মৌমিতার মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
রাজধানীর কলাবাগানে ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী তাজমিয়া মোস্তফা মৌমিতার মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। মৌমিতার মৃত্যুর পর থেকেই রহস্যজনকভাবে গা ঢাকা দিয়েছে বাড়ির মালিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যপক ড. কামালউদ্দীনের ছেলে ফাইজার ওরফে ফাইয়াজ। নিহতের পরিবার বলছে, বাড়ির মালিকের ছেলেসহ তার বন্ধুরা মিলেমিশে দীর্ঘদিন ধরেই উত্ত্যক্ত করতো। ঘটনার দিন মৌমিতাকে ডেকে নিয়ে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। তবে বাড়ির মালিক বলছেন, এ ঘটনায় তার ছেলে ফাইজার ওরফে ফাইয়াজ জড়িত নয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলেও এখনও তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, নিহতের পরিবারের আনীত অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ভবনের সিসিটিভির ফুটেজসহ আশপাশের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে তা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জানা গেছে, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কলাবাগান থানাধীন ধানমন্ডির ৮ নম্বর রোডের ২ নম্বর সাত তলা ভবনের ছাদে যায় ওই ভবনের ৪ তলার একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মালয়েশিয়ার প্যাসিফিক ইউনিভারসিটির ছাত্রী তাজমিয়া মোস্তফা মৌমিতা। ওইদিন সন্ধ্যার দিকে ভবনের পেছনের গলিতে রহস্যজনকভাবে তার দেহ পড়ে থাকতে দেখেন প্রতিবেশীরা। পরে তাকে উদ্ধার করে গ্রীণ রোডের গ্রীণ লাইফ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ওই হাসপাতাল থেকে সেদিন রাতে তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পাঠায়। পরদিন ২৭ ফেব্রুয়ারি মৌমিতার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। তিনি জানান, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলেও মৃত্যুর আগে ধর্ষিত বা বিষাক্ত কিছু খাওয়ানো হয়েছে কিনা তা জানতে রক্ত, ভিসেরা ও সোয়াবের নমুনা সংগ্রহ করে রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। ওইদিন ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হলে সেদিন বিকেলে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঘটনার পর থেকেই রহস্যজনকভাবে পলাতক রয়েছে ওই বাড়ির মালিকের ছেলে ফাইজার। এ ঘটনার ৩ দিন পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।


নিহতের ফুপা হুমায়ুন কবির ও মোসাব্বির হোসেন ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, তারা সপরিবারে মালয়েশিয়ায় থাকেন। সেখানেই পড়াশোনা করত মৌমিতা। করোনার কারণে দুই মাস আগে তারা বাংলাদেশে আসেন। ধানমন্ডির ৮ নম্বর রোডের ২ নম্বর সাত তলা বাড়ির ৪ তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মৌমিতা তার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছিলেন। আশা ছিল দ্রুতই মালয়েশিয়াতে ফিরে যাবেন। তবে এই সময়ের মধ্যে ভবনের মালিকের ছেলে ফাইজার ওরফে ফাইয়াজ ও তার বন্ধুরা মৌমিতাকে উত্ত্যক্ত করতো। এ নিয়ে তার পরিবারের কাছে অভিযোগও করা হয়েছে। তাকে বোঝানো হয়েছে। আর মৌমিতা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করবে সেরকম কোনো কারণ নেই। বাড়ির মালিকের ছেলে ও তার বন্ধুরা মৌমিতাকে ডেকে নিয়ে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেন নিহতের ফুপা হুমায়ুন কবিরসহ তার মা-বাবা। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের ছেলেসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন নিহতের পরিবার। ঘটনার তিনদিন পর গত সোমবার (১ মার্চ,২০২১) রাতে নিহত ওই ছাত্রীর বাবা মো. কামাল মোস্তফা খান শামীম বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
এদিকে ভবনের মালিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ তার ছেলে ও ছেলের বন্ধুদের বিরুদ্ধে মৌমিতাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে ফাইজার ওরফে ফাইয়াজ এ ঘটনায় জড়িত নয়। এটা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশি তদন্তেই বেরিয়ে আসবে মৌমিতার মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা। মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে আমরা মোটেই বিচলিত নই।
আজ মঙ্গলবার (২ মার্চ,২০২১) কলাবাগান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পরিতোষ চন্দ বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, এ ঘটনায় গত সোমবার (১ মার্চ,২০২১) রাতে নিহতের বাবা বাদী হয়ে বাড়ির মালিকের ছেলেসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন। ঘটনার পরদিনই মৌমিতার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে অভিযুক্ত ফাইজার ওরফে ফাইয়াজের বন্ধু আদনানকে আটক করা হয়েছে। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত ফাইয়াজ ওরফে ফাইজারকে ধরতে অভিযান চলছে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা ওই ভবনসহ আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছি। যেগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত তাকে ছাদ থেকে ফেলে বা হত্যা করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সব বিষয়কে মাথায় রেখেই গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঘটনায় জড়িত যে কাউকেই আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান কলাবাগান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পরিতোষ চন্দ।

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *