হলুদের আলপনা

সারাবাংলা

খন্দকার আনিসুর রহমান, সাতক্ষীরা থেকে:
সরিষার ফুলের চাঁদরে বিস্তীর্ণ মাঠ ঢেকে গেছে। প্রান্তরজুড়ে উঁকি দিচ্ছে শীতের শিশির ভেজা সরিষা ফুলের দোল খাওয়া গাছ। সরিষার সবুজ গাছের হলুদ ফুল শীতের সোনা ঝরা রোদে ঝিকিমিকি করছে। এ এক অপরূপ দৃশ্য। যেন প্রকৃতিকন্যা সেজেছে হলুদ বরণ সাজে। যতদূর চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ। চির সবুজের বুকে এ যেন কাঁচা হলুদের আলপনা। সরিষা ফুলের মৌ মৌ গন্ধে মুখরিত ফসলের মাঠ। এবার সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৯ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি রবি মৌসুমে হেক্টর প্রতি ১৩৫ টন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। জেলার সাত উপজেলার এক লাখ ৮০ হাজার ৫৪০ জন কৃষকের ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ১৫ হাজার ৫২৫ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে চার হাজার ৯৯৫ টন, কলারোয়ায় পাঁচ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে সাত হাজার ৪৩৯ টন, তালায় ৪৬০ হেক্টর জমিতে ৬২১ টন, দেবহাটায় এক হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে এক হাজার ৫২৫ টন, কালিগঞ্জে ৪৫০ হেক্টর জমিতে ৬০৮ টন, আশাশুনিতে ১৯০ হেক্টর জমিতে ২৫৬ টন ও শ্যামনগরে ৬০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষে ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮১ টন।
কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৮০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ কমে সাতক্ষীরা সদরে তিন হাজার ৫২০ হেক্টর, কলারোয়াতে এক হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ কমে তিন হাজার ৭০০ হেক্টর, দেবহাটায় ১৮০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ কমে ৯৫০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ১৫০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ কমে ৩৫০ হেক্টর ও শ্যামনগরে কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পাঁচ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ কমে ৫৫ হেক্টর জমিতে এবার সরিষার চাষ হয়েছে।
তবে জেলার সাত উপজেলার ভিতরে পুাঁচ উপজেলা সরিষা চাষে কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পিছিয়ে থাকলেও বাকি দুই উপজেলা তালা ও আশাশুনিতে কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৪৬০ ও ১৯০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে জেলা কৃষি অফিস আট হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। তবে সাতক্ষীরায় সরিষা চাষ লাভজনক ফসল হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে চাষ হয় ৯ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে। পরবর্তীতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে ২৬ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ বেশি হয়ে মোট চাষাবাদ হয় নয় হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় কয়েকশ হেক্টর জমিতে আবাদ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার চাষাবাদ হয়। তবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বিগত অর্থ বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ কমে যেয়ে নয় হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষাবাদ হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় এবছর চাষাবাদ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অসময়ের বৃষ্টি, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন কারণকে দায়ী করছে কৃষি বিভাগ। এ বছর সরিষার চাষাবাদ কম হলেও কলারোয়া, সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায়, কৃষকদের আবাদকৃত জাতের মধ্যে রয়েছে বারি ৯, ১৪, ১৫ ও ৪, টরি-৭ ও স্থানীয় জাত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বারি-১৪ ও ১৫ জাতের সরিষার চাষ।
সরিষা চাষ লাভজনক হওয়ায় চাষিরা এখন ঝুঁকে পড়ছেন সরিষা চাষে। কেউবা সরিষার বীজ তৈরি করেও লাভবান হচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সাতক্ষীরায় সরিষার চাষে ভালো ফলনের আসা করছেন কৃষকরা। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (খামারবাড়ি) উপ-পরিচালক নুরুল ইসলাম জানান, এ বছর জেলায় সরিষা চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। তবে একদিকে করোনার সংক্রমণ, অন্যদিকে চলতি বছরে বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে কৃষকদের মূলধন কমে যাওয়ায় নয় হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষাবাদ হয়েছে। তবে অল্প সময়ে উচ্চ ফলনশীল সরিষা চাষে অধিক ফলন পাওয়ায় কৃষকরা সরিষা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ফলে দিনে দিনে লাভজনক ফসল হিসেবে সরিষার কদর বেড়েছে জেলার কৃষকদের কাছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *