বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর, আদালত ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা থানায় দায়ের হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট এর আয়োজনে সংস্থার বনশ্রী, রামপুরা কার্যালয়ে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় সহযোগিতা করে নারী উন্নয়ন শক্তি, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম, ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, ডোমেস্টিক ওয়ার্কার এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং লোকাল ইনিশিয়েটিভ ফর ডেভেলপমেন্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, বিচারহীনতা, মাদক বিস্তার, অনলাইন অপরাধ বৃদ্ধি, মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তা এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নুসরাত সুলতানা আফরোজ। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে শিশু ও নারীদের যৌন নির্যাতন ও পাচার এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ‘ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন ও শিশু ১ হাজার ৮৯৭টি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে। সুতরাং অবশ্যই শিশুদের এবং সমগ্র জাতি বাঁচাতে আমাদের বাজেট বরাদ্দ করা দরকার।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যে লায়ন কাজী দিলরুবা জেফু বলেন “গৃহকর্মী শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।” বিশেষ অতিথি নারী উন্নয়ন শক্তি নির্বাহী পরিচালক ডঃ আফরোজা পারভীন বলেন, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও পাচারের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। সারা বিশ্বে যদি এই ধরনের নেতিবাচক সংবাদ ছড়িয় পড়ে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়বে।বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় এল আই এফ ডি এই নির্বাহী পরিচালক মর্জিনা বেগম বলেন, “শিশু ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সহ-সভাপতি জনাব খায়রুজ্জামান কামাল বলেন, সরকারের উচিত বিশেষ বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা।”
কিশোরী বৈশাখী আক্তার বলেন, “অনেক শিশুই আছে যারা নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারে না। কিশোরী জান্নাতী আক্তার বলেন, বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজে শিশু রক্ষার জন্য কেমন করে যৌন নির্যাতন থেকে বাঁচতে হবে সেই বিষয়ে শিক্ষা দেয়া দরকার।” সভা থেকে বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এর প্রতি নিম্নোক্ত দাবিসমূহ উত্থাপন করা হয়- শিশু ও নারী নির্যাতন এবং পাচার প্রতিরোধে বিশেষ জাতীয় বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে “ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ” শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত জনসচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন কেন্দ্র ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করতে হবে। অনলাইন ও সীমান্তভিত্তিক মানবপাচার প্রতিরোধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। বিদ্যালয়, কলেজ ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় করতে হবে।
বক্তারা বাজেট বরাদ্দ না হলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতি ক্ষতি সমূহ নির্ণয় করেন তা হলো – নারী ও শিশু নির্যাতনের হার আরও বৃদ্ধি পাবে, মানবপাচার চক্র আরও শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন খাত ক্ষতির মুখে পড়বে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বৃদ্ধি পাবে, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। সভা থেকে অবিলম্বে শিশু ও নারীদের যৌন নির্যাতন ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের জোর দাবি জানানো হয়।