সুন্দরগঞ্জ নদীবন্দরে হাকডাক নেই

সারাবাংলা

জুয়েল রানা, সুন্দরগঞ্জ থেকে
গভীর খাল আর সারা বছর জল। খাল হলেও নাব্যতা থাকায় স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিল গোয়ালের ঘাট নদী। সংযোগ ছিল সুন্দরগঞ্জ ও উলিপুর থানার সীমান্ত ঘেঁষে এবং সুন্দরগঞ্জ থানা সদর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে তিস্তা নদীর সঙ্গে খালে চলতো হরেক রঙের পাল তোলা বড় নৌকা। পাট কেনার জন্য মহাজনরা আসতো নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে, ভিড়তো সুন্দরগঞ্জ বন্দরে। কিন্তু কালক্রমে সেই গোয়ালের ঘাট নদী ভরাট হয়ে এখন মরা খাল আর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে সেই নদীবন্দর। জনশ্রুতি রয়েছে এই জনপদের উপর দিয়ে তিস্তা ও ঘাঘট নদী এবং ব্রহ্মপুত্র নদ প্রবাহিত হওয়ায় নদীর পাশে দুটো বাজার বা গঞ্জ ছিল। চারদিকে ব্যবসায়-বাণিজ্যেও জন্য গঞ্জ দুটোর রেশ নাম ডাক ছিল। গঞ্জের মানুষের আচার আচরণ এবং চেহারা সুন্দর ছিল বলে এ জনপদেও নাম সুন্দরগঞ্জ। সে যাই হোক যেহেতেু নদীর তীরবর্তী বড় হাট বা বাজারকে গঞ্জ বলা হয়, তাই সুন্দর নামটির নাম করণের জনশ্রুতি নিয়ে ভিন্নতা থাকলেও গঞ্জ নিয়ে যে ভিন্নতা নেই তা বলা যেতে পারে। বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেছেন- বহুকাল ধরেই সুন্দরগঞ্জের অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক। এ জনপদ আমন মৌসমে ফসল ভাল হলেও খরা প্রবণ হওয়ায় প্রখর রোদে পোড়া যেত আউশ। বিঘায় ফলন হতো দুই বা তিন মণ ধান। খরা সহিষ্ণু হওয়ায় চাষিরা ঝুঁকে পড়েছিল পাট চাষে। উৎপাদন হতো হাজার হাজার মণ পাট। সুন্দরগঞ্জ বন্দরে নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাট কেনার জন্য সারিবদ্ধভাবে হরেক রঙের পাল তোলা বড় বড় নৌকা আসতো বন্দরে। পাটের বাজারে প্রচুর চাহিদা থাকায় দাম ও ছিল বেশ। যা পাট উৎপাদনকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। নদী পথে খরচ কম এবং প্রচুর পাট পাওয়া যেত বলে পাট কেনাবেচার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল সুন্দরগঞ্জ বন্দর। এদিকে মীরগঞ্জ বন্দরে ছিল রড, সিমেন্ট, ঢেউটিন, বিক্রয় কেন্দ্র। এ ছাড়া এই বন্দরটিতে ছিল বড় বড় গালামালের দোকান। সপ্তাহে শনিবার ও বুধবার বিশাল হাট। দূর-দূরান্ত থেকে আসতো পাল তোলা শত শত নৌকা ভর্তি মানুষ। কখনও বা পালে বাতাস না পেলে দাঁড় টেনে আসতেও দেখা যেত নৌকাগুলোকে। পছন্দের পণ্য কিনে ফিরে যেত তারা। সুন্দরগঞ্জ বন্দর থেকে মীরগঞ্জ বন্দর ব্রিজ পর্যন্ত নোঙর ফেলে থাকার সারি সারি নৌকা। বেশি দিন আগের কথা নয়। আশির দশকের মধ্যভাগের দিকে সর্বনাশী তিস্তা তার প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারন করে। একের পর এক পাড়া বা গ্রাম ভাঙতে শুরু করে। পূর্ব নিজামখাঁ এবং উত্তর তারাপুর ভেঙে গিয়ে তারাপুরকে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। তিস্তা সংযুক্ত করে ফেলে মীরগঞ্জ ও গোয়ালের ঘাট নদীকে। এক বর্ষা মৌসুমেই ভরাট হয়ে তার তলদেশ। তারপর থেকে বর্ষাকালে নাব্যতা থাকলেও শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায় পুরোটাই। পাটের বেচাকেনা আগের মত থাকলেও রাস্তাঘাট ও পরিবহনের ব্যবস্থার উন্নতির ফলে পণ্য পরিবহনের জন্য নৌকার স্থান দখল করে নিয়েছে এখন ট্রাক। বন্দরের স্থানে ফেলা হচ্ছে পৌরসভার সব আবর্জনা। পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। কথা হয় লিচু মিয়ার সঙ্গে। যিনি পাট নিয়ে নৌকার সঙ্গে যেতেন দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়ি ও নারায়ণগঞ্জে। তিনি বলছেন, ভালোই ছিল সেই দিনগুলো। সারি সারি নৌকা আসতো বন্দরে। দেখে প্রাণটা যেন জুড়িয়ে যেত। নোঙর করে থাকতো কখনো যেতেও হতো নৌকার সঙ্গে। নতুন প্রজন্মের অনেকেরই ধারণা নেই সুন্দরগঞ্জ ও মীরগঞ্জ নদীবন্দর সম্পর্কে। তারা বলছেন, বন্দর নাম জানি না।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *