শিকলে বাধা জীবন

সারাবাংলা

শামীম হোসেন সামন, নবাবগঞ্জ থেকে:
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার নতুন বান্দুরা গ্রামের নজরুল ইসলাম। ভালবাসায় ব্যর্থ হয়ে দুই দশক ধরে শিকলের সঙ্গে তার বাস। ২০ বছর আগেও স্বাভাবিক ছিল নজরুলের জীবন। বর্তমানে নজরুলের বয়স ৪০ বছর। অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটি ছিলেন কুরআনে হাফেজও। স্পষ্ট ভাষায় তার সুমধুর কন্ঠের আযান আর কোরআন তেলোয়াত মুগ্ধ করতো এলাকাবাসীকে। স্থানীয়রা জানান, স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় নজরুল ভালোবেসে ছিলেন প্রতিবেশী এক মেয়েকে। তবে দুই পরিবারের মতের অমিল থাকায় সে সম্পর্ক গড়ায়নি বিয়ে পর্যন্ত। কিছুদিন পরই অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায় মেয়েটির। ওই বিয়ের পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে। ভুলে থাকার সহজ সমাধান খুঁজতে আসক্ত হয়ে পড়েন নেশায়। তখন পারিপার্শ্বিক নানা মানসিক চাপের পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনও চলে নজরুলের উপর। পুরোপুরিভাবে হারিয়ে ফেলেন মানসিক ভারসাম্য। তারপর থেকেই শিকলে বাধা পড়ে নজরুলের জীবন। অস্বচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটি পড়াশোনায় ছিলেন অদম্য মেধাবী। শুধু তাই নয়, ছিলেন কুরআনে হাফেজও। স্পষ্ট ভাষায় তার সুমধুর কন্ঠের আযান আর কোরআন তেলোয়াত মুগ্ধ করতো এলাকাবাসীকে। ২০০১ সালের পর নতুন আর কোনো ক্ষণ যুক্ত হয়নি নজরুলের স্মৃতিতে। যে কারণে ২০ বছরের আগের স্মৃতিতেই থমকে আছেন নজরুল। অসচ্ছল পরিবার চিকিৎসা করতে না পারায় ভাঙাচোরা একটি ঘরে শিকলে বন্দি এখন তার জীবন। সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙাচোরা টিনের-চালা একটি ঘরের বারান্দায় শিকল পায়ে মাটিতে বসে আছে নজরুল। শরীরে শুধু প্যান্ট ছাড়া আর কোনো কাপড় নেই। শিকল পরা অবস্থায় ঘরের ভেতরেই নজরুলের গোসল ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য একটা গর্ত করে দেওয়া হয়েছে। তবে ঘরটি কাঁচা হওয়ায় গোসলের পর পুরো ঘর কাঁদা হয়ে যায়। এ ছাড়া ঘরটি ভাঙা হওয়ায় শীতকালে ঠাণ্ডায় কষ্ট করতে হয় নজরুলকে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নজরুল দ্বিতীয়। বাবা আয়নাল দেওয়ান ও মা নবীজা বেগম ছেলের চিকিৎসার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত। তবে সুফল মেলেনি কোনো। তারা মারা যাবার পর মানসিক ভারসাম্যহীন নজরুলের দায়িত্ব বর্তায় দুই বোনের উপর। ইচ্ছা থাকার পরও আর্থিক সংকটে তার উন্নত চিকিৎসার ভার নিতে পারছে না পরিবারটি।
নজরুলের বড় বোন কোহিনুর বেগম বলেন, অর্থের অভাবে পুরোপুরিভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে তার ভাইকে শিকলে বেধে রাখতে হচ্ছে। আমার মেয়ে আঁখি এখন তার মামার দেখাশুনা করেন। সরকারিভাবে আমাদের কোনো ভাতাও দেওয়া হচ্ছে না। তিনি সরকারি সহায়তা চান ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য। নজরুলের দুলাভাই মো. আবজাল বলেন, আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় নজরুলের চিকিৎসার জন্য তাদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। নজরুলের ছোট বোন শাহিনুর বেগম বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বাবাও মইরা গেছে অনেক আগে। মা পাগল ভাইটারে নিয়া অনেক কষ্ট করছে। মাইনষের বাড়ি বাড়ি কাজ কইরা ভাইয়ের চিকিৎসা করাইছে। দুই মাস আগেও মা ডাও মইরা গেল। ভাইরে কে দেখবে, ওর যে কি হইবো আল্লায় জানে।
নজরুলের খালা খোদেজা বেগম জানান, মানসিক ভারসাম্যহীন থাকায় নজরুল প্রতিনিয়ত বিভিন্নজনকে মারধর ও বিরক্ত করত, নেশা করে বেড়াতো। অর্থাভাবে তার পুরোপুরি চিকিৎসা করানোও সম্ভব হয়ে উঠেনি। ওর যন্ত্রণার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ২০ বছর আগে পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে ঘরে বেধে রাখা হয়েছে। তবে মাঝে একবার কিছুটা সুস্থ হয়ে কাজও করেছে। কিছুদিন পর আবারো পাগল হয়ে যাওয়ায় শিকলবন্দি করা হয়েছে। এমনকি নিজের পরিবারের লোকজনদের কাছে পেলেও সে আঘাত করার চেষ্টা করে। এ জন্যই পায়ে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়েছে তাকে। ২০ বছরেও নজরুলের দ্বারে পৌঁছায়নি প্রতিবন্ধী ভাতা বা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা। ভাঙাচোরা একটি ঘরে অমানবিক জীবন ধারণা করা আর খেয়ে না খেয়ে দিন পার করা পরিবারটি এখন কি করবে সেই ভেবে দিশাহারা পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও। নবাবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। পুরোপুরি পাগল হলে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে মানবিক কারণে ওর পরিবার থেকে যোগাযোগ করলে আমি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। তবে পরিবারের আশা, সুচিকিৎসা পেলে হয়তো স্বাভাবিক হবে নজরুলের জীবন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *