মানুষ টাকাটা রাখবে কোথায়?

মতামত

বাংলাদেশ কোনো কল্যাণ রাষ্ট্র নয়। এখানে মানুষের জানের নিরাপত্তা নেই, মালের নিরাপত্তা নেই। মানুষের বর্তমান-ভবিষ্যৎ কোনোটাই সুরক্ষিত নয়। সরকারি চাকরিজীবীদের তবু অবসরের পর পেনশন আছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের তেমন কিছুই নেই। কিছু কিছু ভালো প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকেই ৩০ বছর চাকরির পর খালি হাতে অবসরে যেতে হয়। সরকারি হোক আর বেসরকারি, অবসরে গেলেই একজন মানুষের জীবনমান লাফ দিয়ে নেমে যায়। সারাজীবন চাকরি করার পর অবসরে গিয়ে যখন সত্যি একটু অবসর উপভোগ করার কথা, তখন শুরু জীবনের নতুন সংগ্রাম। আয় বন্ধ হয়ে যায় বা কমে যায়; কিন্তু ব্যয় কমে না, বরং মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ব্যয় বেড়ে যায়।

সারাজীবন নিজের মেধা-শ্রম দেশ বা প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় করা মানুষটি তখন নতুন করে জীবনযুদ্ধে নামে। ৬০ বছর বয়সে গিয়ে মানুষের নতুন কিছু করার বা কোনো উদ্যোগ নেয়ার উদ্যম থাকে না। সবাই তখন জীবনমান কিছুটা নামিয়ে হলেও একটা নিশ্চিন্ত জীবন চান। পেনশন বা সারাজীবনের জমানো টাকা এমন কোথাও বিনিয়োগ করতে চান, যাতে তার রিটার্ন দিয়ে বেচেবর্তে থাকা যায়। বাংলাদেশে সরকারের নানা সঞ্চয়পত্র মানুষের বিনিয়োগে নিশ্চিত রিটার্ন দেয়। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের সুদ সরকারের ওপর দারুণ এক বোঝা হয়ে চেপে আছে। তাই গত কয়েকবছর ধরেই সরকার সঞ্চয়পত্রের ব্যাপারে নানাভাবে মানুষকে নিরুৎসাহিত করছে। সরাসরি মুখের ওপর না বলে দেয়া হয়নি এখনও, তবে নানাভাবে ঘুরিয়ে পেচিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, সঞ্চয়পত্র কেনার দরকার নেই। প্রথমে ই-টিন বাধ্যতামূলক করা হয়।

এছাড়া ব্যাংক বা ডাকঘরে সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে নানান আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ব্যাংকগুলোকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির কমিশন ৯ গুণ কমানো হয়েছে। আগে ১০০ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করলে ব্যাংকগুলো ৫০ পয়সা পেতো, এখন পাবে ৫ পয়সা। এরপর আর কোনো ব্যাংক সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে আগ্রহী হবে না। সঞ্চয়পত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছে সরকার গত সপ্তাহে সুদের হার কমিয়ে দিয়ে। চাকরি করলে বছর বছর মানুষের কমবেশি আয় বাড়ে; প্রমোশন হয়, ইনক্রিমেন্ট হয়। কিন্তু অবসরের পর বছর বছর ব্যয় বাড়লেও আয় বাড়ে না। আর এখন তো সরকার আয় কমানোর বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এখন কীভাবে চলবে?

তারা কীভাবে চলবে তা নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। সরকারের এখন পোয়াবারো। কমিশন কমিয়ে দেয়ায় ব্যাংক যেমন সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে চাইবে না, সুদ কমিয়ে দেয়ায় মানুষ কিনতেও চাইবে না। সরকার এখন মহা আনন্দে থাকবে। সঞ্চয়পত্রের সুদ দেয়ার চাপ কমে যাবে। এটা ঠিক সঞ্চয়পত্রের সুদ সরকারের ওপর একটা বাড়তি চাপ। কিন্তু রাষ্ট্র তো ব্যবসায়ী নয়। তার অত লাভ-ক্ষতির খতিয়ান মেনে চলা মানায় না। জনস্বার্থে সরকারকে অনেক খাতেই ভর্তুকি দিতে হয়।

রেল তো লস, বিমান লস; তাই বলে কি সরকার রেল বা বিমান বন্ধ করে দেবে? সঞ্চয়পত্র করাই হয়েছে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য; অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, নারী, বা প্রতিবন্ধীদের জন্য। কিন্তু উচ্চবিত্ত অনেক মানুষ, যাদের টাকা রাখার জায়গা নেই, তারাও অলস টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে সরকারের কাছ থেকে সুদ নেয়, যাতে সরকারের ওপর চাপ বেড়ে যায়। সরকারের দায়িত্ব কারা সঞ্চয়পত্র কিনছে সেটা মনিটর করা। উচ্চবিত্তের মানুষ যাতে সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারে তা নিশ্চিত করা। এটা কিন্তু খুব কঠিন নয়, সঞ্চয়পত্র কিনতে ই-টিন যেহেতু বাধ্যতামূলক, তাই আয়কর বিবরণী দেখেই তার জীবনমান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

তাছাড়া ব্যাংকগুলোও বেশিরভাগ সময় তাদের গ্রাহকদের আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে জানেন। ব্যাংকের হিসাব চেক করলেও সেটা জানা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটে উল্টা ঘটনা। একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ ব্যাংকে গেলে পাত্তাই পাবেন না, তাকে নানান হাইকোর্ট দেখিয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়। আর উচ্চবিত্তের কেউ সঞ্চয়পত্র কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ব্যাংকের লোভ প্রয়োজনে তার বাসায় চলে যাবে। তেলা মাথায় তেল দিতে আমাদের কোনো জুড়ি নেই। কদিন আগে দেখলাম ব্যাংকিং আওয়ার শেষ হওয়ার পরও এই প্রভাবশালী গ্রাহককে ব্যাংকের ভল্ট খুলে নগদ ১৯ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। যদিও তার একাউন্টে সে পরিমাণ অর্থ ছিলই না।

অথচ সরকার অর্থনৈতিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে; ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান-শেয়ারবাজারে লুটপাট বন্ধ করতে পারলে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার না কমিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবেন। পিকে হালদাররা হাজার কোটি টাকা মেরে পালিয়ে যাবে। আর অবসরে যাওয়া নিরীহ মানুষদের টাকা লুটে খাবে ডেসিটিনি আর ইভ্যালিরা।

আপনি বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করবেন। বেসরকারি বিনিয়োগে সুশাসন আনতে পারবেন না। শেয়ারবাজারকে যৌক্তিক বানাতে পারবেন না। তাহলে মানুষ যাবেটা কোথায়, টাকাটা রাখবে কোথায়?

লেখক : প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *