সারাবাংলা

শফিকুল ইসলাম কুদ্দুস, নেত্রকোনা থেকে:
নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মাঠে মাঠে সবুজের সমারোহ। কৃষকের মূখে ছিল হাসির ঝিলিক। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল গরম হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে। তড়িগড়ি করে হাওরাঞ্চলে ফসলবক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ করা হয়েছে। বাঁধ সংস্কার কাজে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। ফসলহানীর আশংকায় হাওরপাড়ের কৃষকরা পাকা ও আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তুলছেন।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ হাওরাঞ্চল। এ ছাড়া কলমাকান্দা ও বারহাট্টা উপজেলায় আংশিক এলাকা হাওরাঞ্চল রয়েছে। এসব হাওরের সারা বছরের একমাত্র ফসল বোরো। জেলায় ছোট বড় ১৩৪টি হাওর রয়েছে। এর মধ্যে খালিয়াজুরীতেই আছে ৮৯টি হাওর। হাওরাঞ্চলে ৩১০ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ। বাঁধের ওপর স্থানীয় কৃষকদের ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ফসলের আবাদ নির্ভর করে। এবার জেলায় ফসল রক্ষার জন্য ১৬১টি পিআইসির গঠন করা হয়। এর মধ্যে কলমাকান্দায় ৯টি, বারহাট্টায় তিনটি, আটপাড়ায় একটি, মদনে ২৪টি, মোহনগঞ্জে ১৮টি ও খালিয়াজুরীতে ১০৬টি পিআইসি আছে। ওই সমস্ত পিআইসিগুলোর আওতায় ১৪৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধে মাটি কাটার কাজ করা হয়েছে। ওই সমস্ত প্রকল্পের বেশীরভাগ কাজ করছেন স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মী, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং তাদের লোকজন। বিলম্বে কাজ শুরু করে নির্ধারিত সময়ের পর শেষের দিকে তড়িগড়ি করে কাজ শেষ করেন তারা। এতে করে বৃষ্টি হলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ ঘুরে দেখা গেছে, ওই সব বাঁধে মাটি কাটা হলেও কোনটিতে নিয়মত ড্রেসিং করা হয়নি। আবার কোনটিতে মাটি দেয়া হয়েছে কম। মাটি ধরে রাখার জন্য ঠিকমত দুবরা ঘাস লাগানো হয়নি। বাঁধের নীচ থেকে ভোকু দিয়ে মাটি কেটে বাঁধে দেওয়া হয়েছে। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে মাটির পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে বালি। খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর ইউনিয়নের ঢালার হাওরের কাজ সম্পন্ন হয়নি। অনেকটা জায়াগয় মাটি ফেলা হয়নি। এতে করে হাওরে পানি প্রবেশ করলে ওই বাঁধের আওতায় জগন্নাথপুর, মেন্দিপুর, রসুলপুর, ইসলামপুরের বিস্তৃর্ণ এলাকার ফসলের ক্ষতি হবে। এমনকি মদন পর্যন্ত পানি প্রবেশ করে ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাবে। এলাকার একাধিক কৃষক জানান, জেলার হাওরাঞ্চল হিসেবে খ্যাত খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন উপজেলা। ওই তিন উপজেলায় বোরোই একমাত্র ফসল। ওই ফসলেই হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা ও আচার অনুষ্ঠান চলে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জসহ ১০ উপজেলায় বোরো ফসলের আবাদ ভালই হয়েছিল। হাওরাঞ্চলসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ফসলের মাঠে সবুজের সমারোহ ছিল। হঠাৎ করে গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা রাতে জেলার ১০ উপজেলার ওপর দিয়ে দমকা গরম হাওয়া বয়ে যায়। এতে খালিযাজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ উপজেলার উঠতি বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। জেলায় ১৫ হাজার হেক্টরের অধিক বোরো ফসলি জমির ধান নষ্ট হয়ে যায়। এর দু’দিন পরই ফের জেলার বিভিন্ন উপজেলার ওপর দিয়ে শিলাবৃষ্টি বয়ে যায়। এতে করে জেলার কলমাকান্দা, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জে বোরো ফসলি জমির ক্ষতি হয়। কৃষকরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তারা বহুকষ্টে উৎপাদিত একমাত্র বোরো ফসল আর হারাতে চান না। জমিতে থাকা পাকা আধাপাকা ধান কেটে ফেলছেন। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট অফিসের স্থানীয় কর্মচারীদের আত্নীয়, এলাকার সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতারা নিজের নামে ও অন্যের নামে একাধিক প্রকল্প নিয়ে যেনতেনভাবে বাঁধের সংস্কার কাজ করেছেন। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না। হাওরে পানি প্রবেশ করলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে জরিপকাজ চালানোর পর প্রাক্কলন ও পিআইসি গঠন করতে হয়। আর ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করে তা ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। পরে তড়িগড়ি করে বাঁধের সংস্কার কাজ করা হয়। বাঁধগুলো সংস্কারের জন্য এ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। খালিয়াজুরীর মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক হক মিয়া বলেন, আমাদের ঢালার হাওরের বাঁধ সম্পূর্ন না হওয়ায় হাওরে পানি ঢুকলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তলিয়ে যাবে আমাদের বহু কষ্টে উৎপাদিত ফসলের জমি। উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক আসন আলী ও কৃষাণী সবুরী বলেন, আমাদের ক্ষতি হলে কার কি আসে যায়। সরকার আমাদের জন্য টাকা দেয়, পেট ভরে নেতারার। সরকারের দেওয়া সুবিধা আমাদের মত মানুষের কোন কাজে আসে না। মোহনগঞ্জের মোহনপুর গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া বলেন, গরম হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে দুই দফা আমাদের ফসল নস্ট হয়ে গেছে। আমরা আর ফসল হারাতে চাই না। মাঠের কাঁচা পাকা ধান কেটে ঘরে তুলছি। আবার যদি বন্যা এসে বাকি ফসল পানিতে তলিয়ে যায় এই ভয়ে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহন লাল সৈকত জানান, হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। হাওরাঞ্চলে ফসল কাটা শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে মোহনগঞ্জে ৫০ ভাগ ফসল কাটা হয়ে গেছে। আগাম বন্যায় ফসলহানীর আশঙ্কা খুবই কম।
নেত্রকোনার ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান জানান, ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ভাল হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় ত্রুটি আছে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সংস্কার কাজ পরিদর্শণ করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *