শনিবার ২১শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শ্রমিকের হাহাকার

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

রাশেদ আলম রাজ্জাক, গোয়াইনঘাট থেকে
সিলেট বিভাগের উত্তরপূর্বের সীমানায় খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে ঘেষা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাদাপাথর, জাফলং, বিছনাকান্দি, রাতারগুল ও উৎমা ছড়ার দৃশ্য পর্যটকদের নজর কাড়ে। এই অপরূপ মায়াঘেরা অঞ্চলটি সিলেট-৪, সংসদীয় আসন ২৩২, টানা ৬ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ এমপি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা। ওই এলাকার জনগণের একমাত্র অবলম্বন বা রুটি রোজগারের উৎস পাথর উত্তোলনে শ্রেণিমত শ্রম দেওয়া। পাথর উত্তোলন প্রক্রিয়া যদি বন্ধ থাকে, তাহলে এই এলাকার প্রায় ৪ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায়, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তিয়া ও কানাইঘাটসহ ৬টি পাথর উত্তোলনকারী কোয়ারী বন্ধ থাকলে এলাকার মানুষের জীবনযাপনে কতটা ভয়াবহতা নেমে আসে, সেটি নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শ্রমিকরা বিভিন্ন সময়ে বিগত বছর ন্যায় বেশ কিছুদিন আগেও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন, ফলাফল সেই আগের চিত্র। ইতিপূর্বে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে এই অঞ্চলের মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের অবস্থা উঠে এসেছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই জাফলং পাথর কোয়ারীর উপর নির্ভরশীল। এই কোয়ারীসহ সিলেটের ৬টি কোয়ারী বন্ধ হওয়ার কারণে বেকার হয়ে পড়েছে সহস্র মানুষ। ফলে পুরো উপজেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে হাহাকার।
সাধারণ শ্রমিকের পরিবার পরিজনের পেটের ক্ষুধায় যদি কেউ সনাতন পদ্ধতিতে বারকী নৌকা দ্বারা ২টা পাথর উত্তোলন করতে যায়। প্রশাসন ইতিপূর্বে প্রায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা মূল্যমানের যন্ত্রপাতি অভিযান করে পোড়াচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে কোন বাঁধা নেই। যত বাঁধা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে। খনি ও খনিজ বিধিমালা-২০১২ এর বিধিমালা ১২ অনুসারে সরকার কর্তৃক সময় সময় যে জেলা কমিটি সরকারী গেজেটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে গঠিত হয়। তাদের মাধ্যমে আলোচনা করে বর্তমান পাথর উত্তোলনের বিষয় সমাধান করা যেতে পারে। অথবা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটি কমিটি করে বর্তমান পাথর উত্তোলন কিভাবে করা যায়? যাতে পরিবেশ বিপর্যস্ত না হয় একটি সুনির্দিষ্ট আইন করে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু একদিকে বলা হয় সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে কোন বাধা নেই, অন্যদিকে অভিযান পরিচালনা করে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ধ্বংস করা হয়।
এই প্রতিবেদন লেখার আগে দৈনিক ঢাকা প্রতিদিন পত্রিকার গোয়াইনঘাট প্রতিনিধিকে, জাফলং পাথর উত্তোলন ও শ্রমিক বহুমুখী সমবায় সমিতির লিঃ এর সহ-সভাপতি আব্দুল মতিন বলেন, এবং উনার ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। ওই শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম ও যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মো. ফুল মিয়া। জন্মের পর থেকে পাথর উত্তোলন দেখে দেখে বেড়ে উঠেছি। যখন বড় হলাম সংসারের হাল ধরতে হলো। তখন পাথর উত্তোলনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। প্রায় হাজার হাজার শ্রমিকের নেতৃত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি গর্ত থেকে পাথর উত্তোলনের দায়িত্বও পালন করেছি। তাই বলছি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে শ্রমিক ও জনগণের স্বার্থে পাথর উত্তোলনে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা ঘোষণা করে। তারপর প্রশাসনকে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ করুন। প্রাচীনকাল থেকে পাথর উত্তোলন করতে পানি সরিয়ে নেওয়ার জন্য সেলু মেশিন ব্যবহার ছিল, সেলু মেশিনে প্লাস্টিকের পাইপ বা লোহার পাইপ লাগিয়ে জলন দূরে সরিয়ে দেওয়া হতো। তারপর শ্রমিকরা বেলচা দিয়ে মাটি বা বালিসহ ঝাকুনির মধ্যে ফেলতো। ঝাকুনি দিয়ে মাটি একস্থানে আর পাথর টুকরীর ভেতর রাখতো। টুকরী পাথর ভর্তি হলে গর্তের উপরে একটি স্থানে জমা করে রাখতো। এই জমা পাথর ট্রাক্টর বা মালবাহী যানে করে স্টোন ক্রাশারে আসে। আর ক্রাশার মেশিন পাথর বিভিন্ন সাইজ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকে। এই হচ্ছে মোটামোটি পাথর উত্তোলন পদ্ধতি।
স্থানীয় ভোলাগঞ্জ, শারফিন টিলা, উৎমা, গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি, জাফলং, শ্রীপুর, লোভাছড়া সহ কোয়ারি সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ধ্বংস করছে প্রশাসন খবর প্রকাশিত হয় বা হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতে রিট করে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ২০১০ সালে পাথর উত্তোলনের নীতিমালা তৈরির জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয় আদালত। পাশাপাশি কোয়ারিগুলো যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অপারেশ-৩ শাখার সহকারী সচিব শিরিন সুলতানা স্বাক্ষরিত নির্দেশনা পত্রে কোয়ারি বন্ধ রাখা হয়।
জানা যায়, জাফলং পাথর কোয়ারী নিয়ে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০১৪ সালে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, পিয়াইন নদী এলাকার প্রায় ১৫৮ দশমিক ৭০ হেক্টর জায়গা পাথর কোয়ারী বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে পরিবেশ বিনষ্টের বিষয়টি বিবেচনায় এনে, পাথর উত্তোলন বন্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ২০০৯ সালে জাফলংয়ের পিয়াইন নদীকে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) এলাকা ঘোষণার জন্য উচ্চ আদালতে একটি রিট দায়ের করে। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে ২০১২ সালে পিয়াইন নদীর ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করে। ২০১৫ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি যার গেজেট প্রকাশ করে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী ইসিএ ঘোষিত এলাকার সীমানা চিহ্নিত করে ওই এলাকা থেকে পাথর উত্তোলনের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন। পরবর্তীতে স্হানীয় আওয়ামী লীগ সিলেট জেলা ও উপজেলার নেতাদের সহযোগিতায় বর্তমান সংসদ সদস্য ইমরান আহমদ এমপি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর একান্ত প্রচেষ্টায় শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কথা বিবেচনা করে বিগত ২০১৮ সালে জাফলং পাথর কোয়ারী সচল করে দেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে গেল বছর থেকে ইসিএ এলাকার বাইরে পিয়াইন নদীর এলাকা গেজেটভুক্ত কোয়ারী থেকেও পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। যার ফলে বিগত ১বছর ধরে পাথরের জনপদে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে প্রায় ৪ লাখ শ্রমিক। গেজেটভুক্ত এলাকা থেকে পাথর উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান জাফলং ষ্টোন ক্রাশার মিল মালিক সমিতির সভাপতি বাবলু বখত, জাফলং ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল আলীম, জাফলং বল্লাঘাট পাথর উত্তোলন সমিতির সভাপতি রহিম খান, জাফলং ট্রাক চালক সমিতির সভাপতি ফয়জুল মিয়া সহ জাফলংয়ের সামাজিক সংগঠন রেজুলেশন প্রাপ্ত ১৬টি ক্লাবের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মো. রুবেল আহমদ ও যুগ্ন আহ্বায়ক মো. জালাল হোসাইন, ব্যবসায়ী ইমরান হোসেন সুমন, আলীম উদ্দিন, আলাউদ্দিন, ফয়জুল মিয়া, ফিরোজ আহমদ সহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
সর্বশেষ

গণকমিশনের ভিত্তি নেই, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাকা প্রতিদিন অনলাইন || আজ শুক্রবার (২০ মে) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের ২৭তম বার্ষিক সম্মেলন শেষে

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031