স্বাস্থ্যবিধি মানুন, সুস্থ থাকুন

মতামত

বিভিন্ন শপিংমল, সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের গায়ে সাঁটানো একটা লেখা চোখে পড়ে অনেক সময়। সেটা হচ্ছে- স্বাস্থ্যবিধি না মানলে মৃত্যুঝুঁকি আছে। খুবই সঠিক এবং বাস্তব কথা। ঠিক জানি না-তবে বিষয়টা কি এমন যেন দেখতে দেখতে এটা চোখ সওয়া হয়ে গেছে অনেকের? নাকি মৃত্যুঝুঁকিকেও আমরা সচেতনভাবেই পাত্তা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না? করোনার এমন বাড়বাড়ন্ত সময়ে অনেকের হাবভাব দেখলে অন্তত তেমনটাই মনে হতে পারে। মনে হতে পারে-মরে গেলে মরে যাব তাই বলে কি স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে!

ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হয়েছে প্রায় দেড় মাসের মতো হয়ে গেল। শুরুতে ভ্যাকসিন নিয়ে ভীতি থাকলেও পরে সেটা দূর হয়ে যায়। মানুষ ভ্যাকসিন নিতে শুরু করে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দিনকে দিন ভ্যাকসিন নেয়ার হার কমছে। অথচ করোনাকে প্রতিরোধ করতে হলে আমাদের দুটো কাজ করতেই হবে। এক. স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে; দুই. ভ্যাকসিন নিতে হবে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এ দুটোর কোনোটাই আমরা ঠিকঠাকভাবে করছি না। নাগরিক হিসেবে আমরা যদি এতটুকু দায়িত্ব পালন করি, সচেতন থাকি তাহলে করোনা রুখে দেয়া যে সম্ভব সেটা মনে হয় বিগত এক বছরে আমরা সবাই জেনে গেছি। প্রশ্ন হচ্ছে- তাহলে দায়িত্বটুকু পালন করছি না কেন আমরা? কেন এত ওজর-আপত্তি স্বাস্থ্যবিধি মানতে?

এখন করোনা বাড়তে থাকায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে সিট সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। গত বছরও কিন্তু এমন হয়েছিল। একসাথে অনেক মানুষ আক্রান্ত হলে যা হয় আর কি! উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে-করোনায় এখন অপেক্ষাকৃত তরুণরাও আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। যারা বয়স্ক, অসুস্থ এবং আগে থেকেই শারীরিক জটিলতা আছে তাদের করোনা হলে অবস্থা কতটা গুরুতর হতে পারে তা তো আমাদের জানাই আছে। তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে আমাদের এত অনীহা কেন?

ধারণা করা হচ্ছে, করোনা তার রূপ বদলে ফেলেছে। ইউকে, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনা তার রূপ বদল করে যে আরো বেশি সংক্রামক হয়ে উঠেছে সেটাও করণীয় আমাদের একটাই এখন। সেটা হচ্ছে-সতর্ক থাকা।

করোনা ঠেকাতে লকডাউন যে তেমন ফলপ্রসূ কোনো বিষয় নয় সেটাও তো পরিষ্কার। ফলে আমাদের অসতর্কতা ও অসচেতনতায় যদি করোনা বাড়তে থাকে বা আরো বেশি করে ছড়িয়ে পড়ে তখনও হয়তো আর লকডাউনে ফেরা সম্ভবপর হবে না। কারণ এর সাথে মানুষের জীবিকা জড়িত। কাজ না থাকলে পেটে খাবার আসবে কোথা থেকে? ফলে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় লকডাউনের মতো বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো দিয়ে মানুষকে বন্দি না করে, তাদের জীবিকাহীন না করে বরং এখনই প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।

গণপরিবহনে এখন আর স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। বাধ্যতামূলক মাস্ক পরা হচ্ছে না। শপিংমল, বাজারগুলোতে ভিড় আছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক নেই। রাজনৈতিক সভাসমাবেশ হচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে। বিয়ে শাদী হচ্ছে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন তোয়াক্কা নেই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। করোনা ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্তের হার বাড়ছে। সেই সাথে মানুষ মরছে। এসব এখনই বন্ধ করা দরকার।

স্বাস্থ্যবিধি বলতে তো সাকুল্যে দুটো কাজ। এক. মাস্ক পরতে হবে। মুখের সাথে সুন্দর করে টাইট করে পরতে হবে। ঢিলেঢালা করে পরলে হবে না। দুই. হাত স্যানিটাইজ করতে হবে বা ধুঁতে হবে সাবান দিয়ে। এ দুটো কাজ করা কি খুব কঠিন? এখন তো মাস্কের কোনো সঙ্কট নেই। স্যানিটাইজারও আছে। তাহলে বাইরে যখন বের হচ্ছেন তখন কেন মাস্ক পরছেন না? অথবা মাস্ক নামিয়ে থুতনির নিচে রাখছেন? মাস্ক তো দেখানোর বিষয় নয়। আপনি এটা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরবেন আপনাকে নিরাপদ রাখার জন্য। বাইরে বের হলে নানা জিনিসে তো হাত দিতেই হয়। তাহলে সাথে করে স্যানিটাইজার নিচ্ছেন না কেন? এ দুটো কাজ ঠিকঠাকভাবে করলে তো করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না প্রায় বললেই চলে।

আসুন সবাই স্বাস্থ্যবিধি মানি যতদিন না করোনাকে আমরা বাগে আনতে পারছি। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের জন্য প্রয়োজনে সরকারকে কঠোর হতে হবে। এ বিষয়ে শিথিলতা দেখানোর কোনো সুযোগ আপাতত তো নেই। করোনাকে রুখতে যা যা করণীয় তাই করতে হবে নির্মোহভাবে।

লেখক : ডা. পলাশ বসু , চিকিৎসক ও শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক এনাম মেডিকেল কলেজ।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *