বেপরোয়া জাল টাকার কারবার

জাতীয়

ভাড়া করা ফ্ল্যাটে টাকা তৈরির কারখানার সন্ধান
পাইকারিতে প্রতি লাখ জাল টাকার মূল্য ১০ হাজার
 ৩-৪ ধাপে হাত বদল হয়ে বাজারজাত করা হয়
 ২০ লাখ টাকার জালনোটসহ গ্রেফতার ৩

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
থামছেই না জাল টাকার কারবার। চলমান বৈশ্বিক মহামারিতেও এরা থেমে নেই। এরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। দেশে ঈদ কিংবা পূজার মতো বড় কোন উৎসব এলে চক্রটি বেশি সক্রিয় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এখনও জাল টাকা তৈরি ও বাজারজাত করে আসছে। চক্রের সদস্যরা নানা কৌশলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেখানেই গড়ে তুলছে জাল টাকা তৈরির কারখানা। এসব জাল নোট প্রস্তুতকারীরা চাহিদানুযায়ী প্রথম ধাপে ডিলারের মাধ্যমে পাইকারি দরে প্রতি লাখ জাল টাকা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে মাঠ পর্যায়ে খুচরা দরে সেই জাল টাকা লাখ প্রতি বিক্রি করা হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। প্রথম থেকে মাঠ পর্যায়ে ৩-৪ ধাপে হাত বদল হয়ে পাইকারী মার্কেট-বাজারে পৌঁছে যায়। এরপর এ চক্রের সাথে জড়িত নারী-পুরুষ ওইসব জাল টাকা দিয়ে বাজার থেকে নিত্যপণ্য কেনার মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে জাল টাকা কারবারি চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এবারও এর কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। এর আগেও চক্রের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলিয়ে জামিনে ছাড়া পেয়ে পুরনো এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। অল্প পুঁজিতে বহুগুণ লাভ থাকায় এ পেশা ছাড়ছে না জাল টাকার কারবারিরা। এবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে জালনোট বিক্রির চেষ্টাকালে ২০ লাখ টাকার জালনোটসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে চক্রের ৩ সদস্য। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মো. ওয়ালিদ হোসেন জানান, গত সোমবার (৩০ নভেম্বর) দুপুরের দিকে গোপন সংবাদে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় অভিযান চালায় তেজগাঁও বিভাগের গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। সেখান থেকে জাল টাকা বেচাকেনার সময় মো. সুমন মিয়া (৩০), মো. বিপ্লব হোসেন (৩২) ও মো. রাজিব শিকদার (৩৫) নামে ৩ জনকে গ্রেফতার করে। তখন তাদের হেফাজত থেকে ২০ লাখ টাকার জালনোট উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ঈদ কিংবা পূজা ছাড়াও জাতীয় বড় কোন উৎসব এলে জাল টাকার কারবারিরা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। করোনার দুর্যোগের মধ্যেও চক্রটি এখনও তৎপর রয়েছে। জালনোট চক্রের সদস্যরা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। অল্প পূঁজিতে বহুগুণ লাভ থাকায় জাল নোটের ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছে নারীসহ সাধারণ বেকার মানুষও। চক্রের সদস্যরা পুলিশের গতিবিধি অনুসরণ করে নিরাপদ ও সুবিধাজনক স্থান নির্ধারণ করে নিরিবিল বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে এ ব্যবসা চালিয়ে আসছে। হাত বদল করে জাল টাকা বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে চক্রটি। এতে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন নিরীহ জনগণসহ পাইকারি-খুচরা ব্যবসায়ীরা। যার ফলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। জাল টাকার বিস্তাররোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে। বাড়াতে হবে গোয়েন্দা নজরদারি। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে। অপরাধীদের ব্যাপারে আদালতে চার্জশীট প্রদানের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাদের আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। একইসঙ্গে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এছাড়া জাল টাকার বিস্তাররোধ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করে জাল টাকার বিস্তার রোধ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
ডিএমপির গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, শুধু ঈদ কিংবা দুর্গাপূজা নয়, ধর্মীয় ও জাতীয় কোন উৎসব এলেই তৎপর হয়ে ওঠে এ চক্রের সদস্যরা। জাল নোট প্রস্তুতের পর প্রথম ধাপে ১ লাখ টাকার জাল টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করা হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ১৪ থেকে ১৬ হাজার ও তৃতীয় ধাপে সেই টাকা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। পরবর্তীতে সেই জাল টাকা মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বহন করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে পৌঁছে দেয়। এরপর নিত্যপণ্য ক্রয় করে তা বাজারজাত করে এ চক্রের সক্রিয় সদস্যরা। মাঝে মধ্যে এরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলিয়ে কখনো জামিনে আবার কখনো ২-৪ বছর জেল খেটে ছাড়া পেয়ে পুরনো এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। জাল টাকার চক্রটির দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি’র গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ডিএমপির (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, এর আগে গত ১৮ অক্টোবর বিকেলে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় অভিযান চালায় ডিবি’র সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিম। এ সময় সেখানে জাল টাকা তৈরির কারখানার সন্ধান পায় ডিবি পুলিশ। ওই কারখানা থেকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করা হয় জাল টাকা তৈরির সাথে সম্পৃক্ত দুই নারীসহ ৪ জনকে। এরা হলেন- মোঃ হুমায়ন কবির খান (৪৫), মোঃ জামাল (৪২), সুখী আক্তার (৩০) ও তাসলিমা আক্তার (৩০)। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে ৪৯ লক্ষ ৫০ হাজার বাংলাদেশি জাল টাকা উদ্ধার করা হয়। সেই সাথে জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত ১টি ল্যাপটপ, ২টি প্রিন্টার, ৫টি স্ক্রীন প্রিন্ট দেয়ার ফ্রেম, জাল নোট তৈরির জন্য ২৫০০ পিস সাদা কাগজ, ৯টি বিভিন্ন রংয়ের কালির কার্টিজ, সিকিউরিটি থ্রেট পেপারের রোল ১টি, প্লাস্টিকের কালির কৌটা ৩টি ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। অভিযানে উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম দিয়ে আনুমানিক ৫ থেকে ৬ কোটি জাল টাকা তৈরি করা সম্ভব। তিনি জানান, গ্রেফতারকৃত হুমায়ন ও জামাল ২০০৮ সালের দিকে দুরুল হুদা নামের এক কারিগরের কাছে জাল টাকা তৈরির কৌশল শিখেছে। এরপর নিজেই জাল টাকা তৈরির কারখানা চালু করে হুমায়ন। গ্রেপ্তারকৃত জামাল শুরু থেকেই হুমায়নের তৈরিকৃত জাল টাকার ডিলার হিসেবে কাজ করে আসছে। গ্রেপ্তারকৃত দু’জন নারী তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। অল্প পুঁজিতে লাভ বহুগুণ। তাই বার বার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পরও জামিনে ছাড়া পেয়ে আবারও একই পেশায় জড়িয়ে পড়েন তারা। চক্রের প্রধান হুমায়ূন এ পর্যন্ত ৬ বার গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছেন। নারী পুলিশের কতিপয় সদস্য এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলেও চক্রের এক সদস্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি পুলিশকে জানিয়েছে।
সহকারী পুলিশ কমিশনার মহিউদ্দীন আহমেদ জানান, এই চক্রের মূলহোতা প্রথম পাইকারি বিক্রেতার নিকট প্রতি লাখ জাল টাকা বিক্রি করতো ১০-১২ হাজার টাকায়। প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে প্রথম ধাপে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে। পরে পাইকারি বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রি করতো ১৪-১৬ হাজার টাকায়। প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার নিকট বিক্রি করতো ২৫-৩০ হাজার টাকা। মাঠ পর্যায়ে দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার হাত ধরে সেই টাকার মূল্য হয়ে যায় আসল টাকার সমান। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বা দ্রবাদি ক্রয়ের মাধ্যমে এই জাল টাকা বাজারজাত করতো। তিনি জানান, চলমান মহামারী করোনাভাইরাসের সংকটের মধ্যেও তারা ব্যাপক প্রস্তুতির মাধ্যমে আবারও জাল টাকা তৈরিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন। এই চক্রটি আসন্ন দূর্গাপূজাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জাল টাকা বিস্তারের পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা রুজু হয়েছে। এ চক্রের অন্যান্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছেন ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এদিকে ডিএমপির গোয়েন্দা তেজগাঁও বিভাগের সহকারি পুলিশ কমিশনার মোঃ বায়েজীদুর রহমান ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, গত সোমবার দুপুরের দিকে তিনি গোপন সংবাদে জানতে পারেন কতিপয় ব্যক্তি মোটা অংকের জাল টাকাসহ মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের সামনে বিক্রির জন্য অবস্থান করছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তার নেতৃত্বে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ৪ জনকে গ্রেফতারসহ ২০ লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃত সুমনের নিকট হতে ১০ লাখ, বিপ্লবের নিকট হতে ৬ লাখ এবং রাজিবের নিকট হতে ৪ লাখ টাকা মূল্যের জাল টাকা উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়। তারা ৩ জনই জব্দকৃত ২০ লাখ জাল টাকা প্লাষ্টিকের বাজারের ব্যাগে বহন করছিল। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ডিবি পুলিশের গুলশান বিভাগের একই টিম গত ২৪ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থানা এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে ৬১ লাখ ৫০ হাজার জাল নোটসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে। এরপর গত ২৮ সেপ্টেম্বর ডেমরায় অভিযান চালিয়ে ৬৫ লাখ জাল টাকা ও জালনোট তৈরির সরঞ্জামসহ জাল টাকা তৈরি চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের একটি টিম।
এদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানান, জাল টাকার বিস্তার রোধে প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলে, গ্রেপ্তার ও জেল জরিমানা সবই হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। তারপরও এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। আইনের দুর্বলতার কারণেই অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে পুরনো এ পেশায় ফের জড়িয়ে পড়ছে। তদন্ত কর্মকর্তাকে আরও কঠোর মনোভাব নিয়ে চার্জশিট দাখিল করতে হবে। যাতে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে অপরাধীরা ছাড়া না পায়। তবেই জাল টাকার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

 

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *