মহামারীতে বেড়েছে ঘরের কাজও, স্বীকৃতি কোথায়

নারী ও শিশু

অফিসের কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি গৃহকর্মী না থাকায় গৃহস্থালির সব কাজও তাকে করতে হচ্ছে।

একদিকে রান্না-বান্না, সন্তানদের দেখাশুনা, ঘরের অন্যান্য কাজ; আবার অফিসের ফোন পেলেই সাথে সাথে বের হয়ে যাওয়া- এসবের ভিড়ে দম ফেলারও পরও মিলছে না রুপির।

তিনি জানান, মহামারীর প্রথম দুই-তিন মাস ঢাকা ও দেশের বাইরে থেকে লোকজন যখন গ্রামে ফিরছিল, সেই সময়টায় শুক্রবারও তার ছুটি মেলেনি। ওই সব মানুষের সাথে যোগাযোগ করা, কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করার কাজে সময় দিতে হয়েছে তাকে।

“যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হয় কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য। কাজের চাপ এখন দ্বিগুণ। ঘরের সব কাজই নিজেকে করতে হচ্ছে। মেয়ে টুকটাক সহযোগিতা করে।”

ব্যবসায়ী স্বামী নিজের কাজে ব্যস্ত থাকায় ঘরের কাজে তার তেমন সহযোগিতা পান না এই নারী।

তিনি বলেন, “বাসার কাজে আগের চেয়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় বেশি দিতে হচ্ছে। অবসরের কোনো সময় থাকছে না। নারী-পুরুষের কাজ ভাগ করে নিলে সুবিধা হয়, একার ওপর এত চাপ পড়ত না।”

মহামারীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই নারীর পরিবারের মতো অধিকাংশ ঘরেই গৃহস্থালি কাজের চাপ বেড়েছে, যেগুলো নারীর ঘাড়েই চেপেছে।

এই সময়ে নারীর উপর নির্যাতনও যে বেড়েছে তা নারী অধিকার সংগঠনগুলোর জরিপে উঠে এসেছে।

কর্মজীবী নারী ও গৃহিনীরা বলছেন, সাধারণ ছুটি চলাকালে পরিবারের অনেক সদস্য ঘরে থাকায় কয়েকগুণ কাজ বাড়লেও তাতে পুরুষদের সহযোগিতা পাননি তারা।

মালিবাগের গৃহিনী শাহনাজ আরা সংসার সামলাতে চাকরিও ছেড়েছিলেন। করোনাভাইরাসের কারণে গৃহকর্মী না আসায় এখন বাড়তি চাপে পড়েছেন তিনি।

গৃহস্থালি কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমার স্বামী প্রায়ই বলে, সারা দিন কী করছ? এগুলা কোনো কাজ? অথচ গৃহকর্মীকে দিয়ে কাজ করালে ঠিকই টাকা দিতে হয়।

“তবে এখন ছেলেরা বাসায় থেকে যখন দেখল আমি কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি, তারা মাঝে মাঝে হেল্প করছে। সব পুরুষের মধ্যে এই মানসিকতাটা এলে নারীদের চাপ কমত।”

করোনাভাইরাসের মধ্যে গৃহস্থালি কাজের জন্য সহিংসতার শিকারও হয়েছেন মিরপুরের পোশাককর্মী মালা বেগম। তার স্বামী সাধারণ ছুটিতে কাজ বন্ধ থাকায় সার্বক্ষণিক বাসায়ই ছিলেন।

মালা বলেন, “যখন সে বাসায় থাকতে লাগল তখন সহিংস হয়ে উঠল। খাবার দিতে দেরি হলে বা কোনো কাজ ভালো না লাগলে গায়েও হাত তুলত।”

মোহাম্মদপুরের গৃহিনী আফরোজা ইসলাম জানান, এখন বাচ্চাদের পেছনেও বড় সময় দিতে হচ্ছে তাকে।

“আগে ওরা স্কুলে থাকত, প্রাইভেট টিউটরদের কাছে যেত। বন্ধুদের সাথে বাইরে যেত, এখন তো এসব পাচ্ছে না। ফলে তাদের পড়াশুনাসহ সব বিষয়ে অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে আমাকে।”

নারীরা যে পুরুষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি গৃহস্থালি কাজের চাপে রয়েছেন, তা গত কয়েক বছরে একাধিক জরিপেও উঠে এসেছে।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরুষদের তুলনায় সাড়ে তিন গুণ বেশি মজুরিবিহীন কাজ করেন নারীরা। একজন নারী সপ্তাহে গড়ে ২৪ ঘণ্টা অর্থাৎ

দিনে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা গৃহস্থালির মজুরিবিহীন কাজ করেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহস্থালির কাজের চাপে অনেক নারী চাকরিতে যেতে পারেন না কিংবা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।

২০১৬ সাল থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ নারী-পুরুষের সময় ব্যয়ের ধরন নিয়ে সমীক্ষা চালিয়ে আসছে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ।

সংস্থাটির সর্বশেষ ২০১৯ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, নারীরা দৈনিক ৪.৬০ ঘণ্টা মজুরিবিহীন সেবামূলক কাজ করেন, যেখানে পুরুষরা করেন ১.১৭ ঘন্টা। বিপরীতে মজুরিসহ কাজে নারীরা যেখানে দৈনিক ২.১৩ ঘণ্টা ব্যয় করেন, সেখানে পুরুষরা ৬.১৮ ঘণ্টা ব্যয় করেন।

মহামারীর মধ্যে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজের বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে নারীদের নির্যাতিত হওয়ার তথ্য সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে উঠে এসেছে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জেন্ডার অ্যাডভাইজার বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কোভিডের সময় আমরা জরিপে পেয়েছি, বড় সংখ্যক নারী আগে কখনও সহিংসতার শিকার হননি। তার মানে সহিংসতা আরও বেড়েছে। আমরা দেখেছি সময়মতো খাবার না দেওয়া, কাজ করতে না পারলে নারীকে মারধরও করা হয়। গৃহস্থালি কাজের সাথে আমরা সরাসরি সহিংসতার সম্পর্ক পেয়েছি।”

সংগঠনটির জরিপে দেখা যায়, গত জুনে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৯৮ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৯৪.৮ শতাংশ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন; যাদের বড় অংশই মানসিক নির্যাতন ও উপার্জন না থাকায় অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এ দুই মাসে প্রথমবার নির্যাতিত হয়েছেন ৫ হাজার ২৪৯ জন নারী।

বনশ্রী মিত্র মনে করেন, গৃহস্থালি কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন।

“এ কাজে নারীকে অর্থ দেওয়া হোক, বিষয়টি তা নয়। বরং এর মূল্যায়ন হোক। এর অর্থনৈতিক মূল্য তুলে ধরা প্রয়োজন, জিডিপি বা ছায়া জিডিপির মাধ্যমে সরকারই এটি তুলে ধরতে পারে।”

চলতি মাসে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, মহামারীর মধ্যে ১০ শতাংশ শ্রমজীবী নারী বাড়তি কাজের চাপে পড়েছেন।

মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, “মহামারীর সময় ভেবেছিলাম পুরুষরা ঘরে আছে, তারা বুঝবে নারীদের কাজের চাপ। এ কাজে অংশগ্রহণ করবে, কিন্তু গুটিকয়েক পুরুষ হয়ত করেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। কারণ তারা ধরেই নিয়েছে এগুলো মেয়েদের কাজ।”

শিশুদের জন্য দিবাযত্ন সেবার ব্যবস্থা এবং লেখাপড়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের মতো বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সরকার নারীদের কাজের চাপ কমাতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

নারীর গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি না থাকায় তারা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন মালেকা বানু।

নারীদের গৃহস্থালি কাজের চাপ কমাতে ও সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যারা এসব বিষয়ে কাজ করছে, জরিপ করছে এবং সুশীল সমাজ আছে- তাদের বিষয়গুলো নিয়ে বেশি করে কথা বলা উচিত। গণমাধ্যমে প্রচার হলে, বিষয়টি ফোকাসে আসলে সচেতনতা তৈরি হবে। তখন এমনিতে কমে আসবে।”

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *