শিবচরে করোনা আইসোলেশন কেন্দ্র রোগীদের ভরসাস্থল

সারাবাংলা

ফয়েজ চৌধুরী, শিবচর থেকে:
করোনা সংক্রমিত দেশের প্রথম লকডাউনকৃত মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার হাইফো ন্যাজাল ক্যানোলা,অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিন সমৃদ্ধ ২০ শয্যার বিশেষায়িত করোনা আইসোলেশন কেন্দ্রটি করোনা রোগীদের ভরসাস্থলে রূপ নিয়েছে। গত একমাসেই এই বিশেষায়িত এই কেন্দ্রে প্রায় অর্ধশত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯ জন করোনা রোগী। এ ছাড়া শিবচর ডায়াবেটিক সমিতির ফ্রী অক্সিজেন ব্যাংক ও হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীদের জন্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ ছাড়া একই সংস্থার টেলিমেডিসিন সেবায় যুক্ত রয়েছেন করোনা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এদিকে করোনা আক্রান্ত হলে আইসোলেশন কেন্দ্রে যাওয়া ও দলীয় নেতা কর্মীসহ শিবচরবাসীকে ৭ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া টিকা কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। সরেজমিনে জানা যায়, গত বছরের ১৯ মার্চ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় দেশে সর্বপ্রথম প্রবাসী অধ্যুষিত শিবচরকে লকডাউন করা হয়। এ পর্যন্ত শিবচরে করোনা রোগী ৫৩৭ জন শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত সাড়ে ৩ শতাধিক রোগী সুস্থ হয়েছেন। বর্তমানে বিশেষায়িত আইসোলেশন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯ জন রোগী। জুলাই মাসে এই আইসোলেশন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় অর্ধশত রোগী। হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন শতাধিক রোগী। উপজেলায় টিকা গ্রহন করেছেন ৯ হাজার ৬৯ জন। শিবচর হাসপাতালে এ পর্যন্ত এন্টিজেন টেস্ট করা হয়েছে প্রায় ২১শ, পিসিআর টেস্ট করা হয়েছে ১৬৫৪টি। শিবচরে এ পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে (এর মধ্যে ৬ জন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী)। এ উপজেলায় করোনা সংক্রমনের শুরু থেকেই ঘরে ঘরে খাবার সহায়তা,কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে করোনা রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য শিবচরের দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের হাজী আবুল কাশেম উকিল মা শিশু কল্যান কেন্দ্রকে ২০ শয্যার বিশেষায়িত আইসোলেশন কেন্দ্র ঘোষণা করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। ব্যক্তিগত অর্থায়নে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন ও উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করেন তিনি। আইসোলেশন কেন্দ্রটিতে ৩টি হাই ফ্লো নেজাল কেনোলো থেরাপি সিস্টেম, ৭টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিন ( অক্সিজেন জেনারেটর), ১২টি পালস্ অক্সি মিটার,ইনফ্রাডার থাম্রোমিটার, ৪০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার, থার্মাল স্কানার ৫টিসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ফ্রীজ, এসিসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে চিকিৎসক ও সেবিকাসহ স্টাফদের জন্য ডরমেটরি রয়েছে এখানে। সার্বক্ষণিক পদায়ন দেওয়া হয়েছে ২ চিকিৎসক, ২ সেবিকাসহ ৭ স্বাস্থ্যকর্মী। পনেরো দিন পরপর স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবর্তন হয়ে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। এ পর্যন্ত ১৪০ জনেরও বেশি রোগী এখান থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এখানে ৩ বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য কয়েক দফায় লক্ষাধিক টাকার ওষুধ, স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য পিপিই,সুরক্ষা সামগ্রী বিতরন করা হয়েছে। ১ম দফায় লক্ষাধিক প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী, শিশু খাদ্য বিতরনের পর এই দফায়ও ২৫ হাজার পরিবারের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ চলছে। এদিকে শিবচর ডায়াবেটিক সমিতির পক্ষ থেকে হোম আইসোলেশনে থাকা করোনা রোগীদের জন্য ফ্রী অক্সিজেন ব্যাংক কার্যক্রম ও টেলিমেডিসিন সেবা বেশ সাড়া ফেলেছে। এ পর্যন্ত ৬০ রোগীকে ফ্রী অক্সিজেন সিলিন্ডার দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে ফ্রী মাস্ক। এ ছাড়া একই সংস্থার টেলিমেডিসিন সেবায় যুক্ত রয়েছেন ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের করোনা স্পেশালিস্ট ডা. মাহমুদ হোসেন ও শিবচর হাসপাতালের ডা. রাকিবুল ইসলাম। মুঠোফোনের মাধ্যমেও শতাধিক মানুষ টেলিমেডিসিন সুবিধা নিয়েছেন এ পর্যন্ত।
শিবচরের বিশেষায়িত করোনা আইসোলেশন কেন্দ্র থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, প্রচন্ড শ^াস কষ্টে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। বাধ্য হয়ে শিবচর আইসোলেশন কেন্দ্রে ভর্তি হই। সেখানে নিয়েই আমাকে হাই ফ্লো নেজাল কেনোলো থেরাপি সিস্টেম দিয়ে অক্সিজেন বাড়ানো হয়। এছাড়াও এখানে অক্সিজেন জেনারেটর ,পালস্ অক্সি মিটার,ইনফ্রাডার থাম্রোমিটার, অক্সিজেন সিলিন্ডার সব আছে। খাবার মান ও স্বাস্থ্য সেবাও খুব ভাল মানের। এখানে সার্বক্ষণিক ডাক্তারসহ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন।
কুর্মিটোলা হাসপাতালের করোনা স্পেশালিস্ট ডা. মাহমুদ হোসেন সজল বলেন, টেলিমেডিসিন সেবার জন্য অনেকেই আমাদের ফোন দিচ্ছেন । আমরা চেষ্টা করছি সাধ্য মতো সেবা দেয়ার।
উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোস বলেন, করোনা রোগীদের জন্য হাইফ্লো অক্সিজেন খুব জরুরি। চীফ হুইপ স্যার ব্যক্তিগত অর্থায়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে করোনা আইসোলেশন কে›ন্দ্রে রূপান্তর, ফ্রী অক্সিজেন ব্যাংক , ঘরে ঘরে খাবার সহায়তা কার্যক্রম,করোনা রুগীদের দফায় দফায় ওষুধ, সুস্বাস্থ্য সামগ্রী বিতরণ, টেলিমেডিসিন উদ্যোগগুলো দেশে দৃষ্টান্ত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমের কারনে শিবচর দেশে প্রথম আক্রান্ত হয়েও এখন জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম সংক্রমিত ও সুস্থতার হার বেশি।
চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী মুঠোফোনে বলেন, করোনা আইসোলেশন কেন্দ্রে পর্যাপ্ত অক্সিজেনসহ করোনার চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফ্রী অক্সিজেন ব্যাংক, টেলিমেডিসিন, খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম চলমান। লক্ষণ দেখা দিলে টেস্ট করাতে হবে। রোগ গোপন না করে আইসোলেশন কেন্দ্রে যেতে হবে। দলীয় নেতা কর্মীসহ শিবচরবাসিকে করোনার টিকা গ্রহনে জোড়ালো আহ্বান জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *