রংপুরে ডায়েরীর পাতায় রুখিয়া হত্যার নেপথ্য কাহিনী

সারাবাংলা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রুখিয়া রাউতকে বাসা থেকে ডেকে কথিত প্রেমিক আনিসুল ও তার সহযোগীরা হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোখলেছুর রহমান জানান, প্রেমের সূত্র ধরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মূল আসামি আনিসুল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া রুখিয়া রাউত নিহত হওয়ার আগে ডায়েরির পাতায় পাতায় লিখে গেছেন প্রেমিকের নানা প্রতারণাসহ হত্যার হুমকির কথা।

নিহত রুখিয়া রাউতের বাড়ি রংপুরের বদরগজ্ঞ উপজেলার খোর্দ্দবাগপাড় মিশন পাড়ায়। ওই এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনগ্রসর মানুষদের মধ্যে তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন।

পুলিশ জানায় ৫ অক্টোবর রুখিয়া রাউত বাড়িতে তার বাবা দীনেশ রাউতকে রংপুরে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। রাতে বাসায় না ফেরায় স্বজনরা তার খোঁজাখুজি করেও হদিস পায়নি। পরদিন দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুরিয়ার রাস্তার ধারে শালবাগান থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ

এ ঘটনায় দিনাজপুরের পার্বতীপুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ হত্যকাণ্ডে জড়িত থাকায় তিন জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলো– খোর্দবাগবাড়ের আব্দুল গফুরের ছেলে ও কথিত প্রেমিক আনিসুল (২৬), বাচ্চু মিয়ার ছেলে রাজ (২৫) এবং পার্বতীপুর উপজেলার দুর্গাপুর এলাকার নয়াপাড়ার জয়নাল আবেদীনের ছেলে আশিকুজ্জামান (৪০)।

পুলিশ জানায়, ডায়েরির এক জায়গায় রুখিয়া রাউত লিখেছেন, ‘২০১৭ সালের জুলাই মাসের ১১ তারিখের কিছুদিন আগে থেকে একই গ্রামের আব্দুল গফুরের ছেলে আনিসুল আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করে। একপর্যায়ে ও আমার সঙ্গে সম্পর্ক করতে চায়। তখন আমি তাকে বলি যে, আমি ভালোবাসা নিয়ে কারও সঙ্গে অভিনয় করতে পারবো না। যাকে ভালোবাসব তাকে সত্যিকারভাবেই ভালোবাসব। কিন্তু তোকে আমার পক্ষে ভালোবাসা সম্ভব নয়। তখন আনিসুল বলে, কেন সম্ভব নয়। আমি তো তোকে ভালোবাসি। আমি ওকে বললাম, তোমরা আলাদা জাতি আর আমরা আলাদা জাতি, এটা সম্ভব নয়। তখন আনিসুল আমার সঙ্গে জোর করে রিলেশন করতে চায়। ও বলে জাতি দিয়ে কিছু হবে না আমি তোমার সাথে রিলেশন করব। অনেকদিন আমার সঙ্গে ও ফোনে কথা বলে। কার কাছ থেকে ও আমার মোবাইল নম্বর পেয়েছে জানতে চাইলে ও কিছু জানায় না। ও বলে তোমার নম্বরটা আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। এভাবে অনেকদিন কথা বলার এক পর্যায়ে ও আমার সঙ্গে অবৈধভাবে মেলামেশা করতে চায়। আমি বুঝতে পারিনি ও ভালোবাসার নাম করে আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করে দেবে।’

ডায়েরিতে আরও লেখা আছে, ‘আনিসুল ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে রাতে বাড়ির পাশের লিচু বাগানে জোর করে আমাকে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। তারপর জোর করে আমার সঙ্গে শারীরিকভাবে মেলামেশা করে। আনিসুল যেই সিঁদুর আমাকে পরিয়ে দিয়েছিল সেই সিঁদুরটা এখনও আমার ব্যাগে আছে। আমার সঙ্গে মেলামেশা হয়ে যাওয়ার পর ও অন্য মেয়ের সঙ্গে কথা বলা শুরু করে। ওই মাসের ১৫ তারিখে ও সম্পর্ক শেষ করে দিতে চায়। কিছুদিন পর আবারও সে আমাকে ফোন দেয়। কথা বলে আবার জোর করে মেলামেশা করে। আমার জীবনটা নষ্ট করে ও আরেকজনকে বিয়ে করেছে আমার সম্মতি না নিয়ে।’

ডায়েরির আরেক জায়গায় রুখিয়া রাউত লিখেছেন, ‘অনেক আশা ছিল পড়াশোনা করে একটা ভালো চাকরি করে বাবা-মা, ভাই-বোনের জন্য ভাল কিছু করব। কিন্তু ও আমাকে তা করতে দিল না। আমাকে শেষ করে ফেলল আনিসুল।’

রুখিয়া রাউতের শেষ লেখা, ‘আত্মহত্যা করতে গিয়ে কোনোভাবে বেঁচে গেলাম। কিন্তু আনিসুল আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সে আমাকে ৫ অক্টোবর দেখা করতে বলেছে। আমাকে হয়তো হত্যা করতে পারে। তবে আমার সবকিছুর জন্য আনিসুল দায়ী।’

নিহত রুখিয়া রাউতের বাবা দীনেশ রাউত বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি রুখিয়ার প্রবল আগ্রহ থাকায় অনেক কষ্ট করে ওকে এতদূর এনেছি। কিন্তু সবকিছু নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।’ মা সুমতি রাউত বলেন, ‘রুখিয়া ছিল চাপা স্বভাবের। ওর যে এত বড় ঘটনা ঘটেছে সে কখনও তা কাউকে বুঝতে দেয়নি।’

স্থানীয় বৃদ্ধ রাজদেব রাউত বলেন, ‘রুখিয়া ছিল এখানকার আদিবাসীদের গর্ব। কারণ ওর মতো মেধাবী কেউ ছিল না। এমনকি শিক্ষায় অতদূর পর্যন্ত এখনও কেউ যেতে পারেনি।’

এলাকা ঘুরে জানা গেছে. আনিসুল পেশায় একজন সবজি ব্যবসায়ী। মাস দেড়েক আগে সে বিয়ে করেছে।

এলাকাবাসীর ধারণা, আনিসুল অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করার পর থেকে তাদের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পথের কাঁটা চিরদিনের জন্য সরিয়ে দেওয়ার জন্যই আনিসুল রখিয়া রাউতকে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *