সোনার হরিণ বিসিএস!

মতামত

ছেলেবেলা থেকেই আমার বই-পত্রিকা পড়ার আগ্রহ আছে। বই মানে অভিভাবকের ভাষায় ‘আউট বই’। কিন্তু গ্রামে বই বা পত্রিকা অত সহজলভ্য ছিল না। আমাদের গ্রামের বাড়ির বাজার শহীদনগরে পাশাপাশি দুটি হোটেলে ইত্তেফাক রাখা হতো। পত্রিকা পড়তে আসা লোকজন চা-নাস্তা করতো, তাতেই তাদের লাভ। আমি অবশ্য চা-নাস্তা করতাম না। কিন্তু নিয়মিত পত্রিকা পড়তে যেতাম। তবে সেটাও নির্বিঘ্নে করা যেতো না। আমি হয়তো মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছি। কিন্তু সিনিয়র কেউ এসে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে পত্রিকা টেনে নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে সিনেমার বিজ্ঞাপন পড়তেন। খুব রাগ হতো। কিন্তু কিছু করার থাকতো না।

চাইলেও বাড়িতে পত্রিকা রাখার উপায় ছিল না। কারণ দুটি পত্রিকার জন্য হকার আসতো না। হকার দাউদকান্দি থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে গৌরিপুর বা ইলিয়টগঞ্জের দিকে যাওয়ার সময় হকার সেই হোটেল বরাবর এসে বাস থেকে পত্রিকা ছুঁড়ে মারতেন। বর্ষাকালে কাদায় পরে মাঝে মাঝে পত্রিকা নষ্ট হতো। যেদিন পত্রিকা পেতাম না, সেদিন খুব মন খারাপ হতো, খবরের আপডেট জানতে না পেরে ছটফট করতাম। তখন তো খবরের বিকল্প কোনো উৎস ছিল না। আশির দশকেও যে শহীদনগরে দুটি পত্রিকা চলতো, এখন সেখানে কয়েকশ পত্রিকা বিক্রি হয়। গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার আড্ডা ছিল মোবারক লাইব্রেরিতে। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে আমি সেখানে বসে বসে অনেক বই পড়ে ফেলতাম।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় আমার আড্ডা ছিল কলেজ রোডের রহমান ব্রাদার্সে। সেই লাইব্রেরিতেও অনেক বই পড়েছি। তাছাড়া কুমিল্লার টাউন হল লাইব্রেরিতেও যেতাম পত্রিকা পড়তে। ঢাকায় আমি বেশি গেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি আর পাবলিক লাইব্রেরিতে। এখন আছে কিনা জানি না, ওসমানী উদ্যানের ভেতরের মহানগর পাঠাগারও আমার খুব প্রিয় গন্তব্য ছিল। লাইব্রেরির ভেতরের শান্ত নিরিবিলি পরিবেশটি সবসময় আমার ভালো লাগে। নৈঃশব্দ সবসময়ই আমার প্রিয়। লাইব্রেরির নৈঃশব্দ আমাকে দু’দণ্ড শান্তি দেয়।

অনেকদিন আর লাইব্রেরিতে যাওয়া হয় না। আগের মত পড়ার সময় পাই না। তবে কোনো বই পড়তে চাইলে চট করে রকমারি থেকে আনিয়ে নেই। মাঝে মাঝেই ভাবি একদিন লাইব্রেরিতে যাবো। কিন্তু খবর-টবর যা পাই, তাতে চাইলেই লাইব্রেরিতে যাওয়া সম্ভব। এখন নাকি ভোর রাত থেকে লাইব্রেরির সামনে লাইন থাকে। লাইব্রেরি খোলার সাথে সাথেই সব আসন পূর্ণ। যারা এমন ব্যাকুল হয়ে যারা লাইব্রেরিতে যান তাদের নিয়ে অনেকে ট্রল করেন। কারণ লাইব্রেরিতে তারা জ্ঞানের খোঁজে নয়, আসলে যান চাকরির খোঁজে। কেউ কেউ ট্রল করলেও আমার কিন্তু খারাপ লাগে না। লক্ষ্য যাই হোক, তারা তো লাইব্রেরিতেই যাচ্ছে, সেখানে তো বইই পড়ছে, পড়ুক না। আমার খালি আফসোস হয়, লাইব্রেরির সেই শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশটা বোধহয় আর পাবো না।

শুধু লাইব্রেরিতেই ভিড় তা নয়, আমাদের মানসিকতায়ও অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে। সবার সব পড়াশোনা এখন বিসিএসকেন্দ্রিক। এই যে কোটা বাতিলের আন্দোলন এবং তাতে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সেও কিন্তু বিসিএস’এর কারণেই। লাইব্রেরিতে গিয়ে সবাই বিসিএস’এর প্রস্তুতি নিচ্ছে, গাইড বই মুখস্থ করছে। নীলক্ষেতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা হলো বিসিএস গাইডের।

বিসিএস নিয়ে সবার আগ্রহ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, আমাদের ‘এইম ইন লাইফ’এর তালিকায় বিসিএস এখন সবার শীর্ষে। কে, কীভাবে পড়াশোনা করে টিকেছেন, কাকে কতটা তীব্র লড়াই করতে হয়েছে- সবই এখন নিউজ আইটেম। বিয়ের বাজারে বিসিএস পাত্রই এখন নাম্বার ওয়ান। বিসিএস’এ আবেদনকারীর সংখ্যা প্রতিবছর নতুন রেকর্ড গড়ছে। ৪১তম বিসিএসে ২ হাজার ১৩৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার জন! ৪০তম বিসিএসে রেকর্ড আবেদনকারী ছিলেন ৪ লাখ ১২ হাজার জন। এর আগে ৩৮তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩২ জন, ৩৭তম বিসিএসে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪৭৬ জন।

তখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিসিএস ক্যাডারের চেয়ে নীরু-বাবলু-অভিদের মতো আর্মস ক্যাডারদের গ্ল্যামার ছিল বেশি। তখন অল্পসংখ্যক যারা সরকারি চাকরি করতে চাইতেন, তাদের যুক্তি ছিল, বেতন কম হলেও সরকারি চাকরিতে নিশ্চয়তা আছে, পেনশন আছে, চাকরি যাওয়ার ভয় নেই। ১০ বছর আগেও বিসিএস এত লোভনীয় ছিল না, অন্তত বেতনের অঙ্কে। এখন পুরো পরিস্থিতিটা বদলে গেছে।

গত এক দশকে হুট করে সরকারি-বেসরকারি চাকরির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি চাকরি একবার হলে আর সহজে যায় না, বেতন নিয়মিত, প্রমোশন-ইনক্রিমেন্ট নিশ্চিত, চাকরি শেষে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ড- সব মিলিয়ে নিশ্চয়তা ছিল বলেই কম বেতনকেও মেনে নিতেন সরকারি চাকুরেরা। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরি, বিশেষ করে কর্পোরেট চাকরিতে বেতন, সুযোগ-সুবিধা লোভনীয়, কিন্তু চাকরি নির্ভর করে বসের ইচ্ছার ওপর। একদমই বসের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চাকরি, প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট।

বেতন যত বাড়ে, চাকরি হারানোর শঙ্কাও তত বাড়ে। আর চাকরি শেষে একদম খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। এক জায়গায় বেতন কম, কিন্তু নিশ্চয়তা আছে। আরেকদিকে বেতন বেশি, কিন্তু চাকরি কচু পাতার পানির মত টলোমলো। কিন্তু গত এক দশকে সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়তে বাড়তে অনেক আগেই বেসরকারি চাকরিকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন বরং উল্টো বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বেতন বেশি, নিশ্চয়তা আছে, ক্ষমতা আছে, সুযোগ-সুবিধা আছে; তাহলে আর বিসিএস নয় কেন? তাই সবাই এখন ছুটছে বিসিএস’এর সোনার হরিণ ধরতে।

বৈষম্যটা শুধু সরকারি-বেসরকারি চাকরির মধ্যেই নয়। সরকারি চাকরির মধ্যেও রয়েছে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য। বিসিএস উত্তীর্ণ হওয়াদের মধ্যে পছন্দের শীর্ষে প্রশাসন। এরপর আছে পররাষ্ট্র, পুলিশ, কর, কাস্টমস ইত্যাদি। চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, শিক্ষা ক্যাডার যেন দুয়োরাণী। এগুলো হলো দুধভাত ক্যাডার, কেউ পাত্তা দেয় না, ভয় পায় না। সুযোগ-সুবিধায় আকাশ-পাতাল ফারাক। এইবার করোনাকালে আমলারা যেভাবে দেশ চালাচ্ছে, তাতে আগামীতে বিসিএস’এ প্রশাসনের চাহিদা আরো বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। সবাই বুঝে গেছেন, সব ক্ষমতা আমলাদের হাতে।

আন্তঃক্যাডার প্রবল বৈষম্যের কারণে গত কয়েকবছর ধরে একটা দুঃখজনক প্রবণতা শুরু হয়েছে। ডাক্তার, প্রকৌশলী বা কৃষির মত বিশেষায়িত পেশার লোকজনও বিসিএস’এ নিজেদের একাডেমিক ক্যাডার বাদ দিয়ে সাধারণ ক্যাডারে চলে আসছে। প্রতিবছরই এই সংখ্যা বাড়ছে। ভবিষ্যতে হয়তো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়াররা তাদের সারাজীবনের সব পড়াশোনা ভুলে ডিপ্লোম্যাসি করবে বা প্রশাসন চালাবে। তাহলে তারা এতদিন কষ্ট করলেন কেন? বিশেষ পেশার ছাত্রদের পড়াতে আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লাগে, একেকটার বিনিয়োগ একেক রকম। সাধারণ শিক্ষার চেয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ বানাতে বেশি টাকা লাগে। কিন্তু তারা যদি শেষমেষ প্রশাসনেই চলে আসেন, তাহলে পুরো বিনিয়োগটাই জলে যায়।

সাধারণত সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিঙে পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু বিসিএস দেয়ার পর সেই মেধাবীরাই পেছনে পড়ে যায়। ক্লাশরুমে যারা সামনের বেঞ্চের, চাকরিতে তিনিই ব্যাকবেঞ্চার। প্রশাসন ক্যাডারে যারা চাকরি পান তাদের মাঠ পর্যায়ে প্রথম পদ হয় সহকারী কমিশনার, সেখানে তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকে। চাকরি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা পদোন্নতি পান সিনিয়র সহকারী কমিশনার হিসেবে। এই পদে থেকেই অনেকে দায়িত্ব পান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। আর প্রশাসন ক্যাডারের যারা সচিবালয়ে পোস্টিং পান, তাদের প্রথম পদ সহকারী সচিব এবং এরপর সিনিয়র সহকারী সচিব। এরপর উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব, সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ধাপে ধাপে আকাশ ছোঁয়ার সুযোগ।

পদোন্নতির পাশাপাশি শুরু থেকেই তারা নানা সুযোগ-সুবিধা পেতে থাকেন। অন্যদিকে বিসিএস উত্তীর্ণ ডাক্তাররা প্রথম যোগ দেন সহকারী সার্জন বা জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে তাদের পোস্টিং হয়। কিন্তু এরপর প্রমোশন পেতে তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। উচ্চশিক্ষা নিতে পারলেই সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ। নইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল বা সিভিল সার্জন অফিসে ঘুরে ঘুরেই চাকরি শেষ করতে হয়। চাকরির পাশাপাশি উচ্চতর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। ডিগ্রি পেতে পেতে অনেকের ৮/১০ বছর লেগে যায়। এমনও হয় ডাক্তারদের জুনিয়র অনেকে ইউএনও হয়ে এসে তাদের দন্ডমুন্ডের কর্তা বনে যান। একবার শুধু ভাবুন ইউএনও আর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা; ডিসি আর সিভিল সার্জন, সচিব আর অধ্যাপক। আমি কোনো মন্তব্য করবো না, আপনারাই বলুন, এরপর কেন আপনি আপনার সন্তানকে ডাক্তার বানাতে চাইবেন? সুযোগ থাকলে আপনি ডিসি হবেন না সিভিল সার্জন?

আমি প্রশাসন ক্যাডারের দোষ দিচ্ছি না বা তাদের অবজ্ঞাও করছি না। দেশ চালাতে দক্ষ, সৎ, যোগ্য, মেধাবী আমলা অবশ্যই দরকার। তবে শুধু আমলা দিয়ে তো আর দেশ চলবে না। যার যার কাজটা তাকে তাকে করতে হবে। সব খাতেই দক্ষ লোক দরকার। ডাক্তাররা চিকিৎসা দেবে, ইঞ্জিনিয়াররা অবকাঠামো উন্নয়ন করবে, পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে, প্রশাসকরা দেশ চালাবে। কিন্তু অবস্থাটা এমন জায়গায় চলে গেছে সুযোগ থাকলে বিশেষায়িত শিক্ষার সবাই সাধারণ বিসিএস’এ চলে আসবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অবশ্য সরকারের কিছুই করার নেই। স্নাতক পাস যে কেউ বিসিএস’এ অংশ নিতে পারে। টিকে গেলে যোগ্যতা অনুযায়ী ক্যাডার পাবে, এখানে পিএসসির হাত নেই। তবে সরকারকে এই বৈষম্য দূর করার অবশ্যই একটা উপায় বের করতে হবে।

লেখক: প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *