সভ্যতার বিবর্তন : হারায় ঐতিহ্য

সারাবাংলা

যশোর সংবাদদাতা:
বাংলার শুরু থেকেই বাংলাদেশের সবর্ত্রই যাতায়াত ও পরিবহনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ যান ছিল পরিবেশ বান্ধব গরুর গাড়ি। যশোর থেকে কলকাতা কিম্বা গ্রাম থেকে যশোর শহরের বড় বাজার কালেক্টরেট ভবন, আদালত সর্বত্র গরুর গাড়িতে মানুষ বা মালামাল আনা নেওয়া হোত। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার বিবর্তনে যন্ত্রচালিত লাঙল বা পাওয়ার টিলার এবং নানা যন্ত্রযানের উদ্ভবের ফলে বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে গরুর গাড়ি। বর্তমান যশোরের কলকাতা সড়ক যা মুজিব সড়কেও দেখা যেত গরুর গাড়ি। চাল আটা, কাঠ বা মুদি দোকানের মালামাল ভর্তি গরুর গাড়ি চোখে পড়তো কয়েক বছর আগেও। কিন্ত জেলার গ্রামেও কদাচিৎ মেলে তা।

গরুর গাড়ির কথা বলতেই তোফাজ্জেল নানা বললেন, সে দিনকি আর আছেরে নাতি, কথায় কথায় ছাতু খেতি। এখন গরুর গাড়ি যশোর সদর ও চৌগাছা উপজেলার কোন গ্রামে আছে তা আমার জানা নেই। এই শীতেও তার দেখা মেলেনি। খেজুর গাছে ভাড় আছে, আছে গুড় পাটালি তবে গরুর গাড়ি নেই-এটাই চরম সত্যি। বৃহৎ যশোরের সর্বত্র এক সময় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহি গরুর গাড়ি এখন বিলুপ্তির পথে। চৌগাছা, ঝিকরগাছা তো বটেই, মনিরামপুর, কেশবপুর, বাঘারপাড়া, শার্শার এমন কোন গ্রামের বাড়ি ছিল না যে বাড়ি গরুর গাড়ি ছিলনা। নতুন নতুন প্রযুক্তির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ঘটছে, পক্ষান্তরে হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের এই ঐতিহ্যবাহী যানটি। জানা যায়, গরুর গাড়ির ইতিহাস সুপ্রাচীন। খ্রিস্টজন্মের ১৬০০-১৫০০ বছর আগেই সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম দক্ষিন অঞ্চলে এবং বাংলায় গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল, যা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে আরো দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবন পর্যন্ত। গ্রাম বাংলায় এই ঐতিহ্য মানুষের প্রয়োজনীয় যানটি আজ বিলুপ্তির পথে।

একসময় পল্লী এলাকার জনপ্রিয় বাহন ছিল গরুর গাড়ি। বিশেষ করে এই জনপদে কৃষি ফসল ও মানুষ বহনের জনপ্রিয় বাহন ছিল গরুর গাড়ি। যুগের পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে এই বাহন। মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুদের আনা নেওয়া, হাটে মালামাল উঠানো অথবা মাঠ থেকে ধান পাট, সরিষা, তরিতরকারি আনতে গরুর গাড়ির বিকল্প কিছু ছিল না। গ্রামে মাঝে মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকায় দু-একটি গরুর গাড়ি চোঁখে পড়লেও শহরাঞ্চলে একেবারেই দেখা যায় না। সে কারণে শহরের ছেলেমেয়েরা দূরের কথা, বর্তমানে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও গরুর গাড়ি শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নয়। এমনকি অনেক শহুরে শিশু গরুর গাড়ি দেখলে বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করে গরুর গাড়ি সম্পর্কে। গরু গাড়ি দুই চাকাবিশিষ্ট গরু বা বলদে টানা এক প্রকার বিশেষ যান। এ যানে সাধারণত একটি মাত্র অক্ষের সঙ্গে চাকা দুটি যুক্ত থাকে। গাড়ির সামনের দিকে একটি জোয়ালের সঙ্গে দুইটি গরু বা বলদ জুটি মিলে গাড়ি টেনে নিয়ে চলে। সাধারণত চালক বসেন গাড়ির সামনের দিকে। আর পেছনে বসেন যাত্রীরা। বিভিন্ন মালপত্র বহন করা হয় গাড়ির পেছন দিকে। বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্য ও ফসল বহনের কাজে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল ব্যাপক। দুই যুগ আগেও গরুর গাড়িতে চড়ে বর-বধূ যেত। গরুর গাড়ি ছাড়া বিয়ে কল্পনাও করা যেত না। বিয়ে বাড়ি বা মাল পরিবহনে গরুর গাড়ি ছিল একমাত্র পরিবহন বাহন। গরুর গাড়ির চালককে বলা হয় গাড়িয়াল বা গাড়োয়ান।
তবে বর্তমানে নানা ধরনের মোটরযানের ভিড়ে অপেক্ষাকৃত ধীর গতির এই যানটির ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। বর্তমান যুগ হচ্ছে যান্ত্রিক যুগ।

মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের জন্য বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাক, পাওয়ার টিলার, লরি, নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন মালগাড়ি। মানুষের যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, বেবিট্যাক্সি, অটোরিকশা ইত্যাদি। ফলে গ্রামাঞ্চলেও আর চোখে পড়ে না সহজে গরুর গাড়ি। অথচ গরুর গাড়ির একটি সুবিধা হলো, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। ফলে ধোঁয়া হয় না। পরিবেশের কোনো ক্ষতিও করে না। এটি পরিবেশবান্ধব একটি যানবাহন। আবার ধীর গতির কারণে এতে তেমন কোনো দুর্ঘটনারও আশংকা থাকে না। অথচ যুগের পরিবর্তনে আমাদের প্রিয় এই গরুর গাড়ির প্রচলন আজ হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে। এখন নবীন-প্রবীণদের কাছে গরুর গাড়ি শুধুই স্মৃতি। দ্রুত বয়ে চলা সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্য ভুলে এখন গ্রাম-বাংলার মানুষজন হয়ে গেছে যান্ত্রিক। এই হিসেবে শহরের ছেলে-মেয়েরা দূরের কথা, বর্তমানে গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়েরাও গরুর গাড়ী শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নয়। এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গরুর গাড়ী যাদুঘরে গিয়ে দেখতে হবে বলে ধারণা অনেকের।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *