ব্রহ্মপুত্রে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন

Uncategorized

আব্দুল হাফিজ, ময়মনসিংহ ব্যুরো
ব্রহ্মপুত্র নদ খননের নামে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও ওয়েষ্টান কোম্পানীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে হাইড্রোলিক ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বালু বিক্রি করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের বাসিন্দারা। শত শত একর আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলাধীন চর আলগী, শনিপাড়া ও সালটিয়া সেতু সংলগ্ন এলাকায় চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। এসব বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্থানীয় খোরশেদ আলম, মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম গত বছরের ২২ অক্টোবর এবং চলতি বছরের ৫ জানুয়ারী আবেদন করেছেন। এ আবেদনের অনুলিপি গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সহকারী (ভূমি) কর্মকর্তা, ৩নং চর আলগী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকেও দেওয়া হয়েছে। এ আবেদনের সঙ্গে আলাদাভাবে এলাকাবাসীর স্বাক্ষরও সংযুক্ত করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে বিভিন্ন সময়ের দাখিলকৃত একাধিক দরখাস্তের কপির সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে গফরগাঁও উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার নির্দেশে চর আলগী ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সরেজমিনে তদন্তপূর্বক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে গত মে মাসে সংশ্লিষ্ট তহসিল অফিসের ২২নং স্মারক মূলে একটি প্রতিবেদন ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন।
জানা যায়, প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ ব্রহ্মপুত্র নদ খনন করে এ পর্যন্ত ৯০ লাখ টাকা বালু বিক্রি করেছে, তা সরকারী কোষাগারে জমা দেয় নাই। এর সঙ্গে প্রভাবশালী একটি চক্র জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ করেছে। পরবর্তীতে বিআইডব্লিউটিএ অফিস থেকে দুই সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল গত ২২ জুন সরেজমিনে তদন্তে আসেন। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিয়মান হয় নদের তীরবর্তী যেসব স্থানে বালু মজুদ করা হচ্ছে সেই সব সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি এবং আবাদি ভূমি। প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রেরিত আবেদনে যা উল্লেখ করা হয়Ñ গফরগাঁওয়ের চর আলগীবাসী ১৯৭১ সালে ১৫ নভেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়। ওই সময় তাদের ১ হাজার ৪৪০টি ঘরবাড়ী পুড়ে গ্রামবাসীদের নিঃস্ব এবং অসহায় করে দেয়। পাক বাহিনীর হাতে ৪২ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হন। তারপর বিভিন্ন সময় বন্যায় এবং নদ ভাঙনের সাথে যুদ্ধ করে তারা বেঁচে আছে। গত ২০ বছর যাবৎ তাদের ভাঙন কবলিত জমিতে পলি পড়ায় তারা সুখের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তবে গত ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মাঝামাঝি সময়ে জোরপূর্বক গফরগাঁও পৌর যুবলীগ আহ্বায়ক মো. তাজমুন আহম্মেদ ও তার ক্যাডার বাহিনী দলীয় প্রভাব খাটিয়ে হাইড্রোলিক ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে নদ খননের নামে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রায় ১৫টি বড় বড় ড্রেজার স্থাপন করে। বালু উত্তোলন ও বালু বিক্রি শুরু করে, যার তিনটি বর্তমানে চলমান অবস্থায় আছে। এই অবস্থায় তাদের বাড়ীঘর ভাঙনের সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। সারাক্ষণ আতংকের মধ্যে শনিপাড়া, বালুয়াকান্দা এবং টেকির চরের লোকজন বসবাস করছে। তাদের প্রায় তিনশ একর ফসলী জমি যা থেকে তারা ধান, বাদাম, ডালসহ অন্যান্য শাক-সবজি উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের ওই জমিগুলোতে জোরপূর্বক অপরিকল্পিতভাবে বালু ফেলার ফলে তাদের ফসলী জমিগুলো নষ্ট হয়ে পড়েছে। ফসলী জমিতে ব্যবহৃত ৫টি গভীর নলকূপ বালির নিচে বিলীন হয়ে গেছে। এতে প্রায় তিনশ একর জমি অনাবাধি থাকবে। যার মধ্যে আগামী ১০ বছর চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না। এছাড়া অত্র এলাকার সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন মো. মজিবুর রহমান গং। তাদের বসতবাড়ী ওই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের তোপে বিলীন হয়ে গেছে। তারা যে সব জমিতে জৈষ্ঠ মাসে বাদামের ফলস ফলিয়েছে সে সব জমিতে আষাঢ় মাসে বর্ষার পানি উঠলে সেখানে হাইড্রোলিক ড্রেজার বসিয়ে বিনা অনুমতিতে ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। গ্রামের শত শত নারী-পুরুষ গত ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে বালু উত্তোলন বন্ধে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে যা গত ২০১৯ সালের ২০ জুলাই বেশ কিছু জাতীয় পত্রিকাসহ ১২টি টিভি চ্যানেলে সম্প্রচার করা হয়।

এরপর গত ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই বালু উত্তোলন বন্ধে আরও একটি মানববন্ধন করা হয়, যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হয়েছে। তারা আবেদনে আরো বলেন জমিগুলো তাদের সি.এস, এস.এ এবং বি.আর.এস খতিয়ানভুক্ত ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের জন্য ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক বরাবরে গত ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই এবং একই বছলের ১১ সেপ্টেম্বর আবেদন করা হয়। আবেদনকারী মুক্তিযোদ্ধারাসহ অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা তাদের কষ্টের বর্ণনা দিয়ে এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সর্বমহলের ও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। গ্রামবাসী জীবন জীবিকার স্বার্থে নদ খননের নামে অবৈধ বালু উত্তোলন ও বালু বিক্রি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট তহসিল অফিসে যোগাযোগ করলে তহসিল অফিস থেকে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষ বরাবরে জমা দিয়ে দিয়েছি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *