মাওয়া-জাজিরা দুই প্রান্তের সেতুবন্ধনে সামান্য অপেক্ষা

জাতীয়

নিজস্ব প্রতিদেক:  প্রমত্তা পদ্মা নদীতে সেতুর স্বপ্ন ছিলো অভাবনীয়। আর সেই পর্বতপ্রমাণ স্বপ্ন পূরণ হতে আর সামান্য মাত্র বাকি।

এবার সেতুর দুই প্রান্তে জোড়া লাগার পালা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের সেই মহাস্বপ্নের সেতুটির শেষ স্প্যান বসছে আজ বৃহস্পতিবার।

সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের উপর ‘টু-এফ’ নামে এ স্প্যানটি বসোনো হবে। এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হবে সম্পূর্ণ সেতুর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পথ। এরইমধ্যে স্প্যানটি মাওয়া কুমারভোগ কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডে থেকে নির্ধারিত পিলারের কাছে আনা হয়েছে।

বহুমুখী এ সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো। নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর ২০২১ সালেই খুলে দেয়া হবে দেশের ইতিহাসে মাইলফলক হতে যাওয়া স্বপ্নের এ সেতু।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের বলেন, বৃহস্পতিবার সকালের দিকে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর স্প্যান বসানোর কার্যক্রম শুরু হবে। আর এতেই দৃশ্যমান হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।

৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্যে দিয়ে এক নতুন মাইফলক রচিত হবে।

তিনি বলেন, ৪১তম স্প্যান বসানো হলে সেতুর ৪২টি পিলার সবকটি স্প্যান বহন করবে। ইতিমধ্যে ৪০টি স্প্যান বসে গেছে। এতে দৃশ্যমান হয়েছে ৬ কিলোমিটার। এ দিকে জাজিরা প্রান্তে আগেই ২০টি স্প্যান বসানো হয়।

আর মাওয়া প্রান্তে বসানো হয়েছে ১৯টি স্প্যান। ১টি স্প্যান বসানো হয় মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের মাঝখানে। একটি স্প্যান বৃহস্পতিবার বসানো হলেই পুরো পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হবে।

জানা গেছে, পদ্মা সেতুর সার্বিক অগ্রগতি সাড়ে ৮২ শতাংশের বেশি। মূল সেতুর কাজের বাস্তবায়ন কাজের অগ্রগতি ৯১ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৮৮.৩৮ শতাংশ। মূল সেতুর কাজের চুক্তি মূল্য ১২ হাজার ১৩৩.৩৯ কোটি টাকা।

এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৭২৩ দশমিক ৬৩ কোট টাকা। নদীশাসন কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৭৫.৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৬৫.১৭ শতাংশ। নদীশাসন কাজের চুক্তি মূল্য ৮ হাজার ৭০৭.৮১ কোটি টাকা এবং এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৬৭৪.৪৮ কোটি টাকা।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন।

দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড।

নির্মাণ কাজ শুরুর পর নানা চড়াইউৎরাই পেরিয়ে ঝড়-ঝঞ্জার প্রতিকূলতার মধ্যেও এক দিনের জন্য থেমে থাকেনি সেতুর কাজ।

নির্মান শুরুর তিন বছরের মাথায় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর ৩৭ ও ৩৮নং পিয়ারে বসানো হয় প্রথম সুপারস্ট্রাকচার (স্প্যান)।

মূল সেতুর ৪২টি পিয়ারে বসানো হবে ৪১টি স্প্যান এমন পরিকল্পনায় সময়ের সঙ্গে এরপর কর্মযজ্ঞ এগিয়ে চলা।

গত ৩ বছরে সেতুতে বসানো হয়ে মোট ৪০টি স্প্যান। এই স্প্যানের মধ্যদিয়ে দিয়ে চলবে রেল আর উপর দিয়ে অন্যান্য যানবাহন।

সর্বশেষ ৪ ডিসেম্বর সেতুর ১১ ও ১২নং পিয়ারে বসানো হয় ৪০তম স্প্যান “২-ই”। এতে দৃশ্যমান হয় সেতুর ৬ কিলোমিটার অংশ। বাকি আছে দেড়শো মিটার অংশে আর মাত্র ১টি স্প্যান অথাৎ সর্বশেষ ৪১তম স্প্যান বসানোর কাজ।

আবাহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাকি থাকা স্প্যান বসানো হবে বৃহস্পতিবার। সেতুর ১২ ও ১৩নং পিয়ারে বসতে চলেছে সর্বশেষ এই স্প্যান।

এতে প্রমত্তা পদ্মা জুড়ে দৃশ্যমান হবে স্বপ্নের সেতুর পুরো কাঠামো। পদ্মা দুই পাড় মিলবে এক সুতোয়।

প্রস্তুত ৪১তম স্প্যান: বুধবার দুপুরে স্প্যানটি কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে স্প্যানটি বহন করে ভাসমান ক্রেন নিধারিত পিয়ারের অভিমুখে রওনা হয়।

কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে নির্ধারিত পিয়ারে কাছে স্প্যানটি নোঙর করে রাখা হয়েছে।

স্প্যানটির নিরাপত্তায় থাকবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ টিম। আবহাওয়া অনূকূলে থাকলে সকালে স্প্যানটি উপরে তুলে বসিয়ে দেয়ার কাজ শুরু হবে।

স্প্যান বসানোর অগ্রযাত্রা: পদ্মা সেতুতে ২০১৭সালে ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮নং পিয়ারে বসানো হয় প্রথম স্প্যান। পরের বছর ২০১৮ সালের বসানো হয় মোট ৪টি স্প্যান, এদের মধ্যে ২৮ জানুয়ারি ২য় স্প্যান, ১১ মার্চ ৩য় স্প্যান, ১৩ মে চতুর্থ স্প্যান, ২৯ জুন ৫ম স্প্যান বসানো হয়।

পরের বছর ২০১৯ সালে ২৩ জানুয়ারি ৬ষ্ঠ স্প্যান, ২০ ফেব্রুয়ারি ৮ম স্প্যান, ২২ মার্চ ৯ম স্প্যান, ১০ এপ্রিল ১০ম স্প্যান, ১৩ এপ্রিল ১১তম স্প্যান, ৬ম ১২তম স্প্যান, ২৫ মে ১৩তম স্প্যান , ২৯ জুন ১৪তম স্প্যান, ২২ অক্টোবর ১৫তম স্প্যান, ১৯ নভেম্বর ১৬তম স্প্যান, ২০ নভেম্বর ১৭তম স্প্যান, ১১ ডিসেম্বর ১৮তম স্প্যান, ১৮ ডিসেম্বর ১৯তম স্প্যান, ৩১ ডিসেম্বর ২০তম স্প্যান বসানো হয়।

চলতি বছর ২০২০ সালে ১৪ জানুয়ারি ২১তম স্প্যান, ২৩ জানুয়ারি ২২তম স্প্যান, ২ ফেব্রুয়ারি ২৩তম স্প্যান, ১১ ফেব্রুয়ারি ২৪তম স্প্যান, একুশে ফেব্রুয়ারি ২৫তম স্প্যান, ১০ মার্চ ২৬তম স্প্যান, ২৮ মার্চ ২৭তম স্প্যান, ১১ এপ্রিল ২৮তম স্প্যান, ৪ মে ২৯তম স্প্যান, ৩০ মে ৩০তম স্প্যান, ১০ জুন ৩১তম স্প্যান।

করোনা ও বন্যা পরিস্থিতর কারনে চারমাস বিরতি দিয়ে ১১ অক্টোবর ৩২তম স্প্যান, ১৯ অক্টোবর ৩৩তম স্প্যান, ২৫ অক্টোবর ৩৪তম স্প্যান, ৩১ অক্টোবর ৩৫তম স্প্যান, ৬ নভেম্বর ৩৬তম স্প্যান, ১২ নভেম্বর ৩৭তম স্প্যান, ২১ নভেম্বর ৩৮তম স্প্যান, ২৭ নভেম্বর ৩৯তম স্প্যান ও সর্বশেষ ৪ ডিসেম্বর ৪০তম স্প্যান বসানো হয়।

রেলওয়ে ও রোডওয়ে কাজের অগ্রগতি: পদ্মা সেতুতে রেললাইন নির্মানের জন্য মূলসেতুর ৪১টি স্প্যানে ২ হাজার ৯৫৯ রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো হবে। অর্থাৎ একেকটি স্প্যানে স্লাব বসানো হবে ৭২টি করে।

৮টন ওজনের একেকটি স্ল্যাবের দৈর্ঘ্য ২ মিটার এবং প্রস্থ ৫.১৫ মিটার। বর্তমানে সেতুতে ৩টি অংশে ৩টি ভাগে রেলওয়ে স্লাব বসানোর কাজ করছে কয়েক শতাধিক শ্রমিক।

সেতু সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, এর মধ্যে ১ হাজার ৮৬০টি স্লাব বাসনো হয়ে গেছে। বাকি আছে ১হাজার ৯শ ৯৯টি স্লাব বসানোর কাজ।

সেগুলো বসাতেও দিন রাত কাজ করে চলেছে নির্মান শ্রমিকরা-প্রকৌশলীরা।

ভিত্তি প্রস্থর স্থাপণ থেকে কুড়ি বছর: ২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

তবে সেতু নির্মানে স্থান নির্ধারণ নিয়ে জটিলটায় পার হয় আরো সাত বছর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে মাওয়া-জাজিরায় সেতুর নির্মাণস্থান চূড়ান্ত করে।

২০০৯ সালে আবার শুরু হয় পদ্মা সেতু প্রকল্প। ২০১২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৯ হাজার কোটি টাকায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে সরে যায়।

তবে এতো বাঁধার পরও পদ দেখান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৩ সালে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন তিনি। পরের বছর ২০১৪ সালে শুরু হয় সেতু নির্মানের কাজ। দেখতে দেখতে কেটেছে আরো ৬ বছর। আর এখন সেতুর নির্মান কাজ এখন প্রায় শেষের দিকে।

মার্চে শেষ হয় পিয়ার নির্মানে কাজ: পদ্মা সেতুতে সেতুতে ৪২টি পিয়ারে ওপর বসানো হবে ৪১টি স্প্যান। মূলসেতুর ৬.১৫মিটার এলাকায় নদীতে এজন্য নির্মান করা হয় ৪২টি পিয়ার। চলতি বছরের ৩১ মার্চ সর্বশেষ সেতুর ৪২তম পিয়ারের ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়।

এ ঢালাইয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় সেতুর পিয়ার তৈরির কাজ। সেতুর ৪টি পিয়ার মোট ২৬৬টি পাইলিং এর উপর নিমিত। পাইলে ১লক্ষ ৬৪ হাজার মেট্রিকটন স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে।

উৎফুল্ল পদ্মা পারের মানুষ: যে পদ্মার সর্বগ্রাসী রূপ মূহর্তে গ্রাস করে নিতে ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি কিলোমিটারের পর কিলোমিটার ভূমি সে পদ্মার বুকে কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে তৈরি হচ্ছে পিয়ার, তার উপরে বসানা হচ্ছে স্টিলের স্প্যান।

এমন চিত্র অবলোকনে শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি পদ্মার দুই পারের মানুষ।

র্দীঘদিনে কর্মতৎপরতায় পুরো পদ্মা সেতু তাদের চোখের সামনে এখন দৃশ্যমানের পথে। এতে উৎফুল্ল পদ্মার দুই পারের মানুষ।

আবুল আলিম নামের এক জেলে বলেন, মানুষ চাইলে সব পারে, এই গাঙ্গে একবার ডুব দিলে বাইচা উঠুম কিনা তা গ্যারান্টি দিয়া কইতে পারুম না। আর এই গাঙ্গে ব্রীজ হইয়া গেলে, এখন ওপর দিয়া এখন গাড়ি ঘোড়া চলবো।

সবুর মিয়া নামের আরেক জেলে বলেন, আমরা অনেক আনন্দিত। অনেকদিন ধরে কাজ চলতাছে চোখের সামনে ব্রীজটা হইতে দেখলাম। প্রথম প্রথম বিশ্বাস হইতো না এ নদীতে সেতু হবে, সরকারকে ধন্যবাদ।

স্থানীয় ছাত্র সংগঠক রাসেল আহমেদ নীরব জানান, পদ্মা পাড়ের মানুষ হিসাবে আমরা আনন্দিত কিভাবে স্বপ্ন সত্য হয়, কিভাবে স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তরিত হয় হয়। একদিনের জন্যও পদ্মা সেতুর কাজ থেমে থাকেনি। মানুষ সহজেই একপার থেকে অন্যপারে যেতে পারবে। আমাদের পূর্বপুরুষরা হয়তো এদিনের কথা ভাবতেও পারেনি।

২০২১ সালে চলবে গাড়ি: নির্মানের শুরুতে ২০১৮সালের পদ্মা সেতুর নির্মান কাজ শেষ হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। তবে নানা জটিলতায় নির্মান কাজের সময়ের পরিসর বেড়েছে।

মূল কাঠামোর সম্পূর্ন হওয়ার পর বাকি থাকবে রেলসংযোগ ও রোডওয়ের কাজ সেগুলো সমান তালে চলছে এখন। নতুন পরিকল্পনা অনুসারে ২১ সালেই সেতু দিয়ে গাড়ি ও রেল চালাচল করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতুর একাধিক প্রকৌশলী। আর ২০৩০ সালের মধ্যে সেতু দিয়ে প্রতিদিন ৩০হাজার গাড়ি পারাপারের প্রস্তুতি রেখে কাজ চলছে।

উন্নয়নের ছোয়ায় বদলে যাচ্ছে পদ্মার দুইপার: পদ্মা সেতু ও সেতুকে কেন্দ্র করে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে যাতায়াত ব্যবস্থার হয়েছে সুগম। এতে পদ্মা সেতুর দুইপারের আশেপাশে এলাকার বদলে যাচ্ছে চিত্র।

এসব এলাকায় তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অবকাঠামো, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ নানা সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পন এতে কর্মসংস্থান হচ্ছে বহু মানুষের। ভবিষ্যতে ঢাকার অদূরে এসব স্থানে নতুন বানিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠতে পারে ধারনা অনেকের।

এদিকে মূল সেতু ছাড়াও প্রকল্পের অধীনে থাকা নদীশাসন ছাড়াও অন্যান্য কাজ এগিয়ে চলছে। পদ্মা সেতু নির্মান করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিঃ। সেতুটি নির্মিত হলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *