মানিকগঞ্জ : করোনার ধাক্কায় মূলধন খুইয়েছে অনেকেই ॥ জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছেন কেউ ॥ দিন কাটছে নিদারুণ কষ্টে

সারাবাংলা

সাইফুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ থেকে:
দেশের চলমান মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে চলমান মহামারি করোনার ধাক্কায় মূলধন খুইয়েছে অনেকেই। অনেকে আবার জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করেছেন। তাঁত শিল্পের সাথে জড়িতদের অনেকেরই দিন কাটছে নিদারুণ কষ্টে। এমন চিত্র দেখা গেছে জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের তাঁত পল্লী এলাকায়। তাঁত শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন জেলা তাঁতী কল্যাণ সমিতি।
জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের সাভার, আগসাভার, হামজা গ্রাম তাঁত শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে তাঁতের শাড়ি, ওড়না, লুঙ্গী, গামছা প্রভৃতি তৈরি করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকার শত শত পরিবার এ শিল্পের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এ শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে জীবিকা নির্বাহ করে হাজারো পরিবারের ।
করোনা মহামারির শুরু থেকে গত এক বছরে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত ছোট-বড় সকল প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যবস্থাপনায় জটিলতা এবং পণ্যের নিম্নমূখী বাজার সহ নানা কারণে ক্ষতির মুখে তাঁত শিল্প। করোনাকালীন সময়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাঁত শ্রমিকদের কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁত শ্রমিকদের আশানুরুপ বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। ফলে পৈত্রিক এই পেশায় টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িতদের।
জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকেরা। অন্যকোন পেশার প্রতি অভিজ্ঞতা না থাকায় ভালো কোন কাজের সুযোগ পাচ্ছে না তাঁত শ্রমিকরা। এতে করে নিদারুন কষ্টে দিন যাপন করছেন তারা।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, অনেকগুলো তাঁতের কারখানা ছিল গ্রামে। তবে বেশির ভাগ কারখানাই এখন বন্ধের পথে। আর কিছু কিছ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁত কারখানার একজন উদ্যোক্তা সালাম মিয়া বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও তাঁত ব্যবসা করতেন। এর আগে কোন তাঁত শিল্প এরকম বিপদের সম্মুখীন হয়নি। আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এই খারাপ অবস্থায় কেউ আমাদের কোনো সহায়তা করেনি। আমাদের এখান থেকে তৈরি পোশাকগুলোপ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হতো। আমরা নতুন করে যে ব্যবসা শুরু করবো সেই উপায়ও খুঁজে পাচ্ছিনা। দু’বেলা দুমুঠো খাবারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের এই বিপদ থেকে মুক্তি পেতে সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই।
আগসাভার এলাকার তাঁতী আরমান মিয়া বলেন, করোনা আইসা আমাগো কাম সাড়া, রোজগার বন্ধ। দিন কাটে খুব কষ্টে। একবার শুনলাম সরকার আমাগো সাহায্য করব, প্রণোদনা দিব। কো? কিছুই তো পাইলাম না। এদিকে ঘাড়ের ওপর ঋণের বোঝা, কিস্তিআলারা চাপ দেয়। কামাই না হইলে কেমনে টাকা পরিশোধ করুম।
মোহর আলী নামের আরেক তাঁতী বলেন, জন্মের পর থিকাই এই পেশায় আছি। আমরা অন্য কোন কাজ শিখি নাই যে করুম। করোনা আসার পর থিকাই ব্যবসায় লস খাইছি। এক বছর পার হইয়া গেল ব্যবসা চালানোর মত সামনে আর কোন পথও দেখতেছি না। অনেক তাঁতীই এখন অন্য কাজ করছে। একটা সংসার চলে আমার ওপর, এখন কি করুম কিছুই বুঝতাছি না।
মানিকগঞ্জ তাঁতী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা কোষাধক্ষ শরিফ উল্লাহ বলেন, তাঁত পেশার সাথে সম্পৃক্ত তাঁতীরা খুব কষ্ট নিয়ে আদি পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। করোনা কালীন এই মহামারি বিবেচনা করে জেলার তাঁতীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগীতা কিংবা স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারলে তাদের এই পেশায় টিকিয়ে রাখা যেত। এখনই তাঁতিদের উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে এই শিল্পকে জেলায় টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, সরকারিভাবে তাঁতীদের জন্য কোন প্রকার প্রণোদনা বা সহযোগিতা এখন পর্যন্ত আসেনি। তাঁত শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে যদি সরকারিভাবে ভবিষ্যতে কোন প্রকার প্রণোদনা আসে তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে। চলমান পরিস্থিতে কারো বাড়িতে খাবার না থাকলে ৩৩৩ নাম্বারে ফোন করলে আমরা জরুরীভিত্তিতে খাবার পৌছে দিচ্ছি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *