পুলিশ, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প কর্মকর্তা আর আদম ব্যাপরী এই ত্রিচক্রের ফাঁদে পরে পথে বসার উপক্রম হয়েছে এক বিধবা নাড়ীর।
আদম ব্যাপারীর লোভনীয় প্রস্তাবে ছেলে আর মেয়ের জামাতাকে ইতালী পাঠানোর জন্য ৪০ লাখ টাকা দিয়ে উল্টো প্রতারণার মামলার আসামী হয়ে দিশেহার হয়ে পড়েছেন মায়া বেগম নামের ওই বিধবা নারী। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের এক কর্মকর্তার দাবীকরা ৫ লাখ টাকা ঘুষ না দেওয়ায় প্রতিপক্ষের মিথ্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জসিট দাখিল করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন মায়া বেগম।
মামলা পাল্টা মামলা, বিধবা মায়া বেগম ও এলাকাবাসীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরার হুক্কাপট্টি এলাকার জনৈক ফারুকের বাড়ির খাড়াটিয়া পান্না বেগম নামের এক নারী পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে বিগত ২০২৩ সালে জিনজিরার অমৃতপুর, হাউলী পুকুরপাড় এলাকার মৃত সুমন মিয়ার স্ত্রী মায়া বেগমের ছেলে রিফাত হোসেন ও মেয়ের জামাই মো. সোহেলকে ইতালী পাঠানোর জন্য তাকে নানাভাবে প্ররোচিত করতে থাকেন। পান্না বেগম ইতিপূর্বে অনেককে ইতালীসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছেন এমন কাগজপত্র ও কয়েকজনকে স্বাক্ষী হিসেবে হাজির করেন। এক পর্যায়ে মায়ো বেগম তার সদ্য কৈশোরতীর্ণ ছেলে ও জামাতাকে ইতালী পাঠাতে রাজি হন। উভয় পক্ষে ৪০ লাখ টাকায় ইতালী পাঠানোর চুক্তি হয়। মায়া বেগম জিনজিরা এলাকার ‘উদ্দীপন’ নামক একটি ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প থেকে লক্ষাধিক টাকা ঋণ গ্রহন করেন ডাচ্-বাংলা লি: কেরানীগঞ্জ শাখার হিসাব নং- ১৯৮১৫১০১৪২৯২৮, চেক নং-৯৪৪১৯৪৪ (টাকার পরিমান উল্যেখ ছিলনা) -এর মাধ্যমে। তার জিম্মাদারও একই ধরনের একটি চেক জমা রাখেন ওই প্রতিষ্ঠানে। এভাবে ধার দেনা করে কয়েক দফায় ২০২৩ সালের ১০ অক্টাবরের মধ্যে পান্না বেগমকে ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন এবং ছেলে ও জামাতার পাসপোর্ট জমা দেন।
নির্ধারিত সময়ে ইতালী পাঠাতে না পারায় মায়া বেগম একাধিকবার তাগিদ দিলে পান্না বেগম ভিসার কাগজ-পত্র দেখান। কিন্তু মায়া বেগমের ছেলে ও জামাতাকে ইতালী না পাঠিয়ে পান্না বেগম নানান টাল বাহানা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে মায়া বেগম তার টাকা (৪০ লাখ) ফেরত চান। এর পর থেকেই পান্না বেগম মায়া বেগমকে হুমকি ও হয়রানী করতে থাকেন। এক পর্যায়ে পান্না বেগম টাকা ফেরত দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন। নানা দেন দরবারের পর পান্না বেগম নগদ টাকার পরিবর্তে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর এনআরবিসি ব্যাংক লিঃ-এর আগানগর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা এর হিসাব নং-০১১২৩১৫০০০০০১০৯-এ চেক নং-০১১১৬৯১, টাকার পরিমান ৪০ লক্ষ টাকা মায়া বেগমের নামে ইস্যু করেন। চেক ডিজঅনার হলে মায়া বেগম পান্নার কাছে টাকা ফেরত চান। কিন্তু পান্না নানান টাল বাহানা করে সময় ক্ষেপন করতে থাকেন। এমতাবস্থায় টাকা ফেরত না পেয়ে মায়া বেগম পান্না বেগমের বিরুদ্ধে ঢাকার চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট (আমলী কেরানীগঞ্জ) আদালতে মামলা (সি আর মামলা নং-১৪১৭/২৪) করেন।
মায়া বেগম তার পাওনা টাকা আদায়ের জন্য মামলা করায় পান্না বেগম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পাল্টা ব্যাবস্থা হিসেবে তিনিও মায়া বেগমের বিরুদ্ধে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৯৮ ধারায় একটি পিটিশন মামলা (নং-২৭৭/২০২৪ ) দায়ের করেন। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে পান্না মামলাটি প্রত্যাহার করেন। কিন্তু তার ক্ষোভ থেকে যায়। তিনি পিটিশন মামলা (নং-৩১০/২৪) এবং সিআর মামলা (নং-৩৬৭/২০২৫) দায়ের করেন মায়া বেগমের বিরুদ্ধে।
শুধু তাই নয়, মায়া বেগমের টাকা যাতে ফেরত দিতে না হয় সে জন্য পান্না বেগম ডিএমপির কোতয়ালী থানায় চেক জালিয়াতির কথা উল্লেখ করে একটি সিআর মামলা (নং-৮৬২/২০২৫) দায়ের করেন মায়া বেগমের বিরুদ্ধ। ওই মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের পরিদর্শক মো. মিজানুর রহমান (ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ)। তিনি মায়া বেগমের দায়ের করা মামলায় (১৪১৭/২৪) ঢাকার দায়রা মামলা নং-২৪৮৩/২৫- এর হেফাজতে থাকা চেকটিতে পান্না বেগম না মায়া বেগম কার দস্তখত সেটি সিআইডির ফরেনসিক হস্তলিপি শাখার মাধ্যমে পরীক্ষার জন্য চেকটি জব্দ করেন। তদন্তের এক পর্যায়ে পরিদর্শক মিজানুর রহমান মায়া বেগমের কাছে ৫ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন বলে অভিযোগ করেন মায়া বেগম। টাকা দিতে অস্বীকার করায় চেকে মায়া বেগমের স্বাক্ষর বলে উল্লেখ করে চার্জসিট দাখিল করেন আদালতে। মামলাটি বর্তমানে সিএমএম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। পরিদর্শক মিজানুর রহমান মায়া কেগমের অভিযোগ অস্বিকার করে বলেন, ফরেনসিক হস্তলিপি শাখার পরীক্ষায় চেকে মায়া বেগমের দস্তখত পাওয়া গেছে।
অপরদিকে পান্না বেগম ক্ষদ্র ঋণ প্রকল্প ‘উদ্দীপন’-এর লোকাল ম্যানেজার সোলায়মান হককে আর্থিক সুবিধা দিয়ে পান্না বেগমের এনআরবিসি ব্যাংক লিঃ-এর আগানগর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা এর হিসাব নং-০১১২৩১৫০০০০০১০৯-এ চেক নং-০১১১৬৯১, চেকটিও হাতিয়ে নেন। চেকের পাতাটি ফেরত চাইলে সোলায়মান হক নানান গড়িমসি করেন। মায়া বেগম কেরানীগঞ্জ মডেল থানার মাধ্যমে চেকটি উদ্ধারের চেষ্টা করলে সুচতুর সোলায়মান হক নিজেকে রক্ষায় চেকটি অফিস থেকে হরিয়ে গেছে উল্লেখ করে গত ১৯ মে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি জিডি ( নং-১৩৯৬) করেন। তিনি পান্না বেগমের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহনের বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবী করেন। চেকটি কিভাবে পান্না বেগমের কাছে রয়েছে কিনা তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান।
নারায়নগঞ্জ জেলা শহরের দেওভোগ ব্যাপারী পাড়ায় বসবাসরত পান্না বেগমের ভাসুর বারেক মাঝি জানান, পান্না বেগম শহরের দেওভোগ এলাকায় বসবাসকালীন সময় এখানকার জনৈকা রিনা বেগম, খাইরুন নাহার, খবুর মিয়া ও নার্গিস আক্তারসহ অনেকের পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে নারায়নগঞ্জ সদর ও ফতুল্লা থানায় এ বষিয়ে বেশ করেটি অভিযোগ রয়েছে। বারেক মাঝি আরও জানান, গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরের নন্দনসার ও আশপাশের এলাকার বহু মানুষকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।
ঘটনার বিষয়ে পান্না বেগমের সাথে যোগযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি জিনজিরার হুকাপট্টির যে বাড়েিত থাকেন সেই ফারুক সাহেবের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি বাড়িতে নেই বলে ওই বাড়ির এক বাসিন্দা জানান।
এদিকে ভূক্তভোগী মায়া বেগম পান্না বেগমের কাছে পাওনা তার ৪০ লাখ টাকা ফেরত চেয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ সকলের সহযোগীতা চেয়েছেন। মামলার বিষেয়ে তিনি বলেন, সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে। আদালত সঠিক এবং ন্যায়ের পক্ষে রায় দিবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিধবা মায়া বেগম।