শক্ত অবস্থানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা

সারাবাংলা

এমএ রাজ্জাক, দৌলতপুর থেকে:
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এই প্রথম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ১৪ ইউনিয়নের সবগুলোতেই বর্তমান চেয়ারম্যানদের ফের আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পুনর্বার তাদের নৌকার টিকেট দেওয়ায় তা মানতে নারাজ দলটির বেশিরভাগ নেতাকর্মীরা। ফলে মনোনয়ন বঞ্চিতরা দলের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। তারা নৌকার প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নৌকা ডোবাতে একাট্টা হয়েছেন আওয়ামী লীগের এই বিদ্রোহীরা। তারা বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনের মাঠে বিদ্রোহীরা বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীক ছাড়াই স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। রয়েছে অন্য দলও।
আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বিদ্রোহী প্রার্থীদের ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা তারা আমলেই নেননি। বরং আরও জোরেশোরে নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। বিদ্রোহীদের দাপটে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্রোহীরা নৌকার বিজয় ঠেকাতে একাট্টা হয়ে নির্বাচনের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিদ্রোহীদের কারণে আওয়ামী লীগ থেকে পুনরায় মনোনয়ন পাওয়া বর্তমান চেয়ারম্যানদের জয় নিয়ে বড় রকম সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দলটির দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিদিনই কম-বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত রোববার সন্ধ্যায় উপজেলার রিফায়েতপুর বাজারে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামিরুল ইসলাম বাবু ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী মোটরসাইকেল প্রতীকের আব্দুর রশিদ বাবলুর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এসময় পুলিশের গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এঘটনায় পুলিশ দুইজনকে আটক করে। গত শনিবার সকালে মধুরাপুর ইউনিয়নের হোসেনাবাদ বাজারে নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী সরদার হাসেম উদ্দিন হাসুর ও ঢোল প্রতীকে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হাজি মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের সমর্থকরা সংঘর্ষে লিপ্ত হন। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এঘটনায় বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হাজি মোহাম্মদ মোস্তফা কামালসহ দুইজন আহত হন। গত শুক্রবার রাতে মরিচা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শাহ আলমগীর ও চশমা প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থী জোয়াদুর রহমান জজের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ছাড়া আদাবাড়িয়া, রামকৃষ্ণপুর, পিয়ারপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে প্রতিদিনই উপজেলার কোনো না কোনো স্থানে ক্ষমতাসীনদের দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতা চলে আসছে। এসব ঘটনায় ইটপাটকেল, লাঠিসোটার পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ও হাত বোমা ব্যবহার করা হচ্ছে।
দৌলতপুর পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন জানান, আদাবাড়িয়া ইউনিয়নে একটি সহিংস ঘটনায় সেখান থেকে পিস্তলের গুলি এবং হাতে বানানো বোমা জব্দ করা হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটলেও পুরো পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ পর্যন্ত সহিংসতা কেন্দ্রিক ৪টি মামলা এবং ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ঘটনায় জিডি করা হয়েছে। এগুলো তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করা বিভিন্ন প্রতীকের স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের সবার বক্তব্যই এক এবং অভিন্ন। তারা আওয়ামী লীগ বা নৌকার বিপক্ষে নন জানিয়ে বলেন, আমাদের অবস্থান অযোগ্য প্রার্থীদের বিপক্ষে, দলের বিপক্ষে নয়। বর্তমান চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম দুর্নীতি আর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রত্যেকের হাতেই পুনরায় নৌকার টিকেট তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৪ জন বর্তমান চেয়ারম্যানের মধ্যে একজনও মনোনয়নপ্রাপ্তি থেকে বাদ পড়েননি, এটি দেশের ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা। ঘুরে ফিরে তাদেরই দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনাটি স্বাভাবিক নয়, এর পেছনে নিশ্চয় অন্য কিছু রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জানান, দলের মনোনীত বর্তমান চেয়ারম্যানদের ওপর নানা কারণেই মানুষজন বিষিয়ে উঠেছেন। মানুষজন আর তাদের মেনে নিতে পারছেন না। সৎ, যোগ্য ও জনবান্ধব জনপ্রতিনিধি খুঁজছেন সবাই। পরাজয়ের আশঙ্কায় ইতোমধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যানদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাজ পড়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব দিক বিবেচনা করেই তাদের হাতে আবারও নৌকার টিকেট তুলে দিয়েছেন। খোদ দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কোনো লাভ হবে না। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কোনো জনভিত্তি নেই দাবি করে নৌকার প্রার্থীরা বলেন, ভোটগ্রহণের দিন ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ তাদের দাঁত ভাঙা জবাব দেবে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা হলে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বর্তমান চেয়ারম্যানদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এই চেয়ারম্যানদের বর্জন করার কথা উল্লেখ করে তারা নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে নতুন মুখ বেছে নিতে চান বলে জানিয়েছেন। সাধারণ নেতাকর্মীরা বলছেন, তারা মোটেও নৌকার বিপক্ষে নন, নৌকার বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত মাঝিদের বিপক্ষে তাদের এই স্পষ্ট অবস্থান। নৌকাকে রক্ষার জন্যই তারা মাঝি পরিবর্তনের পক্ষে রয়েছেন বলেও জানান।
দৌলতপুর উপজেলার ১৪ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ১৪ জনসহ মোট ৯০ জন প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ৩৩ জন, স্বতন্ত্র হিসেবে বিএনপির প্রার্থী ১৪ জন এবং জাসদ প্রার্থী ৭ জন। বাকিদের মধ্যে জাতীয় পার্টি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, জাকের পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এ ছাড়া মেম্বার পদে ৬২৭ জন এবং সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য পদে ১৮২ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
আগামী ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে উপজেলার ১৪ ইউনিয়নের ১৫১ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে ঘিরে একদিকে রয়েছে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সবকিছু ছাপিয়ে উৎসবের আমেজও ফুটে উঠেছে। পুরো উপজেলাজুড়ে পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে। এদিকে প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় থাকায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন স্বতন্ত্রের নামে বিএনপি প্রার্থীরা।
দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ নির্বাচন থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, নৌকা আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক। নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার মানেই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া। তাই দলের প্রতি যদি ভালোবাসা থাকে, তাহলে সবাইকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। নৌকার প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে ভেদাভেদ ভুলে সকল নেতাকর্মীকে এক কাতারে শামিল হতে হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *