যত্রতত্র পড়ে আছে সুরক্ষা সামগ্রী, শিষ্টাচারকে দূষছেন নগরবাসী

জাতীয়

ডেস্ক রিপোর্ট: মহামারী করোনা থেকে বাচঁতে এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর গত বছরের ৩০ মে থেকে ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে প্রথম দিকে এর ব্যবহার কম হলেও পুরোপুরি তা নিশ্চিত করতে প্রচারণার পাশাপাশি অনেক ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এর ব্যবহার আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। কিন্তু এই মাস্কের ব্যবহার বেড়ে গেলেও ব্যবহৃত মাস্ক যেখানে সেখানে ফেলায় সেগুলো জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এমনকি জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়া শুরু করে। এমনকি বর্তমানে এর অবস্থা এমন যে তা স্বাস্থঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

সরজমিনে দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তা-ঘাট, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, শপিং মল, হাসপাতাল এমনকি বাসাবাড়ির ভিতরে-বাইরে মানুষের ব্যবহার করা এসব মাস্ক যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়েছে। এক শ্রেণির অসচেতন মানুষ ব্যবহারের পর যেখানে খুশি সেখানেই ফেলছেন মাস্ক। নগরীর প্রতিটি গলি, সড়ক, ড্রেন, ফুটপাত সবখানেই ব্যবহৃত মাস্কের ছড়াছড়ি। যত্রতত্র এভাবে ফেলে দেওয়া মাস্কের সাথে কোথাও কোথাও মিলছে হ্যান্ড গ্লাভস, হেড কভার, সু কভার, গগলস, ফেইস শিল্ড বা গাউনসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাবকে দূষছেন নগরবাসী।

রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যত্রতত্র মাস্ক পড়ে আছে উল্লেখ করে তমালিকা নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের মাঝে কি ওই শিষ্টাচার গড়ে উঠেছে যে, নির্দিষ্ট স্থানের ময়লা নির্দিষ্ট স্থানেই ফেলা উচিত। শাস্তি হয়েছে কারো, এই কথা তো কখনো শুনিনি। এটা এখানে স্বাভাবিক ব্যাপার।

আইনুল নামে এক রিকশাওয়ালা বলেন, চারদিকে মাটিতে মাস্ক আর মাস্ক, গতকাইল মুই ঘরে যাইয়া দেহি ছোড পোলাডা কই থাইকা মাকছ আইনা খেলাইতেছে। এই দেইখ্যা মুই হ্যেরে মাইড়ছু। এর ভিত্তরে হাঁচি-কাঁশির অভাব আছে? আইজ মুই নিজে রাস্তায় এট্ট্য মাকছ দেইখ্যা অবাক।যারা পরে হেরাই ফেলে কেউ কিচ্ছু কয় না।খালি খালি পোলাডারে মারনু হের কি দোছ। ছোড্ড পোলা পাইছে নিছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবহৃত মাস্ক পরিবেশের জন্য ক্ষতির পাশাপাশি অন্য মানুষের জন্য করোনা বা করোনার নতুন ধরণ যাকে বলে ব্লাক ফ্যাংগাস সংক্রমণের কারণ হতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা শুরুর প্রথম দিকে সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে গৃহস্থালির আবর্জনার পাশাপাশি কোভিড বর্জ্য আলাদা করে ফেলানোর জন্য পলিথিন ব্যাগ সরবরাহ করা হলেও পরবর্তীতে তা আর করা হয়নি। হাসপাতালের কোভিড বর্জ্যগুলো অন্যান্য বর্জ্যের সাথে আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হয় কিন্তু বাসাবাড়ির বর্জ্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ তারা নিতে পারেন নি।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশন নাগরিকদের অসচেতনতাকে দায়ী করছে। সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যক্তি উদ্যোগ নিজেরাই নিজেদের কোভিড বর্জ্য এবং বাসা বাড়ির বর্জ্য আলাদা করতে পারতো কিন্তু তারা তা না করে একত্রে মিশিয়ে ফেলছে ফলে এগুলো একত্রে সংগ্রহ করে আবার আলাদা করাটা একটা জটিল বিষয়। এই বিষয়টি বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোভিড বর্জ্য পুড়িয়ে না ফেলে সাধারণ বর্জ্যের সাথেই আমিনবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ডাম্প করা হচ্ছে। কোভিড বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা না হওয়ায়, সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ড্রেন-নালায় এই সব বর্জ্য জমে রাস্তায় বা বাড়ির পাশে জলাবদ্ধতারও সৃষ্টি করছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর এম সাইদুর রহমান বার্তা ২৪.কম কে বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকেই এগুলো কালেকশন করার চেষ্টা করছি। মেডিকেল বর্জ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন প্রিজমের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চলছে। কোভিড-১৯ সুরক্ষায় ব্যবহৃত জিনিসগুলো আমরা আলাদা করে প্রিজমকে দিয়ে দিচ্ছি। কোনো কোনো এলাকায় এ ধরনের আবর্জনা থাকতে পারে। সেগুলো অপসারণে আমরা কাজ করছি।’

আর কেন আগের মত পলিথিন সরবরাহ করা হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা শহরে প্রায় ৩০ লাখ লোকের বাস, সবাইকে তো আর প্রতিদিন এভাবে পলিথিন সরবরাহ করা সম্ভব নয়। আমরা প্রথম দিকে মানুষকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছিলাম।

এম সাইদুর রহমান আরো বলেন, ‘যেখানে-সেখানে মাস্ক কিংবা গ্লাভস না ফেলতে আমরা মাইকিং করছি, মসজিদে ইমামদের মাধ্যমে বলছি। নাগরিকদের বলছি, যেখানে-সেখানে এগুলো না ফেলে এক জায়গায় রাখেন কিংবা আলাদা রাখেন। আমরা সেগুলো ডিসপোজ করার ব্যবস্থা করছি।’

অন্য দিকে বে-সরকারি সংগঠন প্রিজম জানায়, তারা সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে গৃহস্থালির বর্জ্যের সাথে কোভিড বর্জ্য সংগ্রহ করে মাতুয়াইল নামক স্থানে আধুনিক যন্ত্রের সাহায্য সেগুলো ডিস্পোজাল করছেন।

ব্র্যাক জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচি পরিচালিত ‘করোনা মহামারিকালে কার্যকর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক গবেষণায় জানা যায়, সারাদেশে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৪৮ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ৩৫ টন (১৪.১ শতাংশ) সঠিক নিয়মে ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। এর অধিকাংশই আবার রাজধানী ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসা বর্জ্যের মাত্র ৬.৬ ভাগের সঠিক ব্যবস্থাপনা হয়। বাকি ৯৩.৪ ভাগ বর্জ্যই সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় নেই। তাও আবার মাত্র একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপসারণ ও শোধন করা হয়। বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থাপনা থাকলেও, তা বিনষ্ট বা শোধন করার নিজস্ব কোনো ব্যবস্থাপনা নেই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর।

আবার, কোন প্রকার সুরক্ষা ছাড়াই এগুলো সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং বা ধ্বংসের  কাজ করেছেন হাজারো পরিচ্ছন্নতা কর্মী। যাদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *