মোদির সত্যাগ্রহের দাবি এবং নেপথ্য কথা

মতামত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, ১৯৭১ সালে তিনি নিজে এবং আরও অনেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সত্যাগ্রহ করেছিলেন, যেজন্য তাকে গ্রেফতারও হতে হয়েছিল। ঢাকায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবনেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আমি এবং সহকর্মীরা ভারতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিলাম।’ মোদি জানান, তখন তার বয়স ২০-২২ হবে।

ভারতীয় মিডিয়া, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় মোদির এই দাবি নিয়ে তোলপাড় উঠেছে। নানা ব্যঙ্গ, মিম হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের মনেও প্রশ্ন উঠেছে ভারত তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন-সহযোগিতা করেছে, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থনের কারণে নরেন্দ্র মোদিকে জেলে যেতে হবে কেন? এর পেছনের উত্তর একটু জটিল। এখানে সত্য-অসত্য দুটোই মিশে আছে।

২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে অপারেশন সার্চলাইট দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের গণহত্যা শুরু করে আর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সংসদে এক রেজুলেশন পাস করান, যেখানে বলা হয় যে ‘পূর্ববাংলার জনগণের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশ করেছে’ (ভারত)।

মিসেস গান্ধী এর আগে ২৬ মার্চ, ১৯৭১ প্রধান বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন যেখানে তিনি ভারত সরকারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বিরোধী নেতাদের বলেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার যে পদক্ষেপ নেবে সেখানে ভারতীয় জনগণকে এক রাখতে হবে। কারণ পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক লড়াইকে সমর্থন করছে ভারত। দ্বিতীয়ত মাথায় রাখতে হবে, পাকিস্তান জাতিসংঘের সার্বভৌম সদস্য এবং ভারত কর্তৃক তাৎক্ষণিক ও প্রচণ্ড ত্বরাপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই ইস্যুতে ভারতের আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়া সম্ভব হবে না।

এসব তথ্য ভারত সরকারের অনুমোদিত ‘Official History of the 1971 War’ -এ উল্লেখ আছে। কেন বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি দেওয়া যায়নি সেটাসহ মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় রাজনীতি ও সরকারি কর্মকাণ্ডের পেছনের খবরের বিবরণ রয়েছে সে ইতিহাসে।

আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাকে বৈঠকে সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদের মধ্যে এই বৈঠকের মূল কাজটি করেছিলেন অশোক মিত্র (ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএম মন্ত্রী), অমর্ত্য সেন (তৎকালীন দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক), পিএন হাকসার (ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব) এবং বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ আনিসুর রেহমান এবং রেহমান সোবহান।

সেসব বিবেচনা করে ভারত সরকার বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে তখন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তবে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে তার সুরক্ষায় কাজ করার অনুমতি দেয়, মুক্তিবাহিনীসহ প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়, যারা অপারেশন সার্চলাইট শুরুর পরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, আধাসামরিক বাহিনী এবং অবশেষে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু করে বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীকে যুদ্ধে সহায়তা, ট্রেনিং, অস্ত্র সরবরাহ করে। অন্যদিকে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য এবং ভারতের হস্তক্ষেপের সমর্থনে বিশ্ব ভ্রমণ করেছিলেন। এ প্রয়াসের প্রথম উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য ছিল ভারত-ইউএসএসআর সুরক্ষা চুক্তি, যা যুদ্ধে এগিয়ে আসতে ভারতকে শক্তি জুগিয়েছে। এটি ছিল যুদ্ধে ভারতের সাফল্যের একটি বড় গ্যারান্টি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলটিকে প্রথম দিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল, কারণ তা কৌশলগত দিক থেকে পাকিস্তানের পক্ষে যায়। সিআইএ ভারতে তার ক্লায়েন্টদের (যার মধ্যে মিসেস গান্ধীর মন্ত্রিসভায় অতি ক্ষুদ্র একটি অংশও অন্তর্ভুক্ত ছিল) ব্যবহার করে ভারত-ইউএসএসআর চুক্তিটি বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং সোভিয়েত রাশিয়া ভারতকে বাংলাদেশকে ‘স্বীকৃতি’ দিতে দেবে না বলে প্রচারণা চালায়।

ভারত-ইউএসএসআর চুক্তিটি ছিল ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ এ প্রচারণাটি আজকের ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জনক ভারতীয় জনসংঘের রাজনৈতিক লাইনেও গৃহীত হয়েছিল। ২০১৯ সালে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং শীতল যুদ্ধ’ (‘Hindu Nationalism and the Cold War’) শিরোনামের একটি নিবন্ধে জনসংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির দুটি ডকুমেন্টকে উদ্ধৃত করে (‘Recognise Swadhin Bangladesh’ (July 2, 1971) and ‘Indo-Soviet Treaty, August 13, 1971) রাহুল সাগর এসব কথা লিখেন ।

শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখার পুরস্কার দিয়েছে। বাজপেয়ী অসুস্থ থাকায় ২০১৫ সালে ঢাকা সফরকালে মোদি তার পক্ষে পুরস্কারটি নিয়েছিলেন। তখনও মোদি তার বক্তব্যে বলেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে জনসংঘের সত্যাগ্রহে অংশ নিতে একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে দিল্লিতে গিয়েছিলেন। বাজপেয়ীর পুরস্কারের সাইটেশনে বলা হয়েছে, ‘জনসংঘ ১ আগস্ট থেকে ১১ আগস্ট সত্যাগ্রহ করেছিল এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবীরা একাত্তরের ১২ আগস্ট ভারতীয় সংসদ ভবনের সামনে একটি বিশাল সমাবেশ করেছিলেন।’ নরেন্দ্র মোদি ১৯৭৮ সালে তার এক বইতেও ‘বাংলাদেশ সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণের কারণে তিহার জেলখানার কারাবাস’ করেছেন বলেছেন।

ফলে সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদির কারাবাস এবং সত্যাগ্রহ নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ নেই। জনসংঘের সেই সত্যাগ্রহ এবং জনসভার উদ্দেশ্য নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে- সেটা এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ওই বয়সে মোদির মতো তরুণের পক্ষে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝারও কথা নয়, তার আবেগ কাজ করেছে মাত্র। তবে ভারতীয় ডকুমেন্ট বলছে, জনসংঘ যেমনটি চেয়েছিল, ডিসেম্বরের পরিবর্তে আগস্টের শেষ দিকে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে, ভারতের যুদ্ধ চালানোর দুর্বলতা ধরা পড়তো। পাকিস্তান পরাজিত হওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতো। সেই ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদিকে এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের না বিপক্ষের লোক হিসেবে বিবেচনা করা হবে- সেটাও মুলতবি থাক।

লেখক: আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট ।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *