সুসময়ের বন্ধু এবং কিছু কথা…

মতামত

কোনো এক উপন্যাসে পড়েছিলাম, তুমি যখন হাসো, দেখবে সবাই তোমার সঙ্গে হাসছে, তুমি যখন কাঁদবে দেখবে কেউ তোমার সঙ্গে কাঁদছে না। এর মানে সুসময়ে অনেকেই বন্ধু হয়, অসময়ে বন্ধু খুঁজে পাওয়া কঠিন। গত চব্বিশ আগস্ট দুপুরে পেশাগত কাজে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার দফতরে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোক দীর্ঘ এক ঘণ্টা বিশ মিনিট রিসেপশনে বসিয়ে রেখেও দেখা করলেন না। যেই তার অফিস থেকে বেরিয়ে আধা কিলোমিটার পর্যন্ত চলে এসেছি, তখন তিনি মোবাইলে ফোন দিলেন। প্রথম বার ফোনটা ধরলাম না। দ্বিতীয় বার ধরতেই বললেন, তুমি চলে গেছো, ঠিক আছে কাল এসো। সেই কাল আর যাইনি। আশা করি আর যাবো না। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ সাতাশ বছরের ঘনিষ্ঠতা। আর একজন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তার সঙ্গেও তেরো-চৌদ্দ বছরের ঘনিষ্ঠতা। বছর দুয়েক আগে ভদ্রলোক চাকরি নিয়ে চরম বিপদে। বিশ দিনের মধ্যে ভদ্রলোক আমার অফিসে আসলেন চার বার। এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। বললেন, ভাই আমার জন্য কিছু একটা করেন, বললাম আমিতো অতি সাধারণ একজন মানুষ আমার পক্ষে কিই বা করার আছে? তারপরও ওনার জন্য চার-পাঁচজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে গেলাম, বললাম ভাই, তার ব্যাপারটা একটু দেখেন, ওনি পরিস্থিতির শিকার। নানামুখী তদ্বির করে ভদ্রলোক ভালো পোস্টিং পেলেন। পরে পদোন্নতিও পেলেন। এরপর থেকে ভদ্রলোক দশবার ফোন দিলে একবার ধরেন। কখনও কখনও ফোন ধরেনও না। যদিও তার কাছে ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা নেয়ার জন্য ফোন দেই না। এখন বলছি সিনিয়র উপসচিব পদমর্যাদার একজনের কথা। আমার দৃষ্টিতে ভদ্রলোক একশ ভাগ সৎ এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের। আজ থেকে ১৩ বছর আগে উনি ঢাকায় পোস্টিং হয়ে এলেন, তখন থেকে তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। তার দেয়া বহু রিপোর্ট লিড স্টোরি করেছি। এতে দেশের, তার এবং আমারও লাভ হয়েছে। ২০১৩ সালের দিকে তার ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি রিপোর্ট ছেপে আমাকে বহু হুমকি ধমকি খেতে হয়েছে। এমনকি মামলা মোকদ্দমা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। রিপোর্টটি ছিল তার দেয়া। ওই রিপোর্ট করার জন্য তিনি তখন অনেককেই অনুরোধ করেছেন, কিন্তু ভয়ে কেউ ছাপতে সাহস করেনি। ওই ভদ্রলোক ইদানীং আমার ফোনই রিসিভ করেন না। কারণটা আমার জানা নেই। আমার দুই সহকর্মীর কথা বলছি, একজনকে এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। সে প্রতি সপ্তাহে দুই/তিন দিন যেত ওই কর্মকর্তার কাছে। একপর্যায়ে ওই কর্তাব্যক্তির কাছে আমার বিরুদ্ধে সত্যমিথ্যা অনেক কিছু বলে তার কান ভারি করলো। অবশেষে আমি নিজে ওই কর্মকর্তার কাছে যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম। এ সুযোগটাই সে লুফে নিল। ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে আমার ওই সহকর্মী বাড়ি গাড়িসহ কয়েক কোটি টাকার মালিক। এটা দেখে আমার অবশ্য ভালো লাগে। আমার আরও এক সহকর্মী, যে নাকি এক সময় কোনো এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর টিবয় ছিল। সে একদিন সরকারের টপ লেবেলের এক আমলার কাছে গিয়ে বললো, আপনি নাকি জামায়াত করেন, অমুক বললো। এরপর থেকে ওই কর্মকর্তা আমার ফোন ধরেনি। আমিও তাকে আর ফোন দেইনি। যদিও তার উচিত ছিল আমাকে জিজ্ঞেস করা। কথাগুলো আমি আদৌ বলেছি কি না; কিন্তু তিনি তা করেননি। ওই কর্তাব্যক্তির সঙ্গে আমারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরে জানতে পারলাম ঈর্ষান্বিত হয়ে সে ওই কাজ করেছে। আমার এক বাল্যবন্ধু, যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তিন যুগেরও বেশি। ক্লাস ওয়ান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়েছি। কয়েক বছর আগে আমার একটা পারিবারিক বিষয়ে তাকে এলাকায় একটা সালিশে উপস্থিত থাকতে বলেছিলাম। যেদিন ওই সালিশ হওয়ার কথা সেদিন সে আমার ফোনটাই রিসিভ করেনি। এরপর সে একদিন আমাকে দুই বার ফোন দিয়েছিল আমি তার ফোন ধরিনি। তখন থেকে সে আর আমার সঙ্গে যোগাযোগই রাখে না। আরও একজন সহকর্মীর কথা না বললেই নয়, ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯৮ সালে। তখন আমি একটি জাতীয় দৈনিকের অপরাধ বিভাগের প্রধান। ওই সময় তিনি একজনের সুপারিশে আমার কাছে চাকরির জন্য এসেছিলেন। আমার অনুরোধে ওই দৈনিকে তার চাকরিটা হয়। কিন্তু তিনি কখনও স্বীকারই করেন না যে, আমার কারণে ওই সময়ে তার চাকরিটা হয়েছিল। পরবর্তীতে আমার অফিসেও তাকে একাধিকবার নিয়োগ দেয়া হয়। নানা কারণে তিনি আর থাকতে পারেননি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তাকে নানাভাবে সহযোগিতাও করেছি। বিনিময়ে আমি যতবার ক্র্যাব ও ডিআরইউ’র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি, ততোবারই তিনি আমার পক্ষে কাজ না করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছিলেন। আমার জীবনে এরকম ঘটনা অনেক। লিখলে উপন্যাস হয়ে যাবে। এ ভাবেই চলছে জীবন, থেমে নেই, থাকবেও না থেমে। আবার অনেকের কাছ থেকে নানাভাবে সহযোগিতা পেয়েছি, উপকৃতও হয়েছি। যদিও এর সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। এখানে কারোরই নাম উলে¬খ করলাম না, কাউকে ছোট করার বা কষ্ট দেয়ার ইচ্ছে নেই বলে। সংক্ষেপিত।

লেখক: মনজুরুল বারী নয়ন, সম্পাদক ও প্রকাশক ঢাকা প্রতিদিন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *