সবকিছু জেনে দেওয়ান ঈশা খাঁ নিজ ব্যয়ে বিগ্রহসহ মন্দির ও বিস্তার লাখেরাজ সম্পত্তি দান করেন। অন্যদিকে চারিপাড়া তান্ত্রিক সামন্তরাজ নবরঙ্গ রায়ের সঙ্গে বীর ঈশা খাঁর প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে সামন্তরাজ নবরঙ্গ রায় পরাজিত হলে চারিপাড়া সহ এলাকার সমস্ত ভূমি বীর ঈশা খাঁ অধিকারে আসে।
এককালে স্থানীয় জমিদার তালুকদার তাদের হাতি ঘোড়া দিয়ে রথ টেনে মাসি-পিসির বাড়িতে আনা নেওয়া হতো। গোপীনাথ জিউর হতে ১ কিলোমিটার গুন্ডিচা বাড়ী পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ পথ রথ যাত্রার ইতিহাসে ভোগ বেতাল আজও বিখ্যাত। বিগত ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে শ্রীবেদ্র ভূমিকম্পে মূল মন্দিরটির বারান্দা সহ বেশ কয়েকটি মন্দিরসহ মন্দিরের বিভিন্ন সংশ ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীকালে পূর্বাংশে একটি নতুন মন্দির নির্মাণ করে মূল মূর্তিগুলো সেখানে স্থাপন করা হয়। মন্দিরের কাঠের দরজাগুলো প্রাচীন আমলের তৈরি। বিভিন্ন সময়ে বর্তমান রথটি সংস্কার করার পর বর্তমানে এটি ৯ চাকা বিশিষ্ট রথ হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর গোপীনাথ রথ যোগে তার গুচিন্ডা নামক বাড়ি গমন করেন। সপ্তাহ কাল পরে নিজ বাড়িতে অর্থাৎ মন্দিরে ফিরে আসেন। পথের মধ্যে গোপীনাথ মাসীর বাড়ি এবং পিসির বাড়ি অবস্থান করেন। গোপীনাথের ১টি পুকুর নিয়ে স্থানীয়ভাবে মামলা রয়েছে। রথযাত্রা মেলা উপলক্ষ্যে আচমিতা ভোগ বেতাল গোপীনাথ মন্দির সংলগ্ন বিস্তর এলাকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্যক লোকের সমাগম ঘটে। জাতি বর্ণ নির্বিশেষে এ মেলার ঐতিহ্য হয়ে উঠে লাখো মানুষের মিলনমেলা। এ মেলার প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠে বিভিন্ন প্রজাতির পাখ-পাখালির সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। যেমনÑ ময়না, টিয়া, শ্যামা, পিক হলদে পাখি ইত্যাদি। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা পাখি সংগ্রহ করতে এ মেলায় ছুটে আসেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *