মিউচুয়াল সেক্সেও ধর্ষণ হতে পারে

মতামত

আমাদের সবারই প্রচলিত একটি ধারণা হচ্ছে মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা পারস্পরিক বুঝাপড়ার মাধ্যমে যদি দুজন ব্যক্তি শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হয় তাহলেই সেটা জায়েজ হয়ে যায়। আপাত অর্থে বিষয়টা তেমনি। দুজন সচেতন ব্যক্তি যদি নিজেদের বুঝাপড়ার ভিত্তিতে মিলিত হয় তাহলে সেখানে আপত্তি আসার কথাই না। কিন্তু সম্প্রতি কলাবাগানে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ছাত্রীটির ঘটনা আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শিখাচ্ছে। নারীঘটিত যেকোন ঘটনাতেই আমরা সবসময় আগেই খুঁজে বের করি নারীটির দায় কতটা যাকে বলে “ভিক্টিম ব্লেইমিং”।

কলাবাগানের ছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাতেও একই আলোচনায় আটকে গেলাম। হত্যার ঘটনাটিকে জায়েজ করতে একটি গ্রুপ লেগে গেলো এটা মিউচুয়াল সেক্স ছিল প্রচারণায়। অর্থাৎ, ছেলেটি ও মেয়েটি নিজেদের সিদ্ধান্তেই মিলিত হয়েছিল। ধরেই নিলাম যে তারা নিজেদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্কে জড়িত হয়েছিল। কিন্তু যে আলামত পাওয়া গেছে এবং মেয়েটির মৃত্যুর যে কারণ বের হয়েছে সেটি বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বুঝা যায় যে সেখানে আসলে পুরো বিষয়টা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর ছিল না। বরং একটি বর্বরোচিত ঘটনাকে ইঙ্গিত করে।

 “সেক্স” মানে কেবল শরীরকে ভোগ নয়, এটি এমন একটি মুহূর্ত যা আপনার জীবনের অনেক বিষয়কে পালটে দিতে পারে। শারীরিক সম্পর্কের মাঝে জড়িত আছে শিক্ষার শর্ত। এটিকে আগে বুঝতে হবে, শিখতে হবে। জানতে হবে উদার মন নিয়ে। দুজন ব্যক্তির মাঝে অনুভূতিহীন বা প্রেমহীন শারীরিক মিলনে নেই কোন সৌন্দর্যের ছোঁয়া, সেখানে আছে কেবল বর্বর আদিম প্রবণতার প্রকাশ। 

আমাদের সমাজে “সেক্স” বিষয়টি এখনও মিথ হিসাবেই আছে। দারুণ ফ্যান্টাসিতে ভুগতে থাকি আমরা অনেকেই। অপ্রাপ্ত বয়স্ক নয় কেবল, শিক্ষিত, সচেতন ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেও “সেক্স” নিয়ে রয়েছে মারাত্মক ফ্যান্টাসি। অনেকেই এমন আছে বিশেষ করে পুরুষের মধ্যে, কোন একজন আকর্ষণীয় নারীর ছবি দেখেই নিজের মধ্যে উত্তেজনা অনুভব করে। তার মানে তার কাছে সেক্স মানে কেবলি বাহ্যিক বিষয় যা শরীরকেন্দ্রিক।

আসলেই কী সেক্স কেবলি শরীর কেন্দ্রিক বিষয়? এখানে আবেগ, অনুভূতি বা দায়িত্ববোধের কোন বিষয় নেই? তাহলে মানুষ আর বিবেকবান প্রাণি কেন হলো? আদিমতার প্রভাব আমাদের মধ্যে থাকবেই কিন্তু যিনি সচেতন মানুষ তার কাছে সেক্স বিষয়টি আরও গভীর হওয়ার কথা। সেক্স একটি সায়েন্টিফিক বিষয় যাকে অস্বীকারের কোন উপায় নেই, তাই বলে বিষয়টিতে কোন প্রকার নান্দনিকতা থাকবে না সেটি তাহলে এই আধুনিক যুগেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে কি?

সেক্সকে এখনও পুরুষেরা তাদের ক্ষমতা মনে করে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন পুরুষ সেক্সের ক্ষেত্রে কেবল নিজের সুখ বা অনুভূতির কথাটি চিন্তা করে অথচ এখানে আরেকজন ব্যক্তির উপস্থিতিকে তারা অস্বীকার করতে চায়। আর এই বিষয়টিতেই আলোচনায় আসে সেক্সেও থাকতে হয় শ্রদ্ধাবোধ ও দায়বোধের বিষয়। আপনি চাইলেন আর যেমন তেমন উপায়ে নিজের চাহিদাকে চরিতার্থ করতে পারেন না।

আমি সেক্স বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু একজন সচেতন ও আধুনিক মননের মানুষ হিসাবে মনে করি এই বিষয়টিকে নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার সময় ও সুযোগ এসেছে। লুকিয়ে বা এড়িয়ে বরং দিনে দিনে সমস্যাকেই আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছি আমরা। ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। রিয়েলিটিকে মেনে নিয়ে শিক্ষিত হতে হবে আমাদেরকে। সেক্স এডুকেশনকে আমাদের পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দিয়ে গেল কলাবাগানের এই কিশোর কিশোরীর ঘটনা।

কেন আমি বলছি মিউচুয়াল সেক্সেও ধর্ষণ হতে পারে? ধরে নিন, একজন নারী ও পুরুষ স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কে জড়িত হলো। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে পুরুষটি হয়ে গেলো একনায়ক। তিনি তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে ইচ্ছামত কায়দায় নারীটির সাথে নানা কর্মে লিপ্ত হলো। দেখা গেলো ততক্ষণে নারীটি তার সমস্ত আবেগ হারিয়ে অনিচ্ছার পর্যায়ে চলে গেছে এবং আপত্তিও জানাতে শুরু করলো। তাহলে সেটি কি আর মিউচুয়াল থাকে? থাকে না।

বিষয়টি অতি সূক্ষ্ম কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে “সেক্স” বিষয়টাকে এভাবেই দেখতে চাই। ঠিক যেই মুহূর্তে নারী তার অসম্মতি জানাবে সেটা হোক ভাষায় বা শারীরিক ভঙ্গিতে ঠিক তখনই থেমে যেতে হবে আর না হয় সেটিকে আমরা ধর্ষণ হিসাবেই দেখতে চাই। আমি জানি আইন এটিকে সমর্থন করে না। আমি জানি সমাজে এমন কথা আগে কেউ শুনেনি। কিন্তু শুনাতে হবে। নারী পুরুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যে ট্যাবু প্রচলিত আছে সেটিকে আঘাত করতে হবে গোড়াতেই।

আপনি পুরুষ তাই বলে আপনি যখন তখন কেবল আপনার ইচ্ছা হয়েছে বলেই একজন নারীকে ফুসলিয়ে বা আবেগের খেলায় জড়িত করে বিছানায় নিয়ে যেতে পারেন না। আমাদের সমাজে নারীরা এমনিতেই দুর্বল এবং পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে নিজের আবেগ প্রকাশের বিষয়ে একদমই অশিক্ষিত। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা অনেক নারীরাই হয়তো অনেকদিক থেকে এগিয়েছি কিন্তু একজন পুরুষকে কেন্দ্র করে আবেগের জায়গাটিকে নিজের মত করে পরিচালনার ক্ষেত্রে এখনও রয়ে গেছি প্রিমেটিভ। আর এর সুযোগ নেয় ক্ষমতাশীল পুরুষেরা। কী সেই ক্ষমতা?

ঘরে ঘরে ছেলে মেয়েদেরকে সেক্স এডুকেশন দিতে হবে। এই চ্যাপ্টারটি জীবনের একটি অন্যতম প্রয়োজনীয় অধ্যায় কিন্তু তার মানে এই নয় যে এখানে কোন নিয়ম কানুন বা দায়বদ্ধতা থাকবে না। “সেক্স” মানে কেবল শরীরকে ভোগ নয়, এটি এমন একটি মুহূর্ত যা আপনার জীবনের অনেক বিষয়কে পালটে দিতে পারে। শারীরিক সম্পর্কের মাঝে জড়িত আছে শিক্ষার শর্ত। এটিকে আগে বুঝতে হবে, শিখতে হবে। জানতে হবে উদার মন নিয়ে। দুজন ব্যক্তির মাঝে অনুভূতিহীন বা প্রেমহীন শারীরিক মিলনে নেই কোন সৌন্দর্যের ছোঁয়া, সেখানে আছে কেবল বর্বর আদিম প্রবণতার প্রকাশ।

লেখক : লীনা পারভীন কলামিস্ট কলামিস্ট।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *