সৌরশক্তিতে মনোযোগ, কয়লায় আগ্রহ হারাচ্ছে সরকার

অর্থ-বাণিজ্য জাতীয়

অনলাইন ডেস্ক: এক দশক আগেও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ভাবনায় গুরুত্ব পেয়েছে কয়লা। তখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেসরকারি খাতের একের পর এক বিনিয়োগ প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ খাতের বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও জ্বালানি হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে কয়লা। অন্যদিকে অনেকটাই গুরুত্বহীন ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি। পরিকল্পনার দিক থেকেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লবিস্টদের দাপটে অনেকটাই ব্যাকফুটে ছিলেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমর্থকরা।

এক পর্যায়ে দেখা গেল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ কারণে অনেক বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। অন্যদিকে দূষণ নিয়ন্ত্রণের তাগিদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার কমানোরও জোর দাবি উঠছে বিশ্বব্যাপী। জ্বালানিটি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোও।

পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের। এ কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমর্থকরাও এখন আর এর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে পারছেন না। সরকারের কাছেও জ্বালানি হিসেবে দিন দিন আবেদন হারাচ্ছে কয়লা। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও সম্প্রতি এক ওয়েবিনারে জানিয়েছেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কীভাবে সরে আসা যায়, সরকার এখন সে বিষয় বিবেচনা করে দেখছে।

বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা ও ব্যবহার বাড়ছে। এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। ব্যক্তি খাতের হেভিওয়েট উদ্যোক্তারাও এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। এক্ষেত্রে সৌরশক্তিতেই (সোলার) তাদের মনোযোগ বেশি। সরকারের পরিকল্পনায়ও এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সৌরশক্তি নিয়ে নতুন করে রোডম্যাপ তৈরি করেছে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। পরিকল্পনার খসড়া এরই মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৮ হাজার ৭৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর স্থাপিত সোলার থেকে আসবে ৩ হাজার মেগাওয়াট। রুফটপ সোলার, মিনিগ্রিড, সোলার হোম সিস্টেমসহ অন্যান্য উৎস থেকে আসবে আরো সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে সোলার থেকেই ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে স্রেডার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দীন বলেন, সোলার নিয়ে আলাদাভাবে পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ সোলার প্রযুক্তির খরচ কমে এসেছে। খরচ কম হওয়ায় অনেকে এ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি আসবে। জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমে যাবে। বিশ্ব যেদিকে যাবে আমাদেরও তো সেদিকে যেতে হবে। বাংলাদেশে যে পরিমাণ পতিত জমি রয়েছে, সেসব জায়গায় সোলার স্থাপন করে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। এরই মধ্যে সোলার নিয়ে মহাপরিকল্পনার খসড়া আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি।

এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। টেকনাফে নাফ নদীর তীরে ১১৬ একর জমিতে কার্যক্রম শুরু করেছে টেকনাফ সোলারটেক এনার্জি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিনই ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। যদিও প্লান্টটির সর্বোচ্চ সক্ষমতা ২৮ মেগাওয়াট। এছাড়া ময়মনসিংহে মোট ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ছোট-বড় আরো অন্তত ২০টিরও বেশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

প্রাক্কলন অনুযায়ী সোলার থেকে বিদ্যুৎ পেতে দেশের মোট ১৪টি জেলা ও অঞ্চলকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছে। তিনটি বৃহৎ নদী পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার চরাঞ্চলকে সোলার প্লান্ট স্থাপনে কাজে লাগানো হবে। এসব জেলার ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার নদীর চর সোলার প্লান্ট স্থাপনে কাজে লাগানো হবে।

সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে এ পরিকল্পনার সুফলপ্রাপ্তি নিয়ে আশাবাদী জ্বালানি-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের দিক থেকে প্রতিবেশী ভারত এরই মধ্যে বেশ এগিয়েছে। বর্তমানে ভারত ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আড়াই রুপি খরচ করছে। যেখানে বাংলাদেশের খরচ হচ্ছে ১০-১২ টাকা করে।

বেসরকারি খাতের হেভিওয়েট উদ্যোক্তারাও এখন সোলারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বেক্সিমকো। শরিয়াহভিত্তিক সুকুক বন্ডের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে কোম্পানির সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান তিস্তা সোলার লিমিটেড ও করতোয়া সোলার লিমিটেডে এ অর্থ বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে কোম্পানিটি।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশ্যা, সৌরবিদ্যুতে বেক্সিমকোর বড় এ বিনিয়োগের ঘোষণা নবায়নযোগ্য খাতে আরো অনেক বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করবে। বিশাল এ বিনিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেক্সিমকো লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান  বলেন, সরকার মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি পরিবেশবান্ধব। উৎপাদনের খরচও কম। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সারা বিশ্বেই এক ধরনের উদ্বেগ বিরাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। তাই সারা বিশ্বের মতো আমরাও ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের ওপর নজর দিচ্ছি। আমাদের সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জামাদি আনা ছাড়া অন্যান্য কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ একসময় বেশ ব্যয়বহুল ছিল। বিশেষ করে সোলারে ব্যয় হতো অনেক বেশি। এখন সেটি কমে এসেছে। সারা বিশ্ব এ খাতে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশও করতে পারে। আগামীতে বাজারে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি আসবে। এসব গাড়ির জন্য নতুন বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। যে কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আকৃষ্ট হচ্ছেন।

তাদের ভাষ্যমতে, আগামীর বিশ্বে গ্রিন এনার্জির চাহিদা হবে সবচেয়ে বেশি। ফলে বিনিয়োগকারীরাও সেদিকেই ঝুঁকবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া সরকারও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দিচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারের মোট ৫৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিকল্পনাধীন রয়েছে। এসব এলাকায় সোলার পার্ক নির্মাণের পাশাপাশি ছোট ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

তবে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এগিয়ে গেছে ভারত। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবেশী দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চতুর্থ অবস্থানে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বায়ুশক্তি ও সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে পঞ্চম অবস্থানে। চলতি বছরও নবায়নযোগ্য খাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ভারত ঈর্ষণীয়ভাবে এগিয়ে গেছে। এ খাতে তারা এখন বিশ্বে চতুর্থ। ভারতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তাদের দেশে মরুভূমি আছে। যেসব এলাকায় সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। সেখানে তারা বড় বড় সোলার পার্ক স্থাপন করেছে। যেটা আমাদের দেশে নেই। তিনটি সুবিধার কারণে সোলারে তারা  এগিয়ে গেছে। যেসব এলাকায় সোলার বসিয়েছে সেসব এলাকার জমির কোনো মূল্য নেই। দ্বিতীয়ত প্রচুর সূর্যের আলো পায় তারা। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে আমরা সারা দিনে সাড়ে ৪ ঘণ্টা সূর্যের আলো পাই। ওরা পায় আট-নয় ঘণ্টা। ফলে আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ সূর্যের আলো পায় তারা।

তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে স্রেডার এ মহাপরিকল্পনা সময়োপযোগী বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠাগুলোর অনেকে। তারা বলছেন, উন্নত বিশ্ব সোলার প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। আমাদেরও সময় এসেছে নবায়নযোগ্য খাতে মনোযোগ দেয়ার। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুল হক বলেন, সোলার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা যেতেই পারে। এ খাতে আমাদের এখন দক্ষ জনবল গড়ে উঠেছে। প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জির (আইরিনা) গত বছরের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এ খাতে ১ লাখ ৩৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিশ্বে মোট ১৬১ দেশের মধ্যে এ খাতে কর্মসংস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এখানে শীর্ষস্থান এখন চীনের।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সংস্থাটির এক প্রতিবেদন বলছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট বিদ্যুতের ৭২ শতাংশ হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। যার মধ্যে ৩৫ শতাংশ আসবে সোলার থেকে, ২৪ শতাংশ বায়ু ও সাড়ে ১২ শতাংশ আসবে পানি থেকে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *