রেনুর ব্যবসা বন্ধ হয়নি

সারাবাংলা

সাফায়েত হোসেন, দশমিনা থেকে:
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার তেতুলিয়া ও বুড়া গৌরাঙ্গ নদীতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেনুর ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে। অবৈধ ওই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। মধ্যে মধ্যে পুলিশ ও র‌্যাব অভিযান চালালেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে রেনু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রের মূল হোতারা। সরেজমিনে তেতুলিয়া ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদী এলাকা ঘুরে এ রকম চিত্র দেখা গেছে। প্রতিদিন নদী তীরবর্তী এলাকার শত শত মানুষ অবৈধ মশারি জাল দিয়ে গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেনু সংগ্রহ করছেন। মশাড়ি জাল দিয়ে গলদা ও বাগদার রেনু সংগ্রহ করার কারণে অন্য শতাধিক প্রজাতির মাছের রেনু পোনা মারা পড়ছে। এ কারণে সরকার নদীতে রেনু ধরা বা সংরক্ষণ করা ও মশারি জাল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে শাস্তির বিধান করেছেন। কিন্তু সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রভাবশালী একটি চক্রের মাধ্যমে নদীতে চলছে রেনু ধরার মহাউৎসব। বৈশাখ মাস থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত জমজমাট রেনুর অবৈধ ব্যবসা চলে নদীতে। তেতুলিয়া নদীর হাজিরহাট এলাকায় মশারি জাল দিয়ে গলদা ও বাগদার রেনু সংগ্রহ করতে আসেন কাটাখালী এলাকার সেকান্দার চৌকিদারের ছেলে আবজাল হোসেন (৪০)। তার সঙ্গে রেনু সংগ্রহে আসেন তার দ্বিতীয় শ্রেনি পড়ুয়া ছেলে মোফাজ্জেল হোসেন (৯)। প্রতিদিন তারা চার থেকে পাঁচশ পিস রেনু পোনা ধরে নদী তীরেই ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার কাছে বিক্রি করেন। এক পিস গলদা ও বাগদার রেনু এক টাকা থেকে দুই টাকায় বিক্রি হয় নদী তীরে। এভাবে প্রতিদিন নদী তীরের শত শত মানুষ রেনু ধরার নামে শতাধিক প্রজাতির মাছের রেনু পোনা নিধন করছেন। ভ্রাম্যমাণ ক্রেতারা নদী তীর থেকে সব রেনু ক্রয় কিনে নিয়ে আসেন আউলিয়াপুর লঞ্চঘাট এলাকায়। সেখান থেকে ভ্রাম্যমাণ ক্রেতাদের থেকে কেনা লাখ লাখ রেনু ড্রামে ভরে ট্রাকে করে চালান করা হয় খুলনা সাতক্ষীরা বাগেরহাট সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। দশমিনা উপজেলায় রেনু পোনা চক্রের তালিকায় রয়েছেন দশমিনা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বেল্লাল হোসেন (তবে শাহ জামাল ছদ্দ নাম নিয়ে তিনি রেনুর ব্যবসা পরিচালনা করেন), সৈয়দ জাফর এলাকার এসহাক হাওলাদার, মাহাবুল সরদার, রহমান হোসেন, পাতার চর এলাকার মনির রাড়ী, কাটাখালীর তাহের আকন, গুলি আউলিয়াপুরের শামীম হোসেন প্রমুখ। এ ছাড়া নিরাপদ রুট হিসেবে পার্শ্ববর্তী জেলা ভোলা ও দশমিনার চরাঞ্চল থেকেও ট্রলারে করে রেনু পোনা বিক্রি করতে নিয়ে আসা হয় দশমিনায়। গত ২২ মে রাতে দশমিনা উপজেলার আরজবেগী এলাকা থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে পাঁচ লাখ গলদা ও বাগদার রেনু সহ একটি ট্রাক আটক করলেও বন্ধ হয়নি অবৈধ রেনুর ব্যবসা। এ ছাড়া উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের এক সিনিয়র নেতাকে রেনু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সংগঠনের পক্ষ থেকে শোকজ করা হয়েছে। অভিযুক্ত ইউপি সদস্য বেল্লাল হোসেন রেনু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানান, বর্তমানে রেনুর ব্যবসা খুবই কম মাছ ও কম পাওয়া যাচ্ছে নদীতে। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে জানান, রেনু না ধরলে খাবে কি নদী তীরে মানুষরা? সৈয়দ জাফর এলাকার রেনু ব্যবসায়ী ইসহাক হাওলাদার জানান, নদীতে মাছ কম তাই ব্যবসাও মন্দা যাচ্ছে। তবে কয়েকজন রেনু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নৌ পুলিশকে ম্যানেজ করেই নদীতে রেনু ধরছেন জেলেরা। এ ব্যাপারে দশমিনা নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ মো, আব্দুল্লাহ জানান, ম্যানেজের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রায় প্রতিদিনই অভিযান চালিয়ে রেনু সংগ্রহকারীদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। জব্দ করা রেনু পোনা নদীতে অবমুক্ত করা হয়। দশমিনা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহাবুব আলম তালুকদার জানান, ১৫/১৬ কিলোমিটার নদীপথ সব সময় নজরদারীতে রাখা সম্ভব হয় না। মানুষ সচেতন না হলে রেনু নিধন বন্ধ করা খুবই কঠিন কাজ। তবে প্রায়ই নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। দশমিনা থানার ওসি মো. জসীম জানান, রেনু ব্যবসা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *