শহীদ মিনার নেই ৩৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে

সারাবাংলা

রাজিবুল হক সিদ্দিকী, কিশোরগঞ্জ থেকে : মোদের গর্ব মোদের ভাষা আমরি বাংলা ভাষা। বঙ্গমাতার মানিক রতন আয়রে ত্বরা ছুটে আয় আয় আয় আয় রে…….. জন্মভূমি ডাকছে তোদের মনের আঙিনায়। কবির ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে মাতৃভাষার প্রতি মানুষ কতটা আসক্ত। সকল ভাষার মধ্যে তৃপ্তি মিলে একমাত্র মাতৃভাষায়। ১৯৫২ সালে একতরফা আদেশের বিরুদ্ধে বাংলা জাগ্রত মানুষ তাদের অধিকার রক্ষার্থে প্রথমেই প্রতিবাদে না না শব্দটি উচ্চারণ করেন। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা। কিন্তু ৭ কোটি বাঙালি বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রীতির কারণেই মায়ের ভাষাকে সমন্বিত করতে রাজপথে নেমে পড়েছিল দামাল ছেলেরা। তার এ স্মৃতি হিসেবে শহীদ মিনার শোভা পেয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায়। তারই ধারাবাহিকতায় কিশোরগঞ্জ জেলার ১৩টি উপজেলায় ১০৯টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ৮টি পৌরসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শহীদ মিনার স্থাপিত দেখা যায়। বিশেষ করে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক স্কুল, উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রসায় গড়ে উঠেছে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রায় হাজারের অধিক শহীদ মিনার।

কিশোরগঞ্জে সর্বপ্রথম ১৯৬৩ সালে আবু তাহের খান পাঠানের নেতৃত্বে প্রভাতফেরীর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অমর একুশ শুরু হয়েছিল। তারপর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত গুরুদয়াল সরকারি কলেজ মাঠে শহীদ মিনারে কোন সময়ই প্রভাতফেরী বন্ধ থাকেনি। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গুরদয়াল সরকারি কলেজ মাঠের শহীদ মিনারটি।

সরজমিনে জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংখ্যা ১৩২৬টি তার মধ্যে ৯৫৯টি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে শহীদ মিনার ও বাকী ৩৬৭টি প্রতিষ্ঠানে কোন শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৪২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০১টি শহীদ মিনার, হোসেনপুর উপজেলায় ১১০টির মধ্যে সবকটিতেই শহীদ মিনার রয়েছে, করিমগঞ্জ উপজেলায় ১২৫টির মধ্যে ৯৭টি শহীদ মিনার, নিকলী উপজেলায় ৬০টির মধ্যে ৫৫টি শহীদ মিনার রয়েছে, কুলিয়ারচর উপজেলায় ৭৪টির মধ্যে সবকটিতেই শহীদ মিনার রয়েছে, তাড়াইল উপজেলায় ৭০টির মধ্যে ৬৩টি শহীদ মিনার রয়েছে, ভৈরব উপজেলায় ৯১টির মধ্যে সবকটিতেই শহীদ মিনার রয়েছে, বাজিতপুর উপজেলায় ১১১টির মধ্যে ১৭টিতে শহীদ মিনার রয়েছে, মিঠামইন উপজেলায় ৭৫টির মধ্যে ৫টিতে শহীদ মিনার রয়েছে, অষ্টগ্রাম উপজেলায় ৮৩টির মধ্যে ৬৮টি শহীদ মিনার রয়েছে, কটিয়াদী উপজেলায় ১১৯টির মধ্যে ৮৮টি শহীদ মিনার রয়েছে, পাকুন্দিয়া উপজেলায় ১৯৪টির মধ্যে ১৮০টি শহীদ মিনার রয়েছে, ইটনা উপজেলায় ৭২টির মধ্যে ১০টি শহীদ মিনার রয়েছে। হাওরের দুর্গম এলাকা নিকলী, তাড়াইল, বাজিতপুর, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলায় জায়গা স্বল্পতার কারণে ২৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার স্থাপিত হয়নি। অষ্টগ্রাম উপজেলায় ১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২৬২টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ২০০টির মধ্যে শহীদ মিনার থাকলেও জেলার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে কোন শহীদ মিনার নেই। এছাড়া ১৪৭টি মাদ্রাসার মধ্যে মাত্র ৩টি মাদ্রাসায় শহীদ মিনার রয়েছে। তাছাড়া ১৩টি উপজেলার সরকারি কলেজে শহীদ মিনার স্থাপিত হয়েছে। জেলার মূল শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিত গুরুদয়াল সরকারি কলেজের মাঠে। এখানে জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে ভীড় করেন প্রতি বছরই। ৬৮ বছর পার হলেও স্মৃতির পাতা থেকে মুছতে পারেনি তরুণ দামাল ছেলেদের বিলীন হওয়া সেই জীবন। ২১শে ফেব্রুয়ারি যেন শুধু বাঙালী জাতির জন্য নয় সারা পৃথিবীর সকল জাতির জন্য উপমা হিসেবে স্মৃতি ধরে রাখছে শহীদ মিনার। তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থী, যুবক, নারী-পুরুষ সবার কাছেই দলমত নির্বিশেষে স্মরণীয় একটি দিন ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। এবারও প্রস্তুতি নিচ্ছে বাঙালীর প্রিয় মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করার জন্য। মাতৃভাষার চর্চা ও সঠিক ইতিহাস শিশুদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানো যাচ্ছে না আধুনিক শিক্ষা ও কোচিং ব্যবসায়ীদের জন্য। গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও কিন্ডারগার্টেন স্ট্যান্ডার্ড মান রক্ষা করতে গিয়ে শিশুরা মাতৃভাষা থেকে ছিটকে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যেভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকার কথা সে হিসেবে অনেক বিদ্যালয়েই শহীদ মিনারই নেই। সে কারণে ভাষার মাসে মনে হচ্ছে এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার সময় এখনই।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *