শেয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে ইপিএস কমিয়েছে নিয়ালকো অ্যালয়স

অর্থ-বাণিজ্য

হুমায়ুন কবির বাবু:
দেশের শেয়ারবাজারে প্রথমবারের মতো স্মালক্যাপ প্লাটফর্মে অনুমোদন পাওয়া নিয়ালকো অ্যালয়স লিমিটেডের আর্নিং পর শেয়ারে (ইপিএস) ভুল তথ্য দিয়েছে। কোম্পানিটি ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ০.৩৬ টাকা কম দেখিয়েছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ ৩ মাসের আর্থিক প্রতিবেদনে নিট মুনাফা হয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। আর ব্যসিক ইপিএস দেখানো হয়েছে ০.৯১ টাকা। কিন্তু প্রকৃত ইপিএস হওয়ার কথা ১.২৭ টাকা। কারণ প্রসপেক্টাসে কোম্পানিটি ওয়েটেড এভারেজ শেয়ার হিসাবে ২০২০ অর্থবছরে সর্বশেষ তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) শেয়ার সংখ্যা হবে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩ টি শেয়ার। কিন্তু কোম্পানি শেয়ার গননার ক্ষেত্রে ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার সংখ্যা গননায় বাড়িয়ে দেখিয়েছে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ৮৭০টি শেয়ার। এতে কোম্পানি তাদের প্রকৃত ইপিএস গোপন করার ঘটনা ঘটেছে।
ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার বাড়িয়ে ইপিএসে ভুল তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে নিয়ালকো অ্যালয়সের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ইউসুফ আলী ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে কোন ধরনের ভুল নেই। তিন জন বিশেষ চাটার্ড একাউন্টেন্ট দিয়ে প্রতিবেদন নিরীক্ষা করা হয়েছে।
প্রোসপেক্টাস সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানির ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার গননায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে শুরুতে শেয়ার ছাড়ে ২০ লাখ। এরপর ২০১৯ সালে ৩০ অক্টোবরে নতুন শেয়ার ছাড়ে ১ কোটি ৩০ লাখ আর সর্বশেষ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে শেয়ার ছাড়ে ৬০ লাখ। কোম্পানির এ শেয়ারগুলোকে ওয়েটেড করলে আসে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩টি শেয়ার। এদিকে সর্বশেষ তিন মাসের অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২০ অর্থবছরে কোম্পানির পণ্যবিক্রি হয়েছে ২০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এ হিসাব থেকে পণ্যবিক্রি খরচ, অপারেটিং খরচ, সুদজনিত ব্যয়, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই নিট মুনাফাকে ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার ১ কোটি ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩ টি শেয়ার দিয়ে গনণা করলে ইপিএস হবে ১.২৭ টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি প্রকৃত ইপিএস তথ্য গোপন করতে ওয়েটেড এভারেজ শেয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থাৎ ১ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ৮৭০ টি শেয়ার গননা করে ইপিএস দেখানো হয়েছে ০.৯১ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটি তিন মাসের প্রকৃত মুনাফা থেকে প্রায় ৩৯ লাখ বা ইপিএস ০.৩৬ টাকা কম দেখিয়েছে।
এদিকে কোম্পানি ৫টি আর্থিক বছরের হিসাবে অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০২০ সালে কোম্পানিটি ওয়েটেড এভারেজ নিট প্রফিট আফটার ট্যাক্স ৩ কোটি ৭০ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এর হিসাব গননায় ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪১১টি শেয়ার। এতে কোম্পানিটির ভারিত গড়হারে শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে ১.১০ টাকা। আর ২০২০ সালে অর্থবছরে ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ অর্থবছরে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) গননার থেকে ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার দেখিয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪১১ টি শেয়ার। এতে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ১.৪২ টাকা। এদিকে ২০২০ অর্থবছরের হিসাবে ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির ওয়েটেড এভারেজ শেয়ার হিসাব গননা করেছে ১ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪১১টি শেয়ার দিয়ে। আর নতুন করে কোম্পানি সর্বশেষ ৩ মাসে কোম্পানিটি ৬০ লাখ শেয়ার ছেড়ে শেয়ারের টাকা ব্যবহার করেছে মাত্র ৩ দিন। এ তিন দিনের হিসাব ওয়েটেড করলে দেখা যায়, ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার আসে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫২টি শেয়ার। এতে তিন মাসে ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার হবে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩ টি শেয়ার। অর্থাৎ প্রকৃত হিসাব গননা থেকে ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার সংখ্যা ৪৩ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৭ টি শেয়ার বেশি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার ৮৭০টি শেয়ার। একইভাবে ২০১৯ অর্থবছরে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর কোম্পানি ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার দেখিয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ শেয়ার। কিন্তু প্রকৃত ওয়েটড করলে আসবে ১ কোটি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪১১ টি শেয়ার।
এদিকে নিয়ালকো অ্যালয়স ওয়েটেড এভারেজ নাম্বার অব শেয়ার গননার ক্ষেত্রে ভুল হিসাব গননায় লাভ-ক্ষতি হিসাব ও ক্যাশ ফ্লো হিসাবে সর্বশেষ তিন মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর’ ২০ এবং ২০১৯ হিসাব বছরে ইপিএস এবং এনওসিএফপিএস কমিয়ে দেখিয়েছে।
২০২০ এবং ২০১৯ অর্থবছরে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) তিন মাসে নিট মুনাফা বা ইপিএস দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ০.৯১ টাকা ও ০.৩৭ টাকা। কিন্তু প্রকৃত ইপিএস আসবে ১.২৭ টাকা এবং ০.৫২ টাকা। একইভাবে ক্যাশ ফ্লো প্রতিবেদনে ২০২০ অর্থবছরে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) নেট ক্যাশ জেনারেটেড অপারেটিং অ্যাকটেভিটিজ ধনাত্বক হয়েছে ৭ কোটি ৯৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা বা নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো পার শেয়ার দেখানো হয়েছে ৫.২৩ টাকা। কিন্তু প্রকৃত হওয়ার কথা ৭.৩৩ টাকা। আর ২০১৯ অর্থবছরে নেট ক্যাশ জেনারেটেড অপারেটিং অ্যাকটেভিটিজ ঋণাত্নক ৭ কোটি ৯৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা বা নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো পার শেয়ার ঋণাত্বক দেখানো হয়েছে (৪.৭২) টাকা। কিন্তু প্রকৃত আসবে ঋণাত্বক (৬.৬২) টাকা। অর্থাৎ ২টি অর্থবছরে তিন মাসের ক্যাশ ফ্লো প্রতিবেদনে ২ কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার টাকা বা ২৯ শতাংশ এনওসিএফপিএস কমানো হয়েছে। আর ২০১৯ অর্থবছরে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ২ কোটি ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা ২৯ শতাংশ ঋণাত্নক এনওসিএফপিএস কমানো হয়েছে।
এদিকে কোম্পানিটির ৩০ জুন ২০১৯ অর্থবছরে স্বল্প মেয়াদে ঋণ ছিল ৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ বছরের ইনকাম এস্টেটমেন্টে সুদজনিত ব্যয়হয়েছিল ৫০ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২০ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ২৯৬ শতাংশ ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২১ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর এ অর্থবছরে সুদজনিজ ব্যয় হয়েছিল ৫০ লাখ ১১ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২০১৯ থেকে ২০২০ অর্থবছরে ঋণ বেড়েছে ২৯৬ শতাংশ অথচ সুদজনিত ব্যয় কমেছে ১.৫৯ শতাংশ। যা লাভক্ষতি হিসাবে সুদজনিত ব্যয় অস্বাভাবিক। আর সর্বশেষ তিন মাসে কোম্পানি ঋণ ছিল ১৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। আর সুজনিত ব্যয় হয়েছে ২৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তবে ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কোন ঋণ ছিল না।
কোম্পানিটি ২০১৫ সালে জুলাই মাসে বানিজ্যিক কার্যক্রমে শুরু করে। কোম্পানি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্রোঞ্জ ও ব্রাস উৎপাদনে কাঁচামাল পণ্যের মধ্যে রয়েছে গান মেটাল, ফসফরাস ব্রোঞ্জ, রিডেড ব্রোঞ্জ, অ্যালুমিনিয়াম ব্রোঞ্জ, হাইটেনসিল ব্রাশ,ডাইকেস্ট ব্রাশ, মাস্টার অ্যালয়স, ফসফরাস কপার ইত্যাদি।
নিয়ালকো অ্যালয়স লিমিটেড আর্থিক প্রতিবেদনে শেয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে ইপিএস কম দেখিয়েছে। এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, এ বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।
উল্লেখ্য, প্রথমবারের মতো দেশের শেয়ারবাজার থেকে কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে যাচ্ছে এসএমই কোম্পানি নিয়ালকো অ্যালয়স লিমিটেড। বিএসইসির ৭৭০ তম সভায় কমিশন সভায় নিয়ালকো অ্যালয়স লিমিটেডকে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নিয়ালকো অ্যালয়স কিউআইও’র মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করবে। ২০১৮ সালের রুলস অনুযায়ী কোম্পানিটি প্রতিটি ১০ টাকা করে ৭৫ লাখ শেয়ার যোগ্য বিনিয়োগাকারীদের নিকট ইস্যুর মাধ্যমে এই অর্থ উত্তোলন করবে। উত্তোলিত অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি ভূমি উন্নয়ন, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং আইপিও খরচ খাতে ব্যয় করবে। ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ০.৯১ টাকা এবং পুনঃমূল্যায়ন সঞ্চিতি ছাড়া নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১২.৪৩ টাকা। এসএমই প্লাটফর্মে লেনদেনের তারিখ হতে পরবর্তী তিন বছর ইস্যুয়ার কোম্পানি কোনো বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে পারবে না। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড। যেসব ইনডিভিজুয়াল ইনভেস্টর (রেসিডেন্ট অ্যান্ড নন-রেসিডেন্ট) তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের বাজার মূল্যে বিনিয়োগের পরিমাণ ১ কোটি টাকা বা বেশি হলে তাদের কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর হিসেবে বিবেচিত করা হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *