যত্রতত্র ইটভাটা

জাতীয় সারাবাংলা

আব্দুল হাফিজ, ময়মনসিংহ ব্যুরো : ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা ও উপজেলা শহরগুলো দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বহু গ্রাম ও দ্রুত শহরে পরিণত হয়েছে। ফলে আবাসন হিসেবে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে অসংখ্য দালান-কোঠা এসবের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে ইট। দালান-কোঠার জন্য ইটের চাহিদা বাড়ছে। আর এর যোগান দিচ্ছে ইটভাটাগুলো। কিন্তু ইটভাটার মালিকরা ইটের জোগান দিলেও সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছেন পরিবেশ ও জীব বৈচিত্রের। দেশের ইটভাটা স্থাপনের আইন আছে, সে আইন কেউ মানছে, আবার কেউ মানছে না। ফলে যত্রতত্র গড়ে তোলা হচ্ছে ইটভাটা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন থেকে অনেককে দেওয়া হচ্ছে লাইসেন্স ও ছাড়পত্র।
সিটি কর্পোরেশন পৌর এলাকার মধ্যে যেমন ইটভাটা আছে গ্রামীণ ঘনবসতি এলাকায়ও আছে ইটভাটা। অনেক জেলা-উপজেলা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের আশেপাশেও আছে ইটভাটা যা ইটভাটা আইনের লঙ্ঘন। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কঠোর হস্তক্ষেপ গ্রহনের দাবী করলেও এখনও জেলা-উপজেলা ও পৌর এলাকা রয়েছে অনুমোদনবিহীন অসংখ্য ইটভাটা। সেগুলো পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, ইটভাটা স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের প্রশ্ন হচ্ছে কবে হবে পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা। এদের কি আইনের আওতায় আনা হবে। দেশের ও পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে এর দায়ভার কে নেবে। কতকাল চলবে আইন ভঙ্গের এই মহোৎসব। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কি আইনী কোন ব্যবস্থা গ্রহন করবেন না।
খবর নিয়ে জানা গেছে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় সরকারী হিসাব অনুযায়ি ৪৮০টি ইটভাটা রয়েছে এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় ২৯৮টি ইটভাটা রয়েছে, ছাড়পত্র নেই ১২৯টির। বাস্তবে ইটভাটা রয়েছে ৩৫০টিরও বেশি। জামালপুর জেলা ৯৭টি ইটভাটার মধ্যে ছাড়পত্র আছে ৫০টির,নেত্রকোণা জেলার ৪৩টির মধ্যে ছাড়পত্র আছে ৩৪টির ও শেরপুর জেলায় ৪২টি ইটভাটার মধ্যে ছাড়পত্র আছে মাত্র ১২টির। সরকারি তালিকার বাইরেও অসংখ্য ইটভাটা রয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলাধিন পৌর এলাকার ২নং ওয়ার্ডে ঘনবসতি এলাকায় দুইটি ইটভাটা রয়েছে। ওই এলাকাতেই মেসার্স এইচ.এ.এম ব্রিকসসহ পাশাপাশি আরো দুইটি বড় ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার চতুরদিক ঘনবসতি এলাকার পাশেই রয়েছে স্কুল,মাদ্রাসা ও বাজার, আবাদি ও ফসলী জমিতে ইটভাটা করা হয়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি ইট উৎপাদন করা হচ্ছে। খবর নিয়ে জানা গেছে এইচ.এ.এম ইটভাটাসহ পাশ্ববর্তী ইটভাটা গুলোর পরিবেশ গত কোন ছাড়পত্র নেই। এমনকি লাইসেন্সও নেই। জনস্বাস্থ্যের হুমকি এই ইটভাটা গুলো প্রকাশ্যে আইন ভঙ্গ করছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন)(সংশোধন) আইন ২০১৯ এ উল্লেখ রয়েছে আবাসিক, বানিজ্যিক এলাকা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর সরকারী বা ব্যক্তি মালিকানাধিন বন, অভয়ারন্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষি জমি, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ও ডিগ্রেডেড এয়ার শেড স্থানে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ।
এ ছাড়াও আইনে উল্লেখ রয়েছে নিষিদ্ধ এলাকার সীমারেখা হতে ন্যূনতম ১ কিলোমিটার দূরত্বে,সরকারী বনাঞ্চলের সীমারেখা হতে ২ কিলোমিটার দূরত্বে,কোন পাহাড় বা টিলার উপরিভাগে বা ঢালে বা তৎসংলগ্ন সমতলে কোন ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে পাহাড় বা টিলারের পাদদেশ হতে কমপক্ষে আধা কিলোমিটার দূরত্বে, বিশেষ কোন স্থাপনা,রেলপথ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-হাসপাতাল ও ক্লিনিক-গবেষনা প্রতিষ্ঠান বা অনুরুপ কোন স্থান বা প্রতিষ্ঠান হতে কমপক্ষে ১কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করো যাবে না।
যেসব ইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আইন ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে দন্ডের বিধান রয়েছে। আইন ভঙ্গকারীদের অনধিক দুই বছর কারাদন্ড বা ২০ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। উল্লেখিত মেসার্স এইচ.এ.এম ব্রিকসের মালিকসহ ফুলবাড়িয়ার ২নং ওয়ার্ডে অবস্থিত প্রত্যেকটি ইটভাটা আইন ভঙ্গ করছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনরুপ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে না।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চিত্র আরো ভয়াবহ। সিটি কর্পোরেশন এলাকাতেই ২০টির অধিক অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। জানা যায়, ইটভাটা প্রস্তুত করতে গেলে আইনের বিধান অনুযায়ি অবস্থানগত ছাড়পত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স নিতে হয়। অনেক ইটভাটার মালিকের কোন লাইসেন্স নেই এমন কি কোন আবেদন পর্যন্ত করেনি।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা আশরাফুল সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করে পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এইচ.এ.এম ব্রিকসসহ অন্যান্য ইটভাটা সম্পর্কে তার দৃষ্টি আকর্ষন করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফুলবাড়িয়া উপজেলায় অনেক ইটভাটা রয়েছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
ময়মনসিংহ বিভাগ পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক ফরিদ আহমদ (উপ-সচিব) এর কার্যালয়ে গিয়ে ইটভাটা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০২৫ সালের পর ইটভাটা থাকবে না। অটো ব্রিকস নামে অটোমেটিক টানেলিভ ইটভাটা হবে। তখন পরিবেশ দূষনও থাকবে না। নতুন করে ইটভাটার কোন ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না।অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেসার্স এইচ.এ.এম ব্রিকস নামক ইটভাটার মালিক রেজাউল করিম আব্দুল আওয়াল এর সাথে যোগাযোগ করে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইটভাটায় গিয়ে ম্যানেজার এনামুলের সাথে কথা বললে তিনি ইটভাটার কাগজপত্র দেখান, কিন্তু তিনি উক্ত ইটভাটার কোন ছাড়পত্র বা লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। ম্যানেজার বলেন, এ বছর ১৫/১৬ লাখ ইট উৎপাদন হয়েছে। আমি শুধু টাকা নেই এবং ইট বিক্রী করি। অন্য কিছু জানি না । উল্লেখ্য ইটভাটা গুলো সরকারী ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে দূর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভুক্তভোগীরা অনুরোধ করেছেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *