রেকর্ড বৃষ্টিপাতে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল

সারাবাংলা

খন্দকার আনিসুর রহমান, সাতক্ষীরা থেকে:
সাতক্ষীরায় দুদিনের ভারি বর্ষণে ভেসে গেছে রোপা আমন, বীজতলা, পুকুর ও মাছের ঘের। জলে একাকার সাত উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়ন আর দুটি পৌরসভার নিম্নাঞ্চল। মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার দিনভরসহ তিনদিনের বৃষ্টিতে ভেসে গেছে ২০ হাজারের মত ঘের। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চিংড়ি চাষি। ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে ১৬ কোটি টাকার ক্ষতি হওয়ার পরে অতিবৃষ্টিতে শুধুমাত্র মাছের ক্ষতি হয়েছে ৫৩ কোটি টাকার। তথ্যানুসন্ধ্যানে জানা যায়, সাতক্ষীরা পৌরসভার অধিকাংশ নিচু এলাকা এখনও জলের নিচে। জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছেন সাতক্ষীরাবাসী। সাতক্ষীরা পৌরসভার ইটাগাছা এলাকার বাসিন্দা আলীনুর খান বাবুল বলেন, সামান্য বৃষ্টিতে আমাদের এলাকা তলিয়ে যায়। আর বৃহস্পতিবারের যে ব্যাপক বর্ষা, তাতে চারিদিকে জল থৈ থৈ করছে। চারিদিকে আটকানো। জল বের হওয়ার সুযোগ নেই। সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির নেতা আনিসুর রহিম বলেন, পৌরসভায় জল নিষ্কাশনের যথাযথ নর্দমা ব্যবস্থা না থাকার কারণে মানুষ বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছে। গত দুই দিনের টানা বর্ষণে তলিয়ে গেছে পৌরসভার ইটাগাছা, কামাননগর, রসুলপুর, মেহেদিবাগ, মধুমোল্লারডাঙ্গী, বকচরা, সরদারপাড়া, পলাশপোল, পুরাতন সাতক্ষীরা, রাজারবাগান, বদ্দিপুর কলোনি, ঘুড্ডিরডাঙি ও কাটিয়া মাঠপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। এদিকে, সদর উপজেলার ধুলিহর, ফিংড়ি, ব্রহ্মরাজপুর, লাবসা, বল্লী, ঝাউডাঙা ইউনিয়নের বিলগুলোতে সদ্য রোপা আমন ও বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পানি অপসারনের কোন পথ না থাকায় বৃষ্টির পানি বাড়িঘরে উঠতে শুরু করেছে। সাতক্ষীরা শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রাণসায়ের খালও তেমন পানি টানতে পারছে না। এদিকে অতিবৃষ্টির ফলে গদাইবিল, ছাগলার বিল, শ্যাল্যের বিল, বিনেরপোতার বিল, রাজনগরের বিল, কচুয়ার বিল, চেলারবিল, পালিচাঁদ বিল, বুড়ামারা বিল, হাজিখালি বিল, আমোদখালি বিল, বল্লীর বিল, মাছখোলার বিলসহ কমপক্ষে ২০টি বিল ডুবে গেছে। এসব বিলের মাছের ঘের ভেসে জলে একাকার হয়ে গেছে। বেতনা নদী তীরবর্তী এই বিলগুলির পানি নদীতে নিষ্কাষিত হতে পারছে না। এই পানি পৌরসভার ভিতরে ঢুকছে। অতিবৃষ্টিতে গ্রামাঞ্চলের সব পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে। বেরিয়ে গেছে শত কোটি টাকার মাছ। সবজি ক্ষেতগুলি ভাসছে পানিতে। মানুষের যাতায়াতও ভোগান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে, বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর, কালিগঞ্জ ও আশাশুনিসহ জেলার সাতটি উপজেলা। সেখানে প্রধান রাস্তার ওপর দিয়েও পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এসব এলাকার মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর, আনুলিয়া, খাজরা, বড়দল, শ্রীউলা, আশাশুনি সদরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল জলে থৈ থৈ করছে। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, কাশিমাড়ি, কৈখালী, রমজাননগরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের মাছের ঘের ও পুকুর পানিতে ভেসে একাকার হয়ে গেছে। বসতবাড়িতে উঠেছে পানি। পানি নিষ্কাশনের খালগুলো দখল করার কারণে এ দুর্দশার কবলে পড়েছেন এলাকাবাসি। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন প্লাবিত এলাকার মানুষ। তালা উপজেলার ইসলামকাটি, মাগুরা, কুমিরা, খেশরা, তেঁতুলিয়া, ধানদিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মাছের ঘের। কালীগঞ্জের রতনপুর, কালিকাপুর, বিষ্ণুপুর, মথুরেশপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মাছের ঘের, পুকুর ও সবজি ক্ষেত ডুবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেবহাটার কোমরপুর, পারুলিয়া, সখীপুর ও নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকায় পানিতে তলিয়ে গেছে পুকুর ও ঘের। অনেক ঘরের মধ্যে পানি ঢুকেছে। কলারোয়ার জয়নগর, ধানদিয়া, যুগিখালি, সোনাবাড়িয়া, শ্রীপতিপুর, ব্রজবকসসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। হাঁস মুরগি ও গবাদি পশু নিয়ে মানুষ চরম বিপদে পড়েছে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ১৪৩ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে এটাই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক দ নূরুল ইসলাম, ভারি বর্ষণে জেলার নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির রোপা আমন বীজতলার ক্ষতি হয়েছে। ৮৬০ হেক্টর রোপা আমন ধানের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৫০০ হেক্টর জমির সবজির ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টি আর না হলে ক্ষতির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমবে বলে জানান নূরুল ইসলাম।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় আমপানে সাতক্ষীরায় মাছের ক্ষতি হয় ১৭৬ কোটি টাকা। ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছাসে মাছের ক্ষতি হয় ১৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ব্যাপক বর্ষণে ৫৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এবিষয়ে আশাশুনির শ্রীউলা এলাকার ঘের ব্যবসায়ী আলাউল ইসলাম জানান, বছরে তিন থেকে চারবার আমাদের মাছের ঘের ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা নেই। ৫০ বিঘার একটি ঘেরে আমপানে আমার ক্ষতি হয়েছিল ২০ লাখ টাকা। ইয়াসে ক্ষতি ছিল ৫ লাখ টাকা। আর বৃহস্পতিবার অতি বর্ষণে আমার ঘের ভেসে ক্ষতির পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। ঘের ব্যবসা আগামীতে বাদ দেবেন বলে জানিয়েছেন আলাউল ইসলাম। সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, জেলার আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার ১৯ হাজার ৪৫৯ টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘেরের আয়তন ১২ হাজার ৬৫ হেক্টর। মাছের ক্ষতির পরিমাণ ৫৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, ঘর-বাড়িসহ অন্যান্য ক্ষতি নিরুপণের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট ইউএনওদের মাধ্যমে প্রাপ্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আজকের মধ্যে পেয়ে যাব। তখন কোথায় কেমন বরাদ্দ করতে হবে, নিরুপণ করব। তিনি আরও জানান, চলমান অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে জেলা ব্যাপী ঘেরের সকল অবৈধ নেট-পাটা স্থাপনকারীকে স্ব-উদ্যোগে মধ্যে নেট-পাটা অপসারণ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যথায় নেট-পাটা স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *