বুড়িগঙ্গার ঐতিহ্য ফেরাতে ডিএসসিসি’র মাস্টারপ্ল্যান

নগর–মহানগর

ব্যয় নির্ধারণ ৫ হাজার কোটি টাকা

এসএম দেলোয়ার হোসেন
খোলা জানালা হিসেবে পরিচিত রাজধানীর পুরান ঢাকার কোল ঘেঁষা বুড়িগঙ্গার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। বুড়িগঙ্গা নদী ও আদি চ্যানেলের বর্জ্য অপসারণ, দখল-দূষণ রোধ, খনন কাজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্রিজ ও ওভারপাস নির্মাণ, নদীর দু’পাশে সবুজ বেষ্টনী, বৃক্ষরোপণসহ নদীটি দৃষ্টিনন্দন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদীর প্রবাহমান স্রোতধারা আর শহরের পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যার সমাধান করা হবে। নদী ঘিরে গড়ে উঠবে বিনোদন স্পট। এ জন্য এর সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। পরিবেশবিদরা বলছেন, এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে বুড়িগঙ্গা ও তার আদি চ্যানেল ফিরে পাবে হারানো ঐতিহ্য। বুড়িগঙ্গার সার্বিক উন্নয়ন কাজে ডিএসসিসি যে উদ্যাগ হাতে নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে। ডিএসসিসিসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়রা জানায়, রাজধানীর কোল ঘেঁষা পুরান ঢাকার খোলা জানালা হিসেবে পরিচিত ছিল প্রমত্তা বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গা নদীর বুক চিরে প্রতিনিয়ত ছুটে চলতো পণ্যবোঝাই পাল তোলা সারি সারি নৌকা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধরনের নিত্যপণ্য নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে পুরান ঢাকার শ্যমবাজার, বাবুবাজার, ওয়াইজঘাট, সোয়ারিঘাট, জিঞ্জিরা, মুসলিমবাগ, আলিরঘাট, লালবাগের নবাবগঞ্জ বাজার ঘাটে ভিড় করতো শ’ শ’ নৌকা।
নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সাইজুদ্দিন আহমেদ সাজু জানান, আশির দশকে প্রমত্তা বুড়িগঙ্গা নদীর তীব্র স্রোত দেখে নদী তীরে যেতেই ভয় লাগতো। কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ থেকে বুড়িগঙ্গার একটি শাখা নদী (আদি চ্যানেল) লালবাগের শহীদনগর, আমলিগোলা, নবাবগঞ্জ বাজার, হাজারীবাগের কোম্পানীঘাট, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুরের বছিলা দিয়ে মূল নদীর সাথে সংযুক্ত ছিল। গাবতলীর তুরাগ নদীর সাথে মিশেছে বুড়িগঙ্গা নদী। প্রয়াত এরশাদ সরকারের শাসনামলে পুরান ঢাকার লালবাগের নবাবগঞ্জ বাজার সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার শাখা নদী দিয়ে নৌকায় চড়ে বাপ-দাদার সাথে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে যেতেন তারা। বুড়িগঙ্গার শাখা নদীতে গোসল থেকে শুরু করে মাছ ধরাও হয়েছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে প্রয়াত এরশাদ সরকারের শাসনামলে শহর রক্ষায় বাবুবাজার থেকে গাবতলী পর্যন্ত সাড়ে ১১ কি.মি. বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপরই বদলে যায় বুড়িগঙ্গা শাখা নদীর সব দৃশ্যপট। এরশাদ সরকারের শাসনামলের শেষ সময় ১৯৯০ সাল থেকেই বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। দখল প্রক্রিয়ার কৌশল হিসেবে ভুমিদস্যুরা প্রথমে বাসাবাড়ির বর্জ্য আর ভবনের নির্মাণসামগ্রী ফেলতে থাকে। শাখা খালটি পর্যায়ক্রমে ভরাটের পরই বাঁশের খুঁটি গেড়ে দখলের পাকাপোক্ত করা হয়। এভাবেই চলে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানল দখলের মহোৎসব। আদি চ্যানেলের জায়গায় সরকারি-বেসরকারিভাবে স্থায়ী অবকাঠামো হিসেবে ম্যাটাডোর, পান্না গ্রুপের প্রতিষ্ঠানসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে নদীর আদি চ্যানেলসহ মূল নদীর পানিও মারাত্নকভাবে দূষিত হচ্ছে। সেই দখল-দূষণ আজও চলমান রয়েছে। এরশাদ সরকারের শাসনামল থেকে এ পর্যন্ত যতটি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারই বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের ৪ নদী (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষা ও বালু নদী), শাখা নদীসমূহ রাজধানীর সব খাল দখল-দূষণমুক্ত করতে অর্থ বরাদ্ধসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদেও কয়েকদিন না যেতেই ফের ওইসব স্থানগুলো ভুমিদস্যূদের আগ্রাসী থাবায় সরকারের সব উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে। নদী ও শাখা নদী (চ্যানেল) এবং খাল রক্ষায় এ পর্যন্ত সরকার যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়নের সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে। তবেই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভভ হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুরান ঢাকার মুসলিমবাগে বুড়িগঙ্গার শাখা নদী (আদি চ্যানেল) থেকে শুরু করে লালবাগ, কামরাঙ্গীরচরের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ সড়কের পশ্চিম পাশের খালকে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার হয়ে বছিলা দিয়ে বুড়িগঙ্গার মূল নদীর সাথে সংযুক্ত করা হবে। চ্যানেলের দুই পাশে দৃষ্টিনন্দন সবুজ গাছ-গাছালিসহ উন্মুক্ত স্থান, ব্রিজ, ওভারপাস, বিনোদন স্পট থাকবে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বড় একটি অংশের পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান হবে। পাশাপাশি লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, ইসলামবাগে আরও আধুনিক বাসযোগ্য পরিবেশ হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্র জানায়, বুড়িগঙ্গার শাখা নদীটি (আদি চ্যানেল) ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে বিস্তির্ণ এ জনপদের পরিবেশও দূষিত হয়েছে। প্রভাবশালীরা বুড়িগঙ্গার জমি দখল করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। অনেকে জাল-দলিলও করেছেন। কোনো কোনো স্থানে মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন এলাকাবাসী। এই চ্যানেল পুনরুদ্ধারে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়রকে নির্দেশ দেন। বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস নতুন করে এ চ্যানেল পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছেন।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার পশ্চিমের শাখা নদীর (আদি চ্যানেল) দখল-দূষণ রোধ ও নদীর জায়গা পুনরুদ্ধারের দাবিতে বিভিন্ন সময় সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনায় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় উচ্ছেদ অভিযান। চলে শাখা খালের (আদি চ্যানেল) বর্জ্য অপসারণ। কিন্তু সেই প্রকল্পের কার্যক্রম কিছুদিন পরিচালনার পরই অদৃশ্য কারণে বন্ধ হয়ে যায়। তবে এবার ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা বাস্তবায়ন হলে সার্বিক দৃশ্যপট ঘুরে যাবে। হারানো প্রাণ ফিরে পাবে প্রমত্তা বুড়িগঙ্গা। নদীতীরের সবুজ বেষ্টনীতে শ্বাস-নিঃশ্বাস নিতে পারবে নগরবাসী। তবে এবারের এ প্রকল্প বাস্তবায় অনেকটা কঠিন হলেও সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে বলেও জানান পরিবেশবিদরা।
ডিএসসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাকের জানান, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিকে (এমআইএসটি) দেওয়া হয়েছে দায়িত্ব। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকার এক অংশের পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান ঘটবে। আদি চ্যানেলের দুই পাশের আধুনিকায়ন হবে এবং আশপাশের পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে।
ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জানান, বুড়িগঙ্গা ও তার শাখা নদীর (আদি চ্যানেল) ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে দখল-দূষণ রোধে নদীর জায়গা পুনরুদ্ধারে মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত বুড়িগঙ্গার শাখা নদীটি (আদি চ্যানেল) পুনরুদ্ধারে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিকে (এমআইএসটি) দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি এর কাজ করবে। নদী খনন, বর্জ্য অপসারণ, নদীর অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্রিজ, ওভারপাস নির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়ন কাজ করবে এমআইএসটি। এজন্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে। বুড়িগঙ্গার শাখা নদীটি পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ডিএসসিসি’র মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *