মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সুলতানাত অব ওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালা গ্রামের ৪ ভাই ছিল দেশে -প্রবাসে ও জীবন-মরণে যেন একে অপরের ছায়ার মতো।
জীবন সংগ্রামের সেই লড়াই শেষে মৃত্যুও যেন তাদের আলাদা করতে পারেরি। দাফনের আগে ৪ ভাইয়ের খাটিয়ায় ৪ ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে চলছিল মৃত্যুর মিছিল।
বুধবার (২০ মে) হাজারো মানুষের অশ্রুসিক্ত জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে শেষযাত্রায়ও পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো রেমিট্যান্স যোদ্ধা এ চার ভাই! যেন এক সুতোয় গাঁথা চারটি জীবন। এরা হলেন- নিহত রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম।
পরিবারের অভাব ঘোচাতে গত ৭ বছর আগে একে একে ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। মরুভূমির তপ্ত বালুতে বিরামহীন পরিশ্রম করে তারা গ্ৰামের বাড়িতে ১টি দোতলা দালানও তুলেছিলেন। কিন্তু নিয়তি খুবই নির্মম। বড় দুই ভাই বিবাহিত হলেও ছোট দুই ভাইয়ের বিয়ের কথা চলছিল। স্বজনরা যখন তাদের ফেরার প্রতীক্ষায় বিয়ের সানাই বাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন; ঠিক তখনই ওমানে মর্মান্তিক এ সড়ক দুর্ঘটনায় সকলের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৯টায় ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তারা চার ভাইয়ের মৃতদেহ পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন রাঙ্গুনিয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। বুধবার (২০ মে) ভোর ৬টা নাগাদ নিহত চার ভাইয়ের মৃতদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর গ্রামে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। বাড়ির উঠানে সারিবদ্ধভাবে রাখা চারটি কফিন দেখে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের আহাজারিতে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
এ হৃদয় বিদারক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাঙ্গুনিয়ার পানে ছুটে চলে অগণিত শোকাতুর জনতা। যেন শোকাবহ এক লালানগর। সকাল ১১টায় স্থানীয় লালানগর হোছনাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চার ভাইয়ের একত্রিত নামাজে জানাজা। এ জানাজায় ইমামতি করেন নিহতদের একমাত্র জীবিত ছোট ভাই মাওলানা মোহাম্মদ এনাম। যে ভাইদের হাত ধরে তিনি বড় হয়েছেন; তাদেরই বিদায়ী নামাজ পড়াতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মাওলানা মোহাম্মদ এনাম। তার আকুলতাপূর্ণ হৃদয়গ্ৰাহী মোনাজাতে উপস্থিত হাজারো মুসল্লি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও জানাজায় অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে অংশগ্রহণকারী মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে। শোকাতুর জনতা চার ভাইয়ের মূখ এক নজর দেখবার জন্য যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল।
জানাজা শেষে স্থানীয় বন্দেরাজার পাড়া জামে মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে আগে থেকেই খুঁড়ে রাখা চারটি কবরে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাফন করা হয়। দাফন-কাফনের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন গাউসিয়া কমিটির একটি মানবিক টিম।
দেশে ও প্রবাসের মাটিতে যে চার ভাই ছায়ার মতো একে অপরের পাশে ছিলেন; শেষযাত্রায়ও তারা কেউ কাউকে ছেড়ে গেলেন না। এক সুতোয় গাঁতা চার ভাইয়ের এই মর্মান্তিক বিদায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াবাসীর হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত রেখে গেছেন। এ হৃদয় বিদারক ঘটনা লালানগরবাসীকে যুগযুগান্তরে স্মরণীয়-শোকাবহ করে রাখবে।