স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বীর

সারাবাংলা

রফিকুজ্জামান, চাটখিল থেকে
শহীদ আবুল বাশার (জন্ম : ১৯৩৩-মৃত্যু: ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয়। তবে একটি কথা না বলে পারছি না শুধু খেতাব দিয়ে এ মহান শহীদের ঋণ আমরা কখনো পরিশোধ করতে পারবো না। এসব শহীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছি। তাদের ঋণ আমাদের পক্ষে কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। শহীদ আবুল বাশারের জন্ম চাটখিল উপজেলার বদলকোট গ্রামে। বিখ্যাত শিক্ষাবিদ মরহুম হযরত তায়ীন উল্যাহ মুন্সী পরিবারের সন্তান তিনি। এ বংশের অন্যতম পূর্ব পুরুষ বাংলার মধ্য যুগের রাজধানী সোনারগাঁওুয়ের হযরত শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রহঃ)। যিনি বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। যেখানে উচ্চতর হাদীস শাস্ত্রের পাশাপাশি গনিত, যুক্তিবিদ্যা, রসায়ন, ভূগোল, ইতিহাস, চিকিৎসা শাস্ত্র ইত্যাদি পড়ানো হতো। শহীদ বাশারের পিতার নাম মরহুম আবদুল লতিফ মুন্সী এবং মরহুমা মায়ের নাম তাজকেরার নেছা। স্ত্রীর নাম রৌশনারা বেগম। দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআরে) চাকরি করতেন আবুল বাশার। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লা উইংয়ের। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তার কলিজার টুকরো শিশু সন্তান, প্রিয়তমা স্ত্রী এবং পিতা-মাতার সঙ্গে দেখা করে সময় নষ্ট না করে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেন।
১৯৭১ সালের ৯ মে যুদ্ধের প্রথম দিকে কুমিল¬া জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার অন্তর্গত বিবির বাজার ছিল কুমিল্লা শহর থেকে ছয় কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে। এর অবস্থান ছিল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। প্রতিরোধ যুদ্ধের পর কুমিল্লা অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা সমবেত হন বিবির বাজারে। কুমিল্লা শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের বিবির বাজার ক্যাম্পে আক্রমণ করতে থাকে। কয়েকবার সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। প্রতিবারই মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানি সেনাদের সাহসী প্রতিরোধ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিহত করতে সক্ষম হন। বিবির বাজারের প্রতিরক্ষা অবস্থানে বেশির ভাগ ছিলেন ইপিআর সদস্য। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান। আবুল বাশার একজন সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বাংকারে সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। ৯ মে সকাল থেকেই শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ। গোলা এসে পড়তে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে। ঘণ্টা দুই পর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে পেলেন দূরে একদল পাকিস্তানি সেনা। তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের দিকে ক্ষিপ্ত গতিতে এগিয়ে আসছে। সংখ্যায় তারা অনেক ছিলেন। আবুল বাশার ও তার সহযোদ্ধারা ভয় পেলেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ভারী অস্ত্র তেমন নেই। একটি মেশিনগান, তিন-চারটি এলএমজি। বাকিগুলো সাধারণ অস্ত্র। অগ্রসরমান পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের আওতায় আসা মাত্র গর্জে উঠল তাদের অস্ত্র। কিন্তু পাকিস্তানিদের ভারী অস্ত্রের দাপটে মুক্তিযোদ্ধারা কোণঠাসা হয়ে পড়লেন। এক পর্যায়ে শুরু হলো স্থল হামলার পাশাপাশি বিমান হামলা। পাকিস্তানি বিমান আকাশ থেকে গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা অনেকে পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হলেন। আবুল বাশারসহ কয়েকজন মনোবল হারালেন না। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানিদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারলেন না। বিমান থেকে ছেুাঁড়া কয়েকটি গুলি এসে লাগলো তার মাথায়। ঢলে পড়লেন মাটিতে। শহীদ হলেন তিনি। সে দিন যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর আবুল বাশারসহ কয়েকজন শহীদ ও ১০-১২ জন আহত হন। পাকিস্তানি সেনাদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরে সহযোদ্ধারা দেশ মাতৃকার সাহসী সন্তান আবুল বাশারের লাশ উদ্ধার করে বিবির বাজারে সমাহিত করেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *