রাজনীতিতে সত্য বচন

মতামত

রাজনীতিকরা সদা সত্য কথা বলেন এমনটা বলা কঠিন। আসলে সত্য উন্মোচন আদৌ সম্ভব কি না, তা এক কঠিন প্রশ্ন। কারণ, সত্য বহুমাত্রিক। কিন্তু কখনও কখনও কিছু কথা কে বলছেন, কোন কারণে বলছেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলছেন এবং কি প্রকার সত্য উন্মোচন করছেন সেটা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

নোয়াখালী জেলার আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল কাদের মির্জা নির্বাচন, রাজনীতি, আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতাদের সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। সবচেয়ে বেশি চলছে টেলিভিশন টকশো-তে আর ক্ষমতাসীন দলের ভেতর। তিনি শাসক দলেন নেতা, একটি পৌরসভার মেয়র এবং দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আপন ছোট ভাই।

 প্রধানমন্ত্রী নিজে সততার সাথে কাজ করছেন, মানুষের সমৃদ্ধির প্রচেষ্টা নিচ্ছেন। তিনি বারবার বলছেন, এমন রাজনীতি তিনি চান যেন গরীব মানুষ উত্তরণের পথ পায়, তাদের জীবনে কিছু পরিবর্তন আসে। তাহলে দলের ভেতর কারা সেই রাজনীতিক যারা সেই প্রক্রিয়াকে নষ্ট করছে? আবদল কাদের মির্জার কথাকে সূত্র ধরে দল চাইলে অনুসন্ধান করতে পারে। 

শুধু নিজ জেলা নয়, কথা বলেছেন বৃহত্তর নোয়াখালী নিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু চামচা নেতা আছেন, যারা বলেন অমুক নেতা, তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য। এটাই হলো সত্য কথা। সত্য কথা বলতে হবে। আমি সাহস করে সত্য কথা বলছি।’

আরও বলছেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেন, তাঁরা হচ্ছেন নেতা। টেন্ডারবাজি করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট যাঁরা করেন, তাঁরা হচ্ছেন নেতা। পুলিশের, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি দিয়ে যাঁরা পাঁচ লাখ টাকা নেন, তাঁরা হচ্ছেন নেতা। গরিব পিয়নের চাকরি দিয়ে তিন লাখ টাকা যাঁরা নেন, তাঁরা হচ্ছেন নেতা।’

কাদের মির্জা বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে্, দলের নেতাদের নয়। বড় কোন প্রতিক্রিয়া কেউ দেন নি দল থেকে। ওবায়দুল কাদের ভাইয়ের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘দলীয় সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া কেউ দলে অপরিহার্য নয়।

কোন বিশেষ ক্ষেত্রে কাউকে কোন ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে যে কোন সিদ্ধান্ত দলীয় সভাপতি নিতে পারবেন’।

বোঝাই যাচ্ছে, দলের সাধারণ সম্পাদকের জন্য এসব কথা বিব্রতকর। দলের অনেকেই বলাবলি করছেন, এসব কথা প্রকাশ্য জনসভায় না বলে পার্টি ফোরামে বলা উচিত ছিল আবদুল কাদের মির্জার। এখন আনেক কথাই হবে। তবে মির্জা সাহেব তাঁর দৃঢ়তা দেখিয়ে দিয়েছেন, তিনি হয়তো পরিণতি নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। তার আগ্রহ কেবল সত্যে।

রাজনীতির সত্য বচন নিয়ে অনেক কথাই প্রচলিত আছে। আবদুল কাদের মির্জা এসব কথা উচ্চারণের সাহস পেয়েছেন হয়তো এ কারণে যে, তার আপন বড় ভাই ক্ষমতাধর। আবার এমনটাও হতে পারে যে, তিনি এমনটাই বলে থাকেন। কতটা ক্ষুব্ধ হলে বা নিজের ওপর আস্থা থাকলে তিনি পত্রিকায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলতে পারেন, এই বক্তব্য দেওয়ার পর নানা মহল থেকে তাঁর ওপর চাপ এসেছে। তবে তিনি চান নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। তাতে যদি তিনি একটি ভোটও না পান, কিছু মনে করবেন না। কিন্তু জোরজবরদস্তি করে জিততে চান না তিনি।

দলের ভেতর কেন্দ্র বা প্রান্ত সব স্তরের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হয়। সেটি যদি উপেক্ষিত হয়, তা হলে প্রাথমিক শর্তেই দলের ভেতরকার গণতন্ত্র বিধ্বস্ত হয়। রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রকে সফল করার যে দায়বদ্ধতা রাজনীতির থাকে, দলের ভেতর সবার আগে সেই দায়বদ্ধতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।

রাজনীতি একটা আলাদা শিক্ষা দাবি করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, যথার্থ রাজনৈতিক শিক্ষা। সেই শিক্ষা থেকে প্রতিনিয়ত যাচাই করতে হয় কোথায় ভুল হচ্ছে, কোথায় দলের নাম ভাঙ্গিয়ে কে সন্ত্রাস ও সহিংসতা করছে, মানুষের ওপর জুলুম করছে, দুর্নীতি করছে। রাজনীতি নিজেই একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

রাজনীতি করতে হলে একটা শিক্ষার প্রয়োজন, যে শিক্ষা আমাদের স্কুল-কলেজের পাঠক্রম দেয় না। নানা কাজের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই শিক্ষা অর্জিত হয়। রাজনীতির লোকরাও ভুল করেন, অন্যায় করেন। কিন্তু সেই ভুল বা অন্যায়ের প্রতিকার করতে হয় দলের ভেতরকার প্রাতিষ্ঠানিকতায়।

আবদুল কাদের মির্জার কথায় এই দলের জন্য যাঁরা আজীবন ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের চেয়ে অনুপ্রবেশকারীরা অনেক ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছেন। ক্ষমতার রাজনীতিতে এমনটা হয় যে, অরাজনৈতিক গোষ্ঠীর কেউ কেউ প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করে দলকে কব্জা করে নিয়ে নিজেরাই দলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। অনেকে এমন সব কাণ্ড করছেন যে দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এসব অভিযোগের সবই যে নতুন তা নয়। আমাদের রাজনীতির অন্তহীন দুর্নীতি আর ক্রমবর্ধমান অন্যায়প্রবণতার সঙ্গেই আমাদের পরিচিতি। এ দেশের রাজনীতিতে অজ্ঞাত অর্থ ঢুকছে, প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে তাতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কাঠামোটির বড় রকমের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে, সন্দেহ নেই।

প্রধানমন্ত্রী নিজে সততার সাথে কাজ করছেন, মানুষের সমৃদ্ধির প্রচেষ্টা নিচ্ছেন। তিনি বারবার বলছেন, এমন রাজনীতি তিনি চান যেন গরীব মানুষ উত্তরণের পথ পায়, তাদের জীবনে কিছু পরিবর্তন আসে। তাহলে দলের ভেতর কারা সেই রাজনীতিক যারা সেই প্রক্রিয়াকে নষ্ট করছে? আবদল কাদের মির্জার কথাকে সূত্র ধরে দল চাইলে অনুসন্ধান করতে পারে।

লেখক: সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, প্রধান সম্পাদক, জিটিভি

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *