সদালাপী ও নিরাহংকারী তোতা মিয়ার গল্প গণমানুষের প্রাণ

সারাবাংলা

আবু নাসের হুসাইন, সালথা থেকে
এলাকাবাসীর মন জুড়ে রয়েছে এই সদালাপী, নিরাহংকার, জনসেবক ও অসাধারণ মানুষটি। ইউনিয়ন পরিষদের সচিব থাকালীন মানুষের দ্বারে দ্বারে থাকতেন সব সময়। তার জন্য সাধারণ মানুষ সহজেই সেবা পেতেন। হাসি-খুশি ছাড়া তিনি কথা বলতেন না। তার আচার-ব্যবহারে আজও মুগ্ধ ওই সব ইউনিয়নের মানুষ। এ ছাড়া তিনি তার এলাকার স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, ঈদগাহ ও কবরস্থানের উন্নয়নে সার্বিক সহযোগিতা করে আসছেন। নিঃস্বার্থভাবে অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে সব সময় নিজেকে বিলিয়ে দেন। অস্বচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও কন্যাদ্বায় গ্রস্থ পরিবারের পাশে থাকেন। বর্তমানে মহামারী করোনাভাইরাসের লকডাউনের সময় তিনি অসহায় মানুষের হাতে খাদ্য সামগ্রী তুলে দিয়েছেন। এই সদালাপী নিরাহংকার মানুষটি হচ্ছেন ফরিদপুর জেলার সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের ইউসুফদিয়া গ্রামের কৃতি সন্তান ও ভাওয়াল ইউনিয়নের সাবেক সচিব নুর মোহাম্মাদ হোসেন। সে এলাকার ছোট বড় সবার কাছে তোতা কেরানী নামে পরিচিত। মানুষের হৃদয় জুড়ে রয়েছে তার অফুরন্ত ভালোবাসা। এলাকাবাসী সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, নুর মোহাম্মাদ তোতা মিয়া ১৯৫৬ সালে ইউসুফদিয়া গ্রামের একটি সম্ভন্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মো. লাল মিয়া ও মাতার নাম মোসাম্মাৎ ফিরোজা বেগম। তিনি ১৯৭২সালে ইউসুফদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৭৪ সালে নগরকান্দা মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৭৭ সালে ভাওয়াল ইউনিয়ন পরিষদের সচিব পদে চাকরিতে যোগদান করেন। ২০১৫ সালে চাকরি থেকে সেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি সংসার জীবনে ৩ পুত্র সন্তানের জনক। এর মধ্যে বড় ছেলে মো. সাজ্জাদ হোসেন ও মেঝ ছেলে মো. সাখাওয়াত হোসেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার পাশ করেছেন। বড় ছেলে সাজ্জাদ হোসেন বর্তমানে ম্যাকানিজম ট্রেড এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং মেজ ছেলে সাখাওয়াত হোসেন ওয়েলটেক ট্রেডিং কর্পোরেশন এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন। আর ছোট ছেলে আওলাদ হোসেন একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন।
তোতা মিয়া চাকরি করাকালীন পায়ে হেটে বা নৌকায় করে প্রতিটি গ্রামে যেতেন জন-সাধারণের খোঁজ নেওয়ার জন্য। তখন থেকেই কারো অভাব দেখলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। পৈতৃক সম্পদের আয়ের একটি অংশ তিনি মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন এবং এখনও দেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি কৃষি কাজে মনযোগ দেন। এলাকার মানুষ তাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। এ ছাড়া ছোট ছেলে-মেয়েরাও তাকে বন্ধুর মতো ভালোবাসে। মনে হয় পাড়ার সব কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের দাদা বা নানা এই তোতা মিয়া। গ্রামের জসিম উদ্দিন জানান, তোতা মিয়া একজন শিক্ষিত মানুষ। এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য সব সময় কাজ করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সব সময় সহযোগিতা করে থাকেন। অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে থেকে তাদের আর্থিক সহযোতিা করেন নিঃস্বার্থভাবে। তার মধ্যে কোনো লোভ-লালসা দেখি নাই। বিল্লাল হোসেন নামে আরেক ব্যাক্তি জানান, তোতা কেরানী অত্যান্ত সহজ-সরল, সদালাপী হাস্যজ্জল একজন মানুষ।
৭নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তোতা মিয়া সামাজিক, মিশুক, হাস্যজ্জল, পরোপকারী ও সদালাপী একজন লোক। দীর্ঘদিন তিনি ভাওয়াল ইউনিয়নের সচিব ছিলেন। মানুষের যথেষ্ট সেবা করেছেন, এখনও করেন। তিনি একজন জনসেবক। তার বর্ণনা দিয়ে শেষ করার মতো নয়। সমাজটাকে সুন্দর রাখতে আমাদেরও তার মতো মানুষ হওয়া উচিত।
উপজেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বলেন, তোতা মিয়া সব ধরনের মানুষের সঙ্গে চলতে পারেন। অসহায়দের সহযোগিতা করেন। দলমত নির্বিশেষে সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। সে একজন গুনী এবং সুখী মানুষ।
শিক্ষক জাহিদুর রহমান বলেন, তোতা মিয়া সদা হাস্যজ্জল একজন মানুষ। যেখানেই দেখা হোক তার আগে কেউ কুশলাদি বিনিময় করতে পারে না। পরিবারের খোঁজ নেন। আমার কাছে তাকে একজন সাদা মনের মানুষ মনে হয়। তাকে আমি খুব সম্মান করি। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন বলেন, নুর মোহাম্মাদ তোতা কেরানী ব্যক্তি জীবনে একজন সাদা মনের মানুষ। সহজেই তিনি মানুষকে আপন করে নেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বাচ্চু মাতুব্বার বলেন, তোতা মিয়া আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। ছাত্রজীবন থেকেই তোতা মিয়া শান্তশীল ও হাসি-খুশি। স্কুল জীবনে কারো সঙ্গে ঝগড়া করে নাই। এমনকি মূখ কালো করে সহপাঠিদের সঙ্গে কথা বলে নাই। চাকুরী জীবনে দেখেছি, তোতা মিয়া মানুষের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্রয়োজনীয় কাগজ দিয়ে আসছে। কোনদিন তার থেকে কেউ কষ্ট পায় নাই। তাছাড়া গরীব মানুষের পাশে সব সময় থাকে এবং সকল প্রকার সহযোগিতা করে। তোতা মিয়ার মতো মানুষ আমি কখনও দেখি নাই। এক কথায় তোতা মিয়া একজন অসাধারণ মানুষ।
এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপ চারিতায় নুর মুহাম্মাদ তোতা মিয়া বলেন, আমি একজন ক্ষুদ্র মানুষ। মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে আমার ভালো লাগে। মনের তৃপ্তি মেটে। এই পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকবে না। তাই আমি মানুষকে এতো ভালোবাসি। মানুষের শত আঘাত আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। কেউ কষ্টে থাকলে আমি সহ্য করতে পারি না। আমার মন কাঁদে। তাই হয়তো তার পাশে থাকার চেষ্টা করি। যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন যেন নিঃশ্বার্থভাবে মানুষের পাশে থাকতে পারি। মহান রাব্বুল আলামীন যেন আমাকে সেই তৌফিক দান করেন। আমার সন্তানদেরও এই শিক্ষা দিয়েছি। আশা করি আমার সন্তানেরাও আমার আদর্শ ধারন করে পথ চলবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *